অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণাকালীন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে ইসি এরই মধ্যে নানা কাজ সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা থেকে অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ, আইনবিধি সংস্কার, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর নিবন্ধন, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশে নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের মতো অপরিহার্য বিষয়টিতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রস্তুতিও অপর্যাপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন থেকে এ পর্যন্ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটেনি। আর এটিই নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যদিও সরকার এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বড় সমাবেশে জননিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা রেখেছে।

আসন্ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল ১১ ডিসেম্বর, যার মাধ্যমে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরদিনই একজন রাজনৈতিক প্রার্থী ও সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলা হয় এবং তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেবল তাই নয়, এ ঘটনাকে পুঁজি করে দেশের শীর্ষ দুই গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এর বাইরে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক আরেকটি উদ্বেগের ঘটনা হলো রাজধানীর মগবাজার মোড়ের কাছে ফ্লাইওভারের ওপর থেকে ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে এক পথচারীর মৃত্যু। ঘটনাটির কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রাথমিক ধারণা হলো জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানোই এর উদ্দেশ্য। এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে নির্বাচনের বৃহৎ অংশীজন হলো জনগণ। জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। জনমনে যদি নিরাপত্তা ঘিরে ভয় থাকে তাহলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্বাচনী কেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এমনটি ঘটলে তাতে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াই ব্যাহত হবে। সেক্ষেত্রে ইতিহাসের সেরা ভোট আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি অধরাই থেকে যাবে।

এ প্রেক্ষাপটে ইসি ও সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে এবং মাঠ পর্যায়ে সব প্রস্তুতি রাখতে হবে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের ভিত্তি হলো সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। বিগত সরকারের আমলে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন ছিল বহুল বিতর্কিত। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল দিনের ভোট রাতে হওয়া। অর্থাৎ জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছিল। এতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে জনগণের ভোটাধিকারের বিষয়টি জড়িত, তেমনি ইসির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও জড়িয়ে আছে। তাই নির্বাচনে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে সেটিকেও ইসির নির্বাচনী প্রস্তুতির অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। আর সরকারকেও মনোযোগী হতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া স্থিতিশীল পরিবেশে নির্বাচন হওয়া কখনই সম্ভব নয়।

গত দেড় বছরে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার নজিরই বেশি। চব্বিশের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। বরং দেশজুড়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুতে হত্যার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর তথা ১১ মাসে ৮৫২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৬৬ জন। যদিও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ডেভিল হান্ট ও ডেভিল হান্ট ফেজ-টুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি এবং সাধারণ মানুষের মনে ক্রমেই ভয় বেড়েছে।

তবে দেশব্যাপী অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে সরকারের এত ব্যর্থতার মাঝেও একটি বিপরীত দিকও রয়েছে, যা বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন থেকে বর্তমানে ঢাকায় অন্তত সাতটি বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলোয় কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেখা যায়নি। লক্ষাধিক লোকের সমাগম হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আয়োজকদের তৎপরতা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এর সর্বশেষ নজির দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে আয়োজিত সমাবেশ। যে কারণে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে প্রভাব রাখবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সরকারের নিরাপত্তা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন যেকোনো প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারে তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে ইসিকে সবসময় তাগিদ দিতে হবে। তবে সরকার ও ইসির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও এক্ষেত্রে বড় অংশীজন। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা মোটেও কাম্য না। রাজনৈতিক বক্তৃতায় ঐক্যের ডাক দিয়ে যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরসন না করা যায়, তবে জাতীয় ঐক্যও প্রতিষ্ঠা হবে না। আর ঐক্য না থাকাটাই বিশৃঙ্খলার বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থী, কর্মী-সমর্থকরা যেন সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে, সেই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোকে চর্চা করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণ জরুরি। এজন্য সব অংশীজনের দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।