রাজধানী ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার। শহরের সড়ক অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। অথচ প্রতিদিন নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামছে। এতে সড়কে বাড়ছে তীব্র যানজট। ব্যক্তিগত গাড়ি গড়ে দুই থেকে তিনজন যাত্রী বহন করলেও একটি বাসে গড়ে ৪০-৪৫ জন বহন করতে পারে। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্যই বেশি দেখা যায়। ফলে স্বল্পসংখ্যক মানুষ সড়কের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে, আর অধিকাংশ যাত্রী পড়ছে দুর্ভোগে।
দেশে পালিত হলো বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সমাজ, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার সীমিত করি’। ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর এ দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এ বছর দিবসটি পালন করেছে। নাগরিকদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে উৎসাহিত করা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিত রাখাই এ দিবসের লক্ষ্য হলেও বাংলাদেশে চলছে উল্টো প্রবণতা। দেশের শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকার রাস্তায় ক্রমেই বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ি। তথ্য বলছে, বর্তমানে সারা দেশে নিবন্ধিত প্রাইভেট কার (ব্যক্তিগত গাড়ি) আছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩টি। নিবন্ধিত প্রাইভেট কারের ৩ লাখ ৫৪ হাজার ২২৬টিই ঢাকায়। এদিকে সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা বর্তমানে ৪৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৮। রাজধানীতে মোটরসাইকেল রয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৪টি।
যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও রাস্তার পরিসর বাড়ছে না, বরং বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে তা আরো সংকুচিত হচ্ছে। ফলে দিন দিন যানজট অসহনীয় হয়ে উঠছে। যানজট কমাতে বরাবরই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তার পরিবর্তে জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ তাদের। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস ২০২৫ উপলক্ষে ‘সমাজ, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার সীমিত করি’ শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ‘শহরে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করে টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মানসম্মত গণপরিবহনের অভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলছে। ফলে সড়কে বাড়ছে যানজট। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে বিকল্প মানসম্পন্ন গণপরিবহন বাড়ানো প্রয়োজন।’
ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ায় যানজট তীব্র হচ্ছে। অফিস সময় কিংবা পিক আওয়ারে সড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী সংখ্যা কম হলেও তারা সড়কের বড় অংশ দখল করে রাখে। এ অবস্থায় গণপরিবহন ধীরগতিতে চলে, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২১ সালের করা এক গবেষণায় বলা হয়, শুধু ঢাকার যানজটের কারণে দেশের জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। আর্থিক মূল্যে এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। গবেষকরা আরো উল্লেখ করেছেন, অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের মতো পরোক্ষ ক্ষতিগুলো যোগ করলে সার্বিক ক্ষতি জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি হতে পারে।
অধিকাংশ যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কলকারখানায় ব্যবহৃত হয় জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ জ্বালানি তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস। জীবাশ্ম জ্বালানি প্রাকৃতিক সম্পদ, যা অসীম নয়। বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয় জীবাশ্ম জ্বালানি, যা ১৯৯৫ সালে ছিল মোট জ্বালানির ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি নির্ভরতা জ্বালানিনিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে এবং অতি ব্যবহারে বাড়ছে পরিবেশদূষণ। সারা বিশ্বে এখন যানবাহন আর কলকারখানা দ্রুত হারে বাড়ছে। ২০০৭ সালে যেখানে বিশ্বে যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৮০৬ মিলিয়ন, সেখানে ধারণা করা হচ্ছে ২০৩০ সালে তা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ও ২০৫০ সালে ২ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ শতকের শেষেই হয়তো এসব শক্তির উৎসগুলো শেষ হয়ে যাবে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর ওপর এখন তাই সবাই জোর দিচ্ছেন, পারলে এসব প্রাকৃতিক শক্তির মজুদে আর হাত দিতে চাইছেন না। সেজন্য সবাই এখন জ্বালানি সংরক্ষণ ও সাশ্রয় এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। এছাড়া জৈব জ্বালানি বা বায়োফুয়েলের ব্যবহারও বাড়ছে। বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলোর দিকে অগ্রসর হতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে, তা হলো একরকমের গ্রিনহাউজ গ্যাস। গ্রিনহাউজ গ্যাস বাড়ার ফলেই বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ছে। আর এর প্রভাবে ঘটছে বিশ্বব্যাপী নানা রকম পরিবেশগত বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সময়ের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতির প্রসারণ ঘটেছে। বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। স্বভাবত সচ্ছল অনেক পরিবারই কিনছে ব্যক্তিগত গাড়ি। কোনো কোনো পরিবার একটি গাড়ি ব্যবহার করেই ক্ষান্ত নয়। একাধিক সদস্যের ব্যবহারের জন্য কিনছে ভিন্ন ভিন্ন গাড়ি। এর মূলে কাজ করছে গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা। নানা ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হলেও ঢাকায় গণপরিবহনের অপ্রতুলতা একটা বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতিদিন শহরে আসা মানুষ বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না গণপরিবহন। তদুপরি যা আছে তাও অসমানুপাতিক। লোকসমাগমের স্থান থেকে কোনো রুটে পরিবহন সংখ্যা বেশি, আবার কোনো রুটে তুলনামূলক কম। এছাড়া টিকিটের ব্যবস্থা না থাকা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নারীদের নিরাপত্তাহীনতা, পরিবহনে অত্যধিক ভিড়, আরামদায়ক অবস্থার ঘাটতি প্রভৃতিও রয়েছে। অন্যদিকে শহরে বর্তমানে উন্নয়নের নামে বিভিন্ন অবকাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। যানজট কমানো এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলেও তাতে বরং ব্যক্তিগত গাড়ির সুবিধা হচ্ছে বেশি। মানুষ নতুন নতুন গাড়ি কেনায় উৎসাহিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে শহরে বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ও ব্যবহার।
বিশ্বের অনেক শহরে এখন ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কোনো কোনো শহরে সপ্তাহের এক বা দুইদিন ব্যক্তিগত যানবাহন বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আবার সিঙ্গাপুর, হংকং, পশ্চিম ইউরোপের কিছু শহরে কনজেশন চার্জ, পার্কিং চার্জ, লাইসেন্স ফি, আমদানি কর এবং জ্বালানি কর বাড়ানো হচ্ছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছে উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা। পাশাপাশি সময় এবং জায়গা কম লাগে—এমন যাতায়াত মাধ্যম যেমন হাঁটা, সাইকেল প্রভৃতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে সেসব শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমে আসছে। সুতরাং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এনেছে। রাজধানী ঢাকার যানজট, জ্বালানি অপচয় ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করা অপরিহার্য। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গণপরিবহনের মানোন্নয়ন। সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আরামদায়ক গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হলে মানুষ স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বাস কিংবা মেট্রোরেল ব্যবহার করবে। উন্নতমানের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), মেট্রোরেল সম্প্রসারণ করলে যাত্রীদের নির্ভরতা বাড়বে। ঢাকার অবৈধ পার্কিং সমস্যা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে আরো উৎসাহিত করছে। রাস্তায় অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট পার্কিং জোনে উচ্চ হারে ফি ধার্য করতে হবে। এতে গাড়ি চালানোর খরচ বেড়ে যাবে এবং মানুষ বিকল্প পরিবহন বেছে নিতে বাধ্য হবে। পাশাপাশি শহরে নিরাপদ ফুটপাত, সাইকেল লেন ও পথচারীবান্ধব সড়ক উন্নয়ন করলে সংক্ষিপ্ত দূরত্বে গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা অনেকটা কমে যাবে। এতে যানজট কমার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও উন্নত হবে ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত হবে বলে প্রত্যাশা।










