জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষিপণ্যের দামও হুহু করে বাড়ছে। আপাতদৃষ্টে আশু সমস্যা সমাধানে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনমূলক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, এমনকি জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও দুর্ভোগ এখনো কমেনি। ডিজেলনির্ভর পণ্যবাহী যানবাহন থেকে শুরু করে গণপরিবহন, সেচ পাম্প থেকে খামার যন্ত্রপাতি—সবকিছুতেই মূল্যবৃদ্ধির ছাপ পড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে বাজারের পণ্যে এবং সবশেষে সব পরিবারের বাজারের থলেতে।

জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদনশীল খাতগুলোর ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন মূল্য সমন্বয় করলেই হয় না। মূল্যের প্রভাব ব্যবস্থাপনাকেও বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয়। এজন্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কেবল যাতায়াত ভাড়া বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকে সরাসরি আঘাত করছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বেড়েছে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। এ দ্বিগুণেরও বেশি পার্থক্য নিছক বাজারের অসংগতি নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহন খাতের চিরপরিচিত সুযোগসন্ধানী আচরণের প্রতিফলন। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লে সমগ্র পরিবহন ব্যয় ৩৫ শতাংশ বাড়ার কোনো হিসাব নেই। পরিবহনের অন্যান্য খরচ— চালকের বেতন, টায়ার, রক্ষণাবেক্ষণ এগুলোর কোনোটিই রাতারাতি পাল্টায়নি। বিআরটিএও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এদিকে দেশের কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খল মূলত সড়কপথনির্ভর। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্য পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। এজন্য পরিবহন ব্যয় সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরলরেখায় ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রভাব বহুমাত্রিক। একদিকে কৃষক তার ফসল বাজারজাত করতে বেশি খরচ করে লোকসানের মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে ভোক্তা বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ‘দুই দিক থেকে ক্ষতি’র পরিস্থিতি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিআরটিএর নিজস্ব কমিটি পরিবহন ব্যয় ২২ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে গতকাল সরকার সেটি অর্ধেক করে ১১ পয়সায় নামিয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরে ভাড়া ২ দশমিক ৪২ থেকে ২ দশমিক ৫৩ টাকা, আন্তঃজেলায় ২ দশমিক ১২ থেকে ২ দশমিক ২৩ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। শতাংশের হিসাবে পরিবহন ব্যয় ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হারে বেড়েছে। আপাতদৃষ্টে এ হার ক্ষুদ্র মনে হলেও এর রেশ কতটা সুদূরপ্রসারী তা বিবেচনা করা জরুরি। ভাড়া বাড়ানোর নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যাত্রীদের ওপর সম্পূর্ণ বোঝা না চাপিয়ে একটি মধ্যবর্তী অবস্থান নিয়েছে। এটি ইতিবাচক। অন্যদিকে বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবহন মালিকদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, এ ব্যয় বৃদ্ধি তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়, দেশে গণপরিবহনের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বরাবরই ভিন্ন। যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আদায়ের প্রবণতা পুরনো। কারণ এ বৈধ ভাড়া ও অবৈধ আদায়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটি পূরণ করার কোনো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। অবশ্য রেল ও লঞ্চ ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তির হলেও দীর্ঘমেয়াদে এসব খাতেও চাপ তৈরি হবে। আবার পণ্যবাহী যানের (ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান) ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় সেখানে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা সবসময় থাকে। ফলে পরিবহন ব্যয় সামান্য বাড়ার পর অনেক রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের উদ্বেগ যাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এ উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে কেবল ভাড়া নির্ধারণ করেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়নি। এ ভাড়া মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে কিনা, সেটিও কঠোরভাবে তদারকি করা জরুরি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ানো সরকারের জন্য অনিবার্য সিদ্ধান্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে কিছু ঝুঁকিও এখানে রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি কাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করতে হয়। প্রথমত, পরিবহন খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। বিআরটিএ পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইনি কাঠামো থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। ফলে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লে ভাড়া ৩৫ শতাংশ বাড়িয়েও পার পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহে অব্যবস্থাপনা। পাম্পগুলোয় চাহিদার মাত্র অর্ধেক তেল পাওয়া যাচ্ছে। এ কৃত্রিম সংকট পরিবহণ মালিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত, দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলের অতিমাত্রায় সড়কনির্ভরতা। রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা না বাড়ায় সব পণ্যের ভাগ্য একটিমাত্র চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এজন্য তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পাম্পে তেলের সংকট দূর না হলে পরিবহন ভাড়া কোনো নির্দেশেই কমবে না। পাশাপাশি বিআরটিএকে পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া অতিরিক্ত বাড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো সংকট নিরসনে ভর্তুকি বা অভ্যন্তরীণ কৌশল নিয়েছে। এভাবে খুচরা বাজারে দামের আঘাত সরাসরি জনগণের ওপর পড়তে দিচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশে ‘অটোমেটিক প্রাইসিং’ ফর্মুলা সাধারণ মানুষকে সরাসরি অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলছে। বিশেষত পণ্যবাহী যানের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কাঠামো না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে স্থানীয় বাজারে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যুক্তিযুক্ত নয়। সরকার বর্তমানে ‘অটোমেটিক ফুয়েল প্রাইসিং’ বা স্বয়ংক্রিয় মূল্যনির্ধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করছে। এর উদ্দেশ্য ভর্তুকির বোঝা কমানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি স্থানীয় বাজারের সাধারণ মানুষের ওপর চলে আসছে। অথচ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো জ্বালানি দাম বাড়লেও ‘সামাজিক সুরক্ষা জালে’ বড় ধরনের বিনিয়োগ করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করে। বাংলাদেশে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে। কারণ দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হচ্ছে সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচ। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই সেচের খরচ বৃদ্ধি, ট্রাক্টরের ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত ফলন কাটার পর তা বাজারে আনার পরিবহন খরচ বৃদ্ধি। সরকার যখন টিসিবি বা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তার কথা বলছে, তা প্রশংসনীয় হলেও বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় তা যৎসামান্য। এ বাস্তবতা বিবেচনা করে কৃষি খাতে জ্বালানি ভর্তুকি বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সাধারণ মানুষ যখন আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে, তখন নতুন করে পরিবহন ও খাদ্যের দাম বাড়া তাদের জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে নামিয়ে দিতে পারে। এদিকে জ্বালানি সংকটের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম আরো বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। কাঁচামাল পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক কিছু হবে না। এজন্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে কিছু কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। যেমন দেশে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ এখনো নগণ্য। চাল, গম, সার ও ভোগ্যপণ্যের মতো বাল্ক পণ্য রেলে সরানো গেলে সড়কের ওপর চাপ কমত, পরিবহন ব্যয় কমত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এতটা তীব্র হতো না। নৌপথের পুনরুজ্জীবনও একই কারণে জরুরি। এছাড়া স্থানীয় বাজার ও কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকের পণ্য দীর্ঘ পরিবহন ছাড়াই বিক্রি করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। জ্বালানি মূল্যনির্ধারণে একটি স্বচ্ছ, পূর্বনির্ধারিত সূত্র চালু করা দরকার। এভাবে হঠাৎ বড় মূল্যবৃদ্ধির বদলে ক্রমান্বয়ে সমন্বয় হয় এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কম লাগবে।