পার্ককে যেকোনো নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বেশকিছু কারণ রয়েছে। সাধারণত পার্কে থাকে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান, বসার স্থান, সবুজের সমাহার, জলাধার এবং খেলা ও শরীর চর্চার জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো। যে কারণে এটি পরিবেশগত ভারসাম্য তথা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে সব শ্রেণী-পেশা-বয়সের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষায়িত পার্কও নির্মাণ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে লন্ডনের ‘হাইড পার্ক সিনিয়র প্লে গ্রাউন্ডের’ কথা বলা যায়। পার্কটির নামই বলে দেয় এটি বিশেষভাবে বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি থেকেই এ পার্ক গড়ে তোলা হয়।

মূলত ছোট থেকে বড়, সব বয়সী নগরবাসীর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিতে পার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার শহরে পার্ক থাকাটা জরুরি। নয়তো শহর তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা দরকার বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। দুঃখজনকভাবে দেশের রাজধানী ঢাকাকে সেই আদর্শ শহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি, যেখানে বসবাসকারী বাসিন্দার জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে। বরং সময়ের পরিক্রমায় ভূমির পরিমাণ কমেছে উদ্বেগজনক হারে। মাইক্রোট্রেন্ডসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৯৬০ সালে ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৭ কোটির জনসংখ্যার মধ্যে ১৪ শতাংশের বাস ঢাকায়, যা ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্যে উঠে এসেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে ঢাকার চেহারা উলম্ব রূপ নিয়েছে। বহুতল ভবন ও স্থাপনার চাপে উন্মুক্ত ভূমির পরিমাণ কমে এসেছে। এতে কমেছে সবুজ পরিসর এবং জলাধারও। যে কারণে ঢাকা ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী শহরে পরিণত হয়েছে।

চলতি বছর বাসযোগ্যতা বিচারে ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’-এ বিশ্বের মধ্যে ‘তৃতীয় বসবাস অনুপযোগী শহর’ হিসেবে উঠে এসেছে এ শহরের নাম। হতাশাজনকভাবে, এমন প্রেক্ষাপটেও সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাকে বাস উপযোগী করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এমনকি ঢাকার পরিবেশগত মানোন্নয়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০২৩ সালে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করে যে পাঁচটি আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করেছিল, তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অথচ ড্যাপ প্রণয়নের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ-গাজীপুর এলাকায় এসব পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।

জনসংখ্যার হিসাবে ঢাকায় ন্যূনতম দেড় হাজার খেলার মাঠ থাকার কথা। যদিও বাস্তবে পাঁচশ মাঠও নেই। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে এ শহরে গড়ে উঠেছে একাধিক ওয়ার্ড, যেখানে একটিও মাঠ নেই। আবার যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেই জনসাধারণের প্রবেশের অনুমতি নেই। বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কলোনির তত্ত্বাবধানে থাকায় সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পায় হাতেগোনা কিছু নাগরিক। এর মানে হলো সব শ্রেণী-পেশা, লিঙ্গ ও বয়সের মানুষ যে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করবে এমন জায়গার রয়েছে তীব্র সংকট। এমনকি অনেক মাঠ এরই মধ্যে দখল হতেও দেখা গেছে। দখলকৃত মাঠ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবনসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের জন্য। এমন পরিস্থিতিতে পার্ক নির্মাণ নগরবাসীর জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হতে পারত। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আদর্শ একটি শহরের ১০-১৫ শতাংশ এলাকা জলাশয় এবং ১৫-২০ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। কিন্তু গত দুই দশকে রাজধানীর খোলা জায়গার পরিমাণ প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ঢাকা হয়ে উঠেছে কংক্রিটের নগরী। ঢাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ভিড়ে পরিবেশ বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। এর দায় সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ওপর সমানভাবে বর্তায়।

বর্তমান সরকারের উচিত পার্ক নির্মাণের কাজটি কিছুটা হলেও এগিয়ে নেয়া, যা আগামী নির্বাচিত সরকারের শাসনামলেও অব্যাহত থাকবে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিগত সরকারের শাসনামলে কেরানীগঞ্জের পার্ক নিয়ে রাজউক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেশি হওয়ায় সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত পাঠানো হয়। যদিও এরপর তা নিয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি। তবে পরিকল্পনাবিদদের অভিমত, বর্তমানে পার্ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা সমীচীন হবে। কেননা দ্রুত নগরায়ণের চাপে আগামীতে ফাঁকা জমির পরিমাণ আরো কমে আসবে। পাশাপাশি জমির দামও আরো বাড়বে। অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে অন্তত জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, সুস্থ ও টেকসই নগর নিশ্চিত করতে পার্ক অপরিহার্য। গাছ, জলাশয়, জীববৈচিত্র্য না থাকলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে মানুষের ওপরও। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, মানসিক চাপসহ বহু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বাড়ে। আর বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অসংক্রামক রোগ সৃষ্টির পরিবেশই ঢাকায় রয়েছে। সুস্থ জীবনযাপনের উপযোগী মানসম্পন্ন বায়ু, পর্যাপ্ত জলাধার, সবুজ এলাকা, খেলার মাঠ, হাঁটার স্থান—সবকিছুরই ঘাটতি রয়ে গেছে। কিন্তু এসব ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যৎসামান্যই।

ঢাকা বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত। রাতারাতি সেসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে বাসযোগ্যতা ফেরাতে হলে কিছু উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একটি উদ্যোগ হতে পারে ঢাকার পাঁচ অঞ্চলে পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা। এজন্য জমি অধিগ্রহণ, বাজেট বরাদ্দ, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়—সবকিছুই দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। সরকার যদি সত্যিই পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব রাজধানী গড়তে চায় তাহলে এটিকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।