গত দুই যুগে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে টেলিভিশন ‘টক শো।’ এখন অবশ্য শুধু টেলিভিশনেই সীমাবদ্ধ নেই, ইউটিউব-ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রাজনৈতিক টক শোর অবাধ বিচরণ। টক শোতে যেমন নানা আলোচকের নানা মত-দ্বিমত, কখনো কখনো কদর্য ঝগড়া লেগে থাকে নিরন্তর; আবার এসব টক শো নিয়েও সাধারণ দর্শকদের আছে নানা অভিমত, সহমত, বিরক্তি। তবে সবকিছু ছাপিয়েও টক শোর জন্য প্রতিদিন লাখ কোটি দর্শক-শ্রোতার কোনো অভাব হয় না। আর এত বিপুল মানুষ যখন প্রতিদিন এগুলো দেখে, শোনে, আলোচনা করে; এর একটা রাজনৈতিক অর্থনীতি তো সমাজে অবশ্যই রয়েছে। টক শো কেবল আর ১০টা নিছক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা এবং জনমত গঠনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হয়। কিন্তু এগুলো কি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি কেবল পক্ষপাতমূলক প্রচারণার ঢাল হিসেবেই ব্যবহার হয়ে আসছে?

মার্কিন সঞ্চালক জো ফ্রাঙ্কলিনের ‘জো ফ্রাঙ্কলিন শো’কে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম টেলিভিশন টক শো হিসেবে ধরা হয়। ১৯৪৭-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত টানাচলা এ শো এখন পর্যন্ত টেলিভিশনের একক শো হিসেবে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে চলার রেকর্ড ধরে রেখেছে। ফ্রাঙ্কলিনের টক শো অবশ্য পুরোপুরি রাজনৈতিক ছিল না, এখানে মূলত সেলিব্রিটিদেরই প্রাধান্য ছিল। তবে আজ অবধি বিশ্বব্যাপী আমরা টক শোর সবচেয়ে জনপ্রিয় যেই ফরম্যাট দেখি, অর্থাৎ একজন সঞ্চালকের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের দুই বা তারও অধিক আলোচক, এ ফরম্যাট ফ্রাঙ্কলিনেরই উদ্ভাবন। বাংলাদেশেরও প্রায় সব রাজনৈতিক টক শোই ফ্রাঙ্কলিনের এ ফরম্যাটকেই অনুসরণ করে চলেছে। এ ফরম্যাটের সৌন্দর্য হলো বৈচিত্র্যময় মতামতের সংঘর্ষ, যা দর্শকদের চিন্তা উদ্দীপ্ত করে। যদিও এ দেশের টক শোগুলো প্রায়ই পক্ষপাতমূলক হয়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক আলোচনার মানকে হ্রাস করে।

রাজনৈতিক টক শোর ক্ষেত্রে সঞ্চালকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চালককে নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও বিষয়বস্তুর ওপর গভীর জ্ঞানসম্পন্ন হতে হয়। তার ক্ষুরধার প্রশ্ন ও আলোচনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলে অনুষ্ঠান একপক্ষীয় হয়ে পড়ে। দুঃখজনক বিষয় বাংলাদেশের অধিকাংশ সঞ্চালকের এসব বিষয়ে সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়। বিশেষত, অনেক সঞ্চালকের রাজনৈতিক পক্ষপাত দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে।

গত সরকারের আমলে বেশকিছু চ্যানেলের টক শো মূলত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে ব্যবহার হতো। এসব চ্যানেলের টক শোর একটা বিশেষ প্যাটার্ন ছিল। একজন সরকারদলীয় আলোচক, একজন বিরোধীদলীয় আলোচক, সঙ্গে একজন ‘নিরপেক্ষ’ তৃতীয় আলোচক, যিনি নিরপেক্ষতার মোড়কে আদতে সরকারি দলের বয়ানকেই সমর্থন করতেন। এর সঙ্গে যুক্ত হতো সঞ্চালকের পক্ষপাতমূলক আচরণ। ফলে সম্পূর্ণ আলোচনাটাই হয়ে দাঁড়াত ‘তিন বনাম এক’। এ ‘তিন বনাম এক’ ফরম্যাটের টক শোগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল সরকারি দলকে শক্তিশালী ও বিরোধী পক্ষকে দুর্বল দেখানো। এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আলোচনা সভার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এডিটরস গিল্ড নামে একটা সংগঠনের সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান। যেখানে সাত-আটজন সরকারপন্থী আলোচকের সঙ্গে এক-দুজন বিরোধীদলীয় আলোচক, সঙ্গে ‘সরকারের চেয়েও বেশি সরকারপ্রেমী’ হয়ে ওঠা একজন টেলিভিশন মালিক-সম্পাদকের চরম পক্ষপাতমূলক সঞ্চালনায় আলোচনা অনুষ্ঠানগুলো হয়ে উঠেছিল বিনোদনের খোরাক!

এ প্রোপাগান্ডা ধরনের টক শো ছাড়াও টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো অনুষ্ঠানগুলোয় কাকে অতিথি করা যাবে, আর কাকে করা যাবে না, সেসব তালিকা বিশেষ বিশেষ সংস্থা থেকে ঠিক করে দেয়া হতো বলেও অভিযোগ আছে। বিশেষ করে সরকারের সমালোচক অনেক বক্তাকেই বেশকিছু চ্যানেলে অতিথি করার বিষয়ে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল শোনা যায়। কেউ কেউ অবশ্য এসব চাপ উপেক্ষা করে সরকারের যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করে, এমন অতিথিদের নিয়ে অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন। উদাহরণ হিসেবে ‘‌তৃতীয় মাত্রার’ জিল্লুর রহমানের কথা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, যিনি সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নানামুখী চাপ ও হয়রানির মধ্যেও শেষ পর্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গেই তার অনুষ্ঠান চালিয়ে নিয়ে গেছেন।

টেলিভিশন টক শোর ওপর এ ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কেবল গত সরকারের সময়ই ছিল এমনটা নয়। এক/এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এমনকি তার আগের রাজনৈতিক সরকারের সময়েও টক শো ওপর নানামুখী রাজনৈতিক চাপ ছিল বলে অভিযোগ আছে। সব ক্ষেত্রে যে কেবল সরকারের নির্দেশেই এমনটা করা হয়েছে তাও নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকরাই নিজেদের নানামুখী সুবিধার জন্য ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষাবলম্বন করে থাকে। এদের অনেকেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নগ্নভাবে সরকারের গুণকীর্তন চালিয়ে গেছে। সরকারও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বেসরকারি টেলিভিশনের নিবন্ধন দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তো কোনোরকম রাখঢাক না করে প্রায়ই বলতেন, আমি টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়েছি আবার আমারই সমালোচনা করে!

গত বছরের অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থান ও সরকার পতনের পর মিডিয়া জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা ইতিবাচক, কিংবা আদৌ প্রকৃত পরিবর্তন বলা যায় কিনা—এ প্রশ্ন থেকেই গেছে। বেশকিছু টেলিভিশন চ্যানেলে হামলা-ভাংচুর হয়েছে, মব ও রাজনৈতিক প্রেসারে অধিকাংশ চ্যানেলের মালিকানা হাতবদল হয়েছে, সাবেক সরকারপন্থী সম্পাদক-সাংবাদিকরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং তাদের জায়গায় বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠরা নিয়োগ পেয়েছেন। এ চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের মিডিয়া কমিশনের প্রতিবেদনে।

রাজনৈতিক টক শোতেও পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষণীয়। কিছু অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কিছু নতুন নামে শুরু হয়েছে, আবার পুরনো কয়েকটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে সঞ্চালকদের ক্ষেত্রে। অনেকে বাদ পড়ে নতুন মুখ এসেছে। যদিও অনুষ্ঠানের মান বিশ্লেষণ করলে বড় কোনো বড় উন্নতি কিন্তু চোখে পড়ে না। আগের মতোই নতুন সঞ্চালকরা ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি অনুগত। আলোচক তালিকাতেও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। একসময় যারা সরকারের পক্ষ হয়ে টেলিভিশনের পর্দা কাঁপিয়ে দিতেন; তারা এখন গ্রেফতার, আত্মগোপন বা কার্যত অচ্ছুত। অন্যদিকে আগে যারা প্রান্তিক ছিলেন, আজ তারা বেশ উচ্চকিত। তবু সামগ্রিকভাবে একরৈখিক রাজনৈতিক বয়ানের ধারা কিন্তু খুব একটা ভাঙেনি। আগের সরকারের সমর্থক-বুদ্ধিজীবী যারা মামলার আসামি বা পলাতক নয়, তারা কেন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত? এর বদলে তাদেরকে টক শোতে কথা বলার সুযোগ দিলে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের বয়ান জনগণ যেমন জানতে পারত, একই সঙ্গে সঞ্চালক ও অন্য আলোচকরা প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের অতীত বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন কীভাবে বিগত কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারকে আরো বেশি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার শক্তি জুগিয়েছে, সেসবের স্বরূপও উন্মোচনের সুযোগ সৃষ্টি হতো। মোদ্দাকথা হচ্ছে, গণমাধ্যমকে অবশ্যই সব প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। এখানে সব শ্রেণীর কথা বলার সমান সুযোগ যেমন থাকতে হবে, একই সঙ্গে সবাইকেই সমানভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত কোনোভাবেই কাম্য নয়।

একসময় বেসরকারি চ্যানেলগুলোয় বৈচিত্র্যময় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান থাকলেও এখন অধিকাংশই খবর ও টক শোতে সীমাবদ্ধ। কারণ টক শো বানাতে খরচ কম, বিজ্ঞাপনও পাওয়া যায় সহজে। ছোট স্টুডিও, কিছু চেয়ার-টেবিল আর আলোচকদের সামান্য কিছু সম্মানী দিলেই চলে! কিছুদিন আগে অবশ্য টক শোর তারকা আলোচকরা দল বেঁধে তাদের সম্মানী বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন, সে বিষয়ে পরে কী ফলাফল এসেছে তা অবশ্য আর জনপরিসরে জানা যায়নি। বাংলাদেশের মানুষ কতটুকু রাজনীতি সচেতন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এ দেশের অধিকাংশ মানুষই যে রাজনীতিপ্রিয় তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যেকোনো চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান; সবখানেই কেউ না কেউ রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ায়। সামান্য ভুল হলো মনে হয়! সম্ভবত এ দেশের পুরুষকুল রাজনৈতিক আলাপে বেশি অগ্রগামী। আমাদের সমাজ যেহেতু প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক, সবখানেই সেসব রাজনৈতিক চাপানউতোরই আমাদের চোখে পড়ে। টেলিভিশনের পর্দাও এর বাইরে নয়। এ দেশের নারী, শিশু বা পুরুষদেরও একটা অংশ যারা সর্বদা রাজনৈতিক আলাপ অপছন্দ করেন, তাদের জন্য প্রাইম আওয়ারে খবর-টক শোর বাইরে বিকল্প অনুষ্ঠান কী কী থাকা উচিত সেসব নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সিরিয়াসলি ভাবা উচিত।

এ লেখা যেহেতু টক শো নিয়ে, সেখানেই ফিরে আসা যাক। টক শোর চাহিদা আছে, দর্শকপ্রিয়তাও আছে। এটাকে চ্যানেলগুলোর ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। এসব অনুষ্ঠানের মান বৃদ্ধি নিয়ে ভাবতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব অনুষ্ঠানের প্রভাব কতটুকু বা এগুলো আদৌ আমাদের রাজনৈতিক উন্নয়নে কতটুকু প্রভাব রাখছে, সেসব নিয়েও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি চ্যানেলেরই দায়িত্ব রয়েছে অনুষ্ঠানের আগে বিষয়বস্তু ও আলোচকদের বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করা, কিছু কিছু চ্যানেল সেগুলো করেও থাকে। আবশ্যিকভাবে সঞ্চালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সততা, প্রজ্ঞা, বস্তুনিষ্ঠতা নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া জরুরি। অন্যথায় একরৈখিক আলোচনা দিন দিন তার আবেদন হারাবে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্য উন্মোচন করা, কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা প্রচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠা নয়।

আশিনুর রেজা: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী