বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে আমাদের আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু এটা স্বপ্নই রয়ে গেছে। আমাদের অনেকগুলো আন্দোলন হয়েছে। গত বছর গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেল। এর পরও আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব কিনা সেটি দেখার বিষয়। আমরা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। সবাই চাইলে হয়তো সেটি সম্ভব। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টিকে দুইভাবে দেখতে হবে।
মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সম্মতি শাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। তা সম্ভব একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। গণতান্ত্রিক উত্তরণ হলো একটি টেকসই ও স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সেটি হতে হলে নির্বাচনেরও ঊর্ধ্বে যেতে হবে। একটা টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু সেই মনজিলে মকসুদে পৌঁছতে হলে অনেকগুলো সংস্কার প্রয়োজন।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি আমাদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কী কী বাধা। সহজ করে বললে, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধান বাধা হচ্ছে নির্বাচন অঙ্গন পরিচ্ছন্ন নয়। এটি অস্বচ্ছ। এটিকে পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন অপরিচ্ছন্ন এবং চরম দুর্বৃত্তায়ন আছে। এটি দূরীভূত করতে না পারলে আবারো পণ্ডশ্রম হবে।
অস্বচ্ছ নির্বাচন ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘টাকার খেলা’। টাকা দিয়ে কেনা যায় এমন একটি গণতন্ত্র আমরা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি। তাই টাকার প্রভাব দূরীভূত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে সৎ ব্যক্তিকে আনতে হবে, যারা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে মানুষের জন্য কাজ করবেন। হলফনামা বিধান এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রচেষ্টায় নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে এখানেও কাজ করার প্রয়োজন রয়ে গেছে। প্রার্থীরা যে তথ্য দেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ নির্বাচনী ব্যয় ঘিরে প্রার্থীদের দেয়া তথ্য কতটা সত্য তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। নির্বাচনে টাকার খেলা ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে নির্বাচন অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করা যাবে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন দূর করা সম্ভব হবে। তবে শুধু এসব সংস্কার করলেই হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা যদি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ আরো সুগম হবে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে নির্বাচন কমিশন। কেননা এ কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় অংশীজন। তাই নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন হয়, দল নিরপেক্ষভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হতে পারে। এর জন্যও কতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। নাগরিক সমাজকে সংগঠিত হতে দিতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এর বাইরে কিছু আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।
এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে এ দেশে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের একটি প্রধানতম অন্তরায়। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা গেলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হতে পারে। সেই কাজ চলমান রয়েছে। তবে সাময়িকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে।
শেখ হাসিনা কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় গিয়েছিলেন। এরপর তিনি কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার করেননি। তার পরও স্বৈরাচার হলেন। তিনি পুরনো নিয়মেই স্বৈরাচার হন। একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান, দলীয়প্রধান আবার সংসদ নেতা। তিনি সর্বেসর্বা হওয়ায় জবাবদিহির প্রয়োজন পড়েনি। এখানে সরকার ও দলীয়প্রধান আলাদা হলে দল সরকারকে প্রশ্ন করতে পারত, আপনাকে সরকার বানিয়েছি, আপনি আমাদের ইশতাহার কী কী বাস্তবায়ন করেছেন? একই ব্যক্তি হওয়ায় তিনি সর্বময় ক্ষমতা ভোগ করেছেন। যাকে খুশি তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, মন্ত্রী বানিয়েছেন। আমরা এখানে সীমারেখা টেনে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী ১০ বছরের বেশি থাকবেন না। একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও দলীয়প্রধান হতে পারবেন না। এক্ষেত্রে সংস্কার না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে বাধ্য। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও সুপারিশ করা হয়েছে, যা নিয়ে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। নির্বাচন কমিশন একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু এখানে নিয়োগ দেয় নির্বাহী বিভাগ। ফলে তারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তি নিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে। এ থেকে উত্তরণে ভবিষ্যতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগ করা হবে। আর সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়টি সংবিধানের মধ্যে থাকবে। এর বাইরেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংস্কার প্রয়োজন। যদিও সেসব বিষয়ে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। যদি সব প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োজন করা হতো তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। তাই এসব ক্ষেত্রেও সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
সামনে ৪৮টি সংস্কার ঘিরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে চারটি প্রশ্ন থাকলেও প্যাকেজ একটাই। এটার মূল কথা হলো, আপনি সংস্কারের পক্ষে না বিপক্ষে? পক্ষে হলে ‘হ্যাঁ’, বিপক্ষে হলে ‘না’ ভোট দেবেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আপনারা কী পরিবর্তন চান? শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের পথ খোলা রয়েছে। আপনারা যদি পরিবর্তন না করেন তাহলে আবারো কেউ সেই চেয়ারে বসে সেই পথ ধরে একই কাজ করতে পারে।
গত সরকারের আমলে যারা নির্বাচনে জিতেছে তাদের আয় কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। আমাদের নির্বাচনটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচন ব্যবসায়ীকরণ হয়েছে আর ব্যবসাকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। এটা যদি পরিবর্তন করা না হয় তাহলে আমাদের আরো পণ্ডশ্রম হবে। সেজন্য পথের বাধাগুলো দূর করতে হবে। এজন্য ঘুস-দুর্নীতিকে দূর করতে হবে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন থাকতে পারবে না। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে দেশ ও দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী, সুজন
[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অভ্যুত্থানের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা’ শিরোনামে সমাপনী অধিবেশনে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে]










