দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যান সমালোচিত হয়ে আসছে। বিগত সরকারের শাসনামলে পরিসংখ্যানকে ব্যাপক মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকের পরিসংখ্যানে বাস্তবতার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না বলে নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন। এর পরও প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যানগুলো সংশোধনের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে এখনো।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে ঠিকই, তবে সেগুলোর বাস্তবিক কোনো প্রয়োগ নেই। দেশে জাতীয় পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিগত সময়ে এ প্রতিষ্ঠান অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়েছে। যে কারণে সংস্থাটির তথ্য প্রভাবিত হতে দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে। তবে বিবিএসের তথ্যের প্রতি নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে জনগণের মধ্যে যে অনাস্থা রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার কোনো ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি সরকার। বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং এর দুর্বলতা দূর করতে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়ছিল। গত অক্টোবরে এ টাস্কফোর্স বিবিএসের সংকট ও উত্তরণের উপায় তুলে ধরে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছে। কিন্তু তাতে দেয়া সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজেও বিশেষ অগ্রগতি নেই।

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নীতি-কৌশল নেয়া হয় পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে। কিন্তু এ দেশের জনমিতিক পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক-জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রফতানি আয়—অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ করা যায়। এমন সরকারি সংস্থাগুলোরও একটি তথ্য আরেকটির সঙ্গে মেলে না। আবার দেশের অনেক পরিসংখ্যান নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। এর উদাহরণ হিসেবে কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও বিবিএসের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কথা বলা যায়।

বিশ্বের জনসংখ্যার পরিস্থিতি প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে পৃথিবীর নানা দেশে বর্তমানে জনসংখ্যার রিয়েল-টাইম ডাটা তৈরি করছে। কিন্তু সে পথে এখনো দেশের পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থা যেতে পারেনি। অর্থাৎ গণনার সেকেলে পদ্ধতির কারণে গুণগত মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান তৈরি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। সেটি হলো পরিসংখ্যান প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। কেবল ইসি বা বিবিএস নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য প্রণয়নেও বড় রকমের অসমন্বয় দেখা যায়। যে কারণে জিডিপি, রফতানি-আমদানি, রাজস্বের তথ্যে অসংগতি থেকে যায়। তবে এক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পার্থক্যের দায় রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকের অভিমত। কিন্তু কোন তথ্য বেশি নির্ভরযোগ্য বা কোন তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নেয়া সমীচীন হবে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে? বরং যদি সমন্বয় করে যেকোনো সূচকের ‘একক’ তথ্য পরিবেশন করা যেত, তবে তা বেশি কার্যকর হতো। ব্যবহারকারীদেরও পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বিধান্বিত হতে হতো না।

দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে বর্তমানে আস্থার সংকট সবচেয়ে বেশি। জিডিপিসহ সব সূচকের প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করতে হলে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের উচিত, যেকোনো নীতি প্রণয়নের আগে সঠিক পরিসংখ্যানের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশে বিবিএসকে যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষ করে পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।

বিবিএসের তথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। ফলে তথ্য যতই সঠিক হোক, তার প্রতি জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের আস্থা কমেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য টাস্কফোর্স তাদের প্রতিবেদনে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু এর পরও সেটি হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে কোনো খাতের প্রকৃত চিত্র কখনই জানা যাবে না। এ থেকে উত্তরণে প্রয়োজন স্বচ্ছ, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করা। এতে আশা করা যায় পরিসংখ্যানের গুণগত মানও বাড়বে। জাতীয় পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থা হিসেবে বিবিএসকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নে ভারতের জাতীয় হিসাবের পরিসংখ্যানকে ‘‌সি’ গ্রেড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির মূল্যস্ফীতির তথ্যে ‘সমস্যা’ খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি। ভারতের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতি, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও আইএমএফের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গ্রেড পেয়েছে। এ থেকে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা দেশের পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তের মূল্যায়ন করা হলে তা ভারতের চেয়ে আরো খারাপ অবস্থানে থাকতে পারে। এ আশঙ্কা অমূলক নয়। পরিসংখ্যান বর্তমান বাস্তবতা সেদিকেই নির্দেশ করে। সংস্থাটি তাদের মূল্যায়নে নিম্ন মানের পরিসংখ্যান প্রণয়নের পেছনে বেশ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছে—পুরনো ভিত্তি বছর, জিডিপি হিসাবের পদ্ধতিতে অমিল, যথাযথ মূল্যসূচক না থাকা এবং বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি। সংস্থাটির মতে এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে ভারতের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অনুধাবন কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ দেশের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রেও এসব সমস্যা দেখা যায়, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফের মতে, বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য বিনিয়োগের খাতভিত্তিক আরো বিস্তারিত তথ্য এবং উৎপাদন ও ব্যয়ভিত্তিক জিডিপির আরো সূক্ষ্ম বিভাজন প্রয়োজন।

এদিকে এখনো দেশের অর্থনীতির আকার বা জিডিপির পরিমাণ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে পারেনি বিবিএস। অথচ অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির অনুপাতের সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়ে থাকে। এমনকি মাথাপিছু আয় নির্ধারণের বিষয়টিও জিডিপির সঙ্গে জড়িত। কারণ মাথাপিছু আয় হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ও মোট জনসংখ্যার মধ্যকার ভাগফল। আর জিএনআই নির্ণয় করা হয় জিডিপির সঙ্গে রেমিট্যান্স যোগ করে। তাই জিডিপির তথ্য সঠিক না হলে নির্ভুল মাথাপিছু আয় নির্ণয় করাও সম্ভব নয়। সুতরাং পরিসংখ্যানের গুণগত মান ও বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চিতে বিবিএসকে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে ওই টাস্কফোর্সের সদস্য ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালকের মন্তব্য অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেছেন যে বিবিএসের উচিত তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং যেসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে সেগুলো সবার জন্য প্রকাশ করা। তাহলে প্রয়োজনমাফিক যে কেউ পরিসংখ্যানের যথার্থতা যাচাই করে দেখতে পারবেন। সর্বোপরি সরকার ও বিবিএসকে মানসম্পন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান প্রণয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।