দিনটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্য কাঠামো কতটা ন্যায়ভিত্তিক, উৎপাদক কতটা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে, শ্রমিক কতটা নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছেন এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে আনে। যদিও দেশে এ দিবস ঘিরে বিশেষ কোনো আলাপ-আয়োজন দেখা যায় না। এর একটি কারণ হতে পারে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাণিজ্যবান্ধব নয়। কেননা বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ গড়তে হলে ন্যায্যতা নিশ্চিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। বাণিজ্যের অধিকার সবার রয়েছে এবং এটি একটি সামষ্টিক কার্যক্রমের রূপ। অর্থাৎ বহুপক্ষ মিলে একটা বাণিজ্য গড়ে ওঠে। উৎপাদক থেকে শুরু করে বাজারজাত প্রক্রিয়া পর্যন্ত যারা যুক্ত থাকে, তারা সবাই এর অংশীজন। সুতরাং বাণিজ্যের সুফলও সবার সমভাবে প্রাপ্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিপণ্য যদি চড়া দামে বাজারে বিক্রি হয়, কিন্তু কৃষক তার উৎপাদিত ফসলে যথাযথ মূল্য না পান, তবে সেটি হবে এক ধরনের অন্যায্য বাণিজ্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে অন্যায্য বাণিজ্যের দৃষ্টান্তই বেশি। রফতানি খাতে নিবেদিত বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন, কর্মপরিবেশ পর্যালোচনা করলেও এটা অনুধাবন করা যায়। রানা প্লাজা ধস, তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনার পরও এ দেশের শ্রমিকরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না, বিচারও পান না।
কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি তথা ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ গড়ার ওপর জোর দিচ্ছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদরা। যদি বাণিজ্যের অংশীজনদের সুফল নিশ্চিত এবং তাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতের পথ সুগম করা না যায়, তবে ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি কঠিন হবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শ্রমনির্ভর রফতানিকারক অর্থনীতির দেশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেও ন্যায্য বাণিজ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের বিশ্ব ন্যায্য বাণিজ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘টুগেদার উই আর দ্য বিজনেস রেভল্যুশন’। প্রতিপাদ্যটির অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আরো একবার মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে, ব্যবসা কেবল মুনাফার বিষয় নয়। বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও সম্পৃক্ত এবং একটি সামষ্টিক কার্যক্রম। অর্থাৎ উৎপাদক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক, এমনকি ভোক্তাও এর অংশ। তাই সবাই মিলে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলক ন্যায্যভাবে বণ্টন হবে।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ‘মুক্ত বাণিজ্য’ ক্রমেই বিশ্বের উন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বহুজাতিক করপোরেশনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় পরিণত হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কঠোর পরিবেশ ও মানবাধিকারভিত্তিক আমদানিনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এসব মিলিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। এ বাস্তবতায় ন্যায্য বাণিজ্য কেবল একটি নৈতিক ধারণা নয়; বরং টেকসই অর্থনীতি ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত হয়ে উঠছে।
ন্যায্য বাণিজ্যের মূল দর্শন হলো যারা উৎপাদন করেন, যারা শ্রম দেন, যারা সরবরাহ ব্যবস্থার শেষ প্রান্তে অবস্থান করেন, তারা যেন বাণিজ্যের ন্যায্য সুফল পায়। অর্থাৎ কেউ যেন বৈষ্যম্যের শিকার না হন, বাণিজ্যের নামে শোষণের শিকার না হন। বিশ্ব ন্যায্য বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউএফটিও) এ লক্ষ্যেই ১০টি মৌলিক নীতি প্রণয়ন সামনে এনেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত উৎপাদকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, শিশু ও জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ করা, নারী-পুরুষের সমতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উৎপাদকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এ নীতিগুলো বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানদণ্ডও। ইইউ এরই মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলে মানবাধিকার ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে নতুন আইন এবং মানদণ্ড প্রণয়ন করছে। উন্নত বিশ্বে ভোক্তারাও এখন জানতে চায় তারা যে পোশাক পরছে, যে খাদ্য গ্রহণ করছে তার পেছনে শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কিনা। শিশুশ্রম ব্যবহার হয়েছে কিনা। উৎপাদন পরিবেশবান্ধব কিনা? অর্থাৎ পণ্যের সঙ্গে এখন উৎপাদনের নৈতিকতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশে ইতিবাচক রূপান্তর আনতে হলে এগুলো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতির প্রধানতম চালিকাশক্তি এখনো রফতানি, বিশেষ বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু বাস্তবতা হলো বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার বড় ভিত্তি এখনো সস্তা শ্রম। উৎপাদন ব্যয় কম রাখতে গিয়ে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনমানের প্রশ্ন দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছে। নানা শিল্প দুর্যোগ এ খাতের নির্মম বাস্তবতা বিভিন্ন সময়ে উন্মোচন করেছে। হাজার হাজার শ্রমিক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে শ্রমিকদের ভুক্তভোগী করবেন, সেটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন আবশ্যক।
এখানেই ন্যায্য বাণিজ্যের গুরুত্ব নিহিত। যদি উৎপাদক ও শ্রমিকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না। দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতের পেশাজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, আয় বৈষম্য দূর ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
দেশে ন্যায্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাজ করা কিছু প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে কার্যক্রম চালালেও সাধারণ ব্যবসায়ী সমাজ কিংবা ভোক্তাদের মধ্যে এ ধারণা এখনো ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়নি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্যই উদ্বেগের। অন্যায্য বাণিজ্য অস্থিতিশীলতা বয়ে আনে, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। ন্যায্য বাণিজ্যের নীতিগুলো বাস্তবায়নের পথে দেশ এগোবে এটা কাম্য। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে এর আনুষঙ্গিক হিসেবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সহজ হবে, যা টেকসই বাণিজ্য কাঠামোর জন্যই অপরিহার্য।










