চলতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৭৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন হচ্ছে (মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশেরও কম)। অথচ তুলনামূলকভাবে কম সম্পদ থাকা পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছয় হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। দেশটির সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এরই মধ্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এরই মধ্যে ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। ভিয়েতনামও বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য সূত্রগুলো থেকে। বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (স্রেডা) ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপে ২০৪১ সাল নাগাদ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ আহরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু এ রোডম্যাপ ঘোষণার কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও এ লক্ষ্য পূরণে উপযুক্ত কর্মসূচি নেয়া হয়নি।
দেশের বড় নগর ও মফস্বল শহরগুলোর বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বসতবাড়ির ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে সাত-আট হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অসম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-দাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা। ২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর সূর্যোদয় যোজনা’ বা ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’ চালুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে। সেখানে ৪৭ হাজার ভারতীয় রুপি খরচ করে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষম সোলার প্যানেল বাড়ির ছাদে বসানোর সুযোগ দেয়া হয়। এজন্য যোজনার কাছে আবেদনের সব নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, ভোক্তা ও সোলার প্যানেল স্থাপনকারীকে মাত্র ২৯ হাজার ভারতীয় রুপি খরচ করতে হবে। বাকি ১৮ হাজার রুপি ভর্তুকি দেবে সরকার। প্রায় এক কোটি পরিবার এ উদ্যোগের আওতায় আসে। এ ধরনের মডেল বাংলাদেশেও বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতাকে সবসময় কারণ বলে উপস্থাপন করা হয়। তবে ধারণাটি ভুল। কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এজন্য যথাযথ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে চারটি আমদানীকৃত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রত্যেকটিই মেগা প্রকল্প। এগুলো থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্লান্টগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়েই বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের ওপরও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেকখানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মারাত্মক ধস নামায় এ বর্ধিত দামে এসব বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি সক্ষমতা অনেকটা সংকুচিত। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণনীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতি ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতিকে মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে। ফলে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও কয়লার অভাবে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা হচ্ছে আমদানীকৃত কয়লানির্ভর বিদ্যুতের মেগা প্রকল্প স্থাপন দেশের জন্য অসহনীয় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আছে ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে অত্যন্ত অন্যায্য শর্তে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিটি। এ চুক্তি থেকে বেরোনোর কোনো উপায় এখনো খুঁজে পায়নি বিএনপি সরকার। চুক্তির শর্ত মোতাবেক ঝাড়খণ্ডে আদানির গড্ডা প্রকল্প থেকে অনেক বেশি দামে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতেই হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের জ্বালানি পণ্য সরবরাহ ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে। এলএনজিচালিত অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অচল হয়ে আছে। প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন থাকলেও বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। এ সংকটে প্রধানত দায়ী আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদননীতি। পাশাপাশি এখন কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী কয়েকজন এলএনজি আমদানিকারককে অন্যায্য সুবিধা দিতেই আমদানিনির্ভর নীতিমালা নেয়া হয়। ফলে একদিকে ইচ্ছাকৃত অবহেলার শিকার হয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান, অন্যদিকে যথাযথ অগ্রাধিকার পায়নি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। দেশের স্থলভাগে ১৬ বছরে কয়েকটি ছোট ছোট গ্যাসকূপ ছাড়া উল্লেখযোগ্য তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে বলা হলেও সেখানকার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনার কাজ শুরু হয়নি। ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ পায়। কিন্তু মামলা জেতার পর ১২-১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কর্মসূচি চালানো হয়নি। ২০২৩ সালে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল। কিন্তু সাড়া মেলেনি। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে পাঁচ টিসিএফের বেশি গ্যাস আহরণ করছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় থাকায় সেন্ট মার্টিন এলাকার সমুদ্রেও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। এদিকে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের গোদাবরী বেসিনে এরই মধ্যে বিশাল গ্যাস ও তেলক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। নতুন সরকার অনতিবিলম্বে সমুদ্রের ব্লকগুলোয় গ্যাস অনুসন্ধানে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ব্যবস্থা নেবে, এমনটি এসব সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রত্যাশিত।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সফলতার গল্প দেখতে হবে। ওই অভিজ্ঞতার নিরিখে আমাদের নিজস্ব নীতিমালা গড়তে হবে। ভারতের মতো ‘প্রধানমন্ত্রী সূর্যোদয় যোজনা’ জাতীয় উদ্যোগ অবিলম্বে বাংলাদেশে চালু করার আশু প্রয়োজন অনুভব করছি। বাড়ির মালিকদের জন্য এ ভর্তুকি কর্মসূচি তাদের অবিলম্বে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করবে। চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন ও জার্মানি ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার উৎপাদনে চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছে। সোলার প্যানেল ও ‘ব্যাটারি’র দামে সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি প্রদান এবং ভর্তুকি-দামে ‘নিট মিটারিং’ স্থাপনে প্রণোদনা প্রদান এসব দেশের সাফল্য অর্জনের প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ‘নিট মিটারিং’ প্রযুক্তি চীন থেকে এখন সুলভে আমদানি করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অগ্রগতি একেবারেই কম। রূপপুর পরমাণু শক্তি কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য আমরা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছি। ২০২৫ সাল নাগাদ এটি থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ বছর আগস্টের আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে। অথচ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যয় রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের মোট ব্যয়ের অর্ধেকও হতো না। সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ও ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তি। গণচীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এরই মধ্যে বাংলাদেশী হিসেবে ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে, এমনটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত। ব্লুমবার্গের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০৩০ সালে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ ডলার। এদিকে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা পড়বে ৯৪ ডলার এবং কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১১৮ ডলার।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক খালি জায়গা লাগে বিধায় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তা উৎপাদন সম্ভব নয় বলে যে ধারণা রয়েছে তা ঠিক নয়। বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলো, দেশের সমুদ্র-উপকূল এবং নদ-নদী ও খালগুলোর দুই পারে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। বঙ্গোপসাগরে দেশের সীমানায় যে কয়েকশ চর গড়ে উঠছে, সেগুলোয় জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে। তাহলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। দেশের বিশাল সমুদ্র-উপকূলে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা নিলে জমি স্বল্পতার সংকট এড়ানো সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন চরগুলো এক্ষেত্রে আরো সম্ভাবনার আভাস দেয়। এগুলোয় মানববসতি না থাকায় ভূমি অধিগ্রহণে ঝামেলা হবে না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ-গ্রিডে নিয়ে আসাও ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা নয়। ডেনমার্ক বাংলাদেশের সমুদ্র-উপকূলে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ প্রস্তাব আওয়ামী লীগ সরকারকে দিয়েছিল। সেটি অবিলম্বে নেয়া যেতে পারে।
নতুন সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য নীতিমালা ঘোষণা করেছে। কিন্তু বেসরকারি স্থাপনার ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার পাওয়ার যোজনার’ আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রণোদনা প্রদানে কোনো নীতিমালা গৃহীত হয়নি। এমন অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়। ‘নিট মিটারিং’ প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত ভর্তুকি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কেন অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। এজন্য অবিলম্বে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা জরুরি।
ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










