এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতির অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই

এবারের প্রস্তুতি আমাদের ভালোই ছিল। যদিও খুব অল্প সময় পেয়েছি এ বছর। সাধারণত এ প্রস্তুতির জন্য অন্তত ২০ থেকে এক মাসের সময় প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ১৫ দিনের মধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছেন অনেক শিল্পী। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা কাজে অংশ নিয়েছেন। দেশবরণ্য শিল্পীরাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এমনকি অন্যান্য শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী-শিল্পীরাও এসেছিলেন। অর্থাৎ সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বৈশাখী শোভাযাত্রার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

প্রতি বছরই নববর্ষ উদযাপন, বিশেষত শোভাযাত্রার নাম ঘিরে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা, তর্কবিতর্ক চাঙ্গা হতে থাকে, বিভিন্ন পক্ষ তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা। নানা মহলের এ ধরনের চাপ সামলে কীভাবে প্রস্তুতি নেন?

নববর্ষ বরণের শোভাযাত্রা বা এর নাম ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ তৈরি হয় ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। কেউ ‘মঙ্গল’ শব্দ পছন্দ করে, কেউ ‘আনন্দ’ পছন্দ করে। এগুলো ভিন্ন মত, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি—এটা থাকতেই পারে। কারণ শুরুতেও এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু আমাদের নববর্ষ উদযাপন করতেই হবে। আমাদের চেতনার জায়গাটা হলো আমরা নববর্ষ উদযাপন করছি, বাংলা নববর্ষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাব। এখানে নাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে আমাদের মনোভাবটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আসলে কী করতে চাইছি, আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক কাজটা করতে পারলাম কিনা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আনতে পারলাম কিনা, বহু মানুষের সমাগম হলো কিনা এবং সবাই সবার জন্য শুভকামনা করতে পারলাম কিনা এ জায়গাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। নাম পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু কাজটা কী করছি সেটাই আসল বিষয়। শোভাযাত্রার পরম্পরা ও তাৎপর্য বজায় রাখা এবং সেটাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করাই বেশি জরুরি।

নাম পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় আলোচনায় আসে—ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে এটি স্বীকৃত। তাহলে নাম পরিবর্তন হলে সেখানেও নাম পরিবর্তন হবে কিনা বা এতে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে কিনা?

না, ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো আপত্তির বিষয় নেই। রাষ্ট্র চাইলে নাম পরিবর্তন করতে পারে। শুধু ইউনেস্কোকে অবহিত করতে হবে। আমরা ইউনেস্কোকে জানাব। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকবে, আর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজটি করবে। মূল বিষয় হলো যে বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি স্বীকৃতি পেয়েছে, তা আমরা বজায় রাখছি।

এ বিষয়ে কি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?

এটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেখবে। আমাদের সহযোগিতা থাকবে। বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও যুক্ত থাকবে। আমরা তাদের অবহিত করব, তাহলেই বিষয়টি সম্পন্ন হবে।

এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ রাখা হয়েছে—লাল সূর্যসহ মোরগ, কাঠের হাতি, শান্তির পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন?

মোরগটি গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতীক। ভোরবেলা মোরগের ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙে, নতুন দিনের সূচনা হয়। এর পেছনে লাল সূর্য থাকবে, যা নতুন সকাল ও নতুন বছরের প্রতীক। আমরা এ মোটিফের মাধ্যমে নতুন সূর্যকে আহ্বান জানাচ্ছি, নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছি। অতীতের সবকিছু পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাও এতে রয়েছে। এটি খুবই রঙিন ও দৃষ্টিনন্দন হবে, কারণ লোকশিল্পে রঙের ব্যবহার সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।

দোতারা রাখা হয়েছে লোকসংগীতের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে। আমাদের বাউলশিল্পীরা অনেক সময় অবহেলিত থাকেন—তাদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন হয় না। তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা দোতারা রেখেছি। প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব সুর ও আবেদন আছে—ঢাক, ঢোল, তবলা, বেহালা—সবকিছুর মতো দোতারারও আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

শান্তির পায়রা রাখা হয়েছে শান্তির বার্তা দেয়ার জন্য। নববর্ষ এমন একটি উৎসব, যেখানে সব ধর্ম ও মতের মানুষ একত্র হয়। এখানে কোনো বিভাজন নেই। তাই সবার জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা আসুক—এ বার্তা দেয়ার জন্যই পায়রাটি রাখা হয়েছে।

ঘোড়াটি কিশোরগঞ্জের টেপা পুতুলের আদলে তৈরি করা হচ্ছে। আর সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাতির আদলেও একটি মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া পটচিত্র ও স্ক্রল পেইন্টিংও থাকবে, যা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে।

আমরা গ্রামে বৈশাখী মেলায় পোড়ামাটির খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রী দেখি। কিন্তু শহরে এগুলোর সমাহার কি কমে যাচ্ছে?

হ্যাঁ, কমে যাচ্ছে। মাটি, কাঠ, বাঁশ-বেতের তৈরি লোকজ পণ্য এখন আগের মতো নেই। যদিও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু অনেক কারিগর আগ্রহ হারাচ্ছেন। কারণ তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। যদি সরকার এ খাতে আরো গুরুত্ব দেয়, তাহলে এ ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

চারুকলা অনুষদের এক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে?

এটি একটা একাডেমি। এখানে লোকজ শিল্প পড়ানো হয়। লোকশিল্পের নানা বিষয় আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাই। সচেতন এ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। খেয়াল করবেন বর্ষবরণের শোভাযাত্রায়ও লোকশিল্পের বিষয়গুলোকেই তুলে ধরা হচ্ছে। কারণ এটা আমাদের অতীত ঐতিহ্য, গর্ব করার মতো একটা বিষয়। সারা বিশ্বে আমাদের লোকশিল্প, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। ফলে আমরা লোকশিল্পের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছি। এখান থেকে নতুন প্রজন্ম বার্তা পাচ্ছে, লোকশিল্পের গুরুত্ব ও তার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারছে। এভাবেই আসলে লোকশিল্পী ঘিরে সচেতনতা তৈরি করা হয়। ধীরে ধীরে এ সচেতনতা বাড়বে। দেশের জিনিসপত্রের কদর আছে। প্রচুর পরিমাণ পণ্য রফতানিও হচ্ছে। দিন দিন সে জিনিসগুলো বাড়বে বলে মনে করি। তবে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে লোকশিল্পকে লালন করার একটা প্রসঙ্গ আছে। শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখার একটা প্রসঙ্গ আছে।

বিগত সময়ে দেশে মবের অনেক ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রসনও দেখা গেছে। এবারের বর্ষবরণ আয়োজন ঘিরে বা সামগ্রিকভাবে চারুকলা অনুষদের ওপর কি কোনো চাপ ছিল?

আমরা সরাসরি কোনো চাপের মুখে পড়িনি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেমন বাউলদের ওপর আক্রমণ। এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়। আমরা আশা করি, নতুন সরকার সংস্কৃতিচর্চার জন্য একটি নিরাপদ ও মুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।

এবার বর্ষবরণের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’-এর পেছনের ভাবনা কী?

দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত ছিল। এখন নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এসেছে, মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই এ নববর্ষ সে প্রত্যাশার প্রতীক হোক। অতীতের সীমাবদ্ধতা পেছনে ফেলে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। এজন্য এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সবশেষে নববর্ষ উপলক্ষে আপনার বার্তা কী?

সবাই ভালো থাকুক, নিরাপদে থাকুক, আনন্দে থাকুক এ কামনাই করি। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশ করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা ধীরে ধীরে আলোর পথে এগিয়ে যাব।

দোসরা বৈশাখে চারুকলা অনুষদের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে। তৃতীয় বৈশাখে পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারা যাত্রা পরিবেশন করবেন। আমাদের লোকসংস্কৃতির এ গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই এ আয়োজন। আমরা চাই বিশুদ্ধ শিল্পচর্চা হোক। সেটা মাথায় রেখে আমরা আয়োজনগুলো করছি। সবাইকে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।