পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ডারহামে পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন। এছাড়া তিনি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সানেম, ক্লাইম্যাট ফাইন্যান্স এশিয়ার মতো গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। দেশে জ্বালানি খাতের সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা করেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার যে ধাক্কা, তা সামলানো অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অভ্যন্তরীণভাবে আসলে এ সংকটটা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? দীর্ঘমেয়াদে সমস্যাটি কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে যে সংকট অর্থাৎ ‘‌অয়েল শক’ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলছে তা বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে স্বীকার করতে হবে, আমরা এখনো একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি অনুসরণ করছি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ও বহুমুখী প্রভাব ফেলে। বিশ্ববাজারে অয়েল প্রাইস শক সচরাচর নেগেটিভ সাপ্লাই শক তৈরি করে। এটার ফলে বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়ে। প্রথমত, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশে দ্রুত কস্ট পুশ ইনফ্লেশন তৈরি হয়। কৃষি বা ব্যবসা খাতে পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে থাকে। সম্প্রতি লিটারপ্রতি সব জ্বালানির দাম ১৫ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুতের দামও বাড়বে সামনে। এমনটা হলে শিল্প খাতেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে বাধ্য। এভাবে বাড়তি খরচ ভোক্তার ওপর আস্তে আস্তে চলে আসতে শুরু করে। আর মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকে। বাংলাদেশে এ পাস থ্রু ইফেক্ট তুলনামূলকভাবে বেশি। এটা মূল্যস্ফীতিকে স্থায়ী করে তোলে। আবার জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং এখন পড়ছেও। জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় বাড়া মানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়া। যেহেতু চাহিদা বেশি তাই টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় আরো বাড়ে। এটা খরচের এমন এক ভিশাস সাইকেল তৈরি করে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে তোলে।

এখন সরকার সাধারণত এমন চাপ সামলাতে জ্বালানিতে ভর্তুকি দিতে থাকে। এটা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা রাজস্ব ঘাটতি বাড়ায়। আমাদের ঋণনির্ভর করে তোলে। আমরা বহুবার গবেষণায় দেখেছি, সংকটকালীন এ সময়ে আশু নীতিগত প্রক্রিয়া ও সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। কিন্তু ফিসক্যাল সাস্টেইনেবিলিটি বা রাজস্ব স্থায়িত্বের ওপর চাপ বাড়ায়। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব নিরাপত্তা পড়ে ঝুঁকির মধ্যে। এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এ শক শুধু স্বল্পমেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকে না। আসলে দেশের জ্বালানি খাতে ব্যবহারের তীব্রতা (এনার্জি ইনটেনসিটি) অনেক বেশি। কিন্তু জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা বা দক্ষতা (এনার্জি এফিশিয়েন্সি) অনেক কম। তাই যখন জ্বালানি খাতে অস্থিরতা দেখা দেয় তখন এর প্রভাব অনেক দিন অব্যাহত থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার স্বল্পমেয়াদে কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। টার্গেটেড সাবসিডি, ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় এবং সামাজিক সুরক্ষা—এগুলো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অবশ্যই। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য আমাদের সুস্পষ্ট স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশনের দিকে এগুতে হবে। এক্ষেত্রে জ্বালানি মিশ্রণের বহুমুখীকরণ, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার সপ্রসারণ এবং সর্বোপরি এনার্জি এফিশিয়েন্সি বাড়ানো জরুরি পদক্ষেপ। আমার পর্যবেক্ষণ হলো যদি আমরা এখনই জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর দিকে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে থাকি, তাহলে ভবিষ্যতে অয়েল প্রাইস শক কেবল একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও উন্নয়নগত সংকটে রূপ নিতে পারে।

সংকটের এ সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রসঙ্গটি ব্যাপকভাবে আলোচনায়। এ রূপান্তরে আসলে আমরা কতটা প্রস্তুত? বিশেষত সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কোন নীতিগত বাধাগুলো সবচেয়ে বড় বলে আপনি মনে করেন?

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎস সৌরশক্তি বা সোলার এনার্জি। যদিও আমাদের জমির স্বল্পতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবু রুফটপ সোলার এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ বা ফ্লোটিং সোলারের মাধ্যমে আমরা এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারি। বিশেষ করে শিল্প-কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে আমরা ন্যাশনাল গ্রিডের ওপর চাপ অনেকটা কমাতে পারি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো যে ঝুঁকির মুখে পড়ে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেই ঝুঁকি থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে পারে। একে আমরা বলছি ‘এনার্জি ইনডিপেনডেন্স’ বা জ্বালানি স্বাধীনতা। তবে এ পথে কিছু প্রযুক্তিগত এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন সোলার বা উইন্ড এনার্জির ইন্টারমিটেন্সি বা অনিয়মিত সরবরাহ। এটি মোকাবেলার জন্য আমাদের উন্নত ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম এবং একটি স্মার্ট গ্রিড অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের তিনটি দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, এ খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সহায়ক নীতি ও ইনসেন্টিভ দিতে হবে। এ ধরনের প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করতে হবে। সর্বোপরি এ অবকাঠামোকে আমাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গবেষণায় আরো গুরুত্ব দিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে আমাদের টেকসই এবং সবুজ জ্বালানির দিকে পদার্পণ করতেই হবে। এটি কেবল একটি বিকল্প নয়, এটিই এখন আমাদের জন্য একমাত্র পথ।

দেশে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে দেয়া ক্যাপাসিটি পেমেন্ট নিয়ে বিতর্ক আছে। এমনটা কেন? এছাড়া নতুন সরকার আসার পর বিতর্ক আরো জোরালো হয়েছে। এ মুহূর্তে এসব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ কি আছে?

সাধারণত শিল্পমালিকরা নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় নিজেদের কারখানায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন। এটিকে আমরা ক্যাপটিভ পাওয়ার হিসেবে চিনি। প্রথমত, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলো মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে গ্যাসের সংকট বাড়ছে এবং গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, তাতে এ মডেলটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে জ্বালানি দক্ষতার অপচয় অনেক ক্ষেত্রে বেশি হয় যদি না সেখানে ‘কম্বাইন্ড হিট অ্যান্ড পাওয়ার’ বা সিএইচপি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। আবার ন্যাশনাল গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন ও কোয়ালিটি বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ অন্তত ১০-১৫ শতাংশ কমানো যেত। কারণ ছোট ছোট ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার চেয়ে বড় পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ নেয়া অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে লক্ষ করছি, অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন ক্যাপটিভ সোলার বা হাইব্রিড মডেলের দিকে ঝুঁকছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। কারণ এটি কেবল গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমায় না, বরং পরিবেশগত মানদণ্ড বা কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতেও সাহায্য করে। এক্ষেত্রে সরকারকে গ্রিড কানেক্টিভিটি শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে যেসব কারখানায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, সেখানে ওয়েস্ট হিট রিকভারি সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা উচিত। এসবের জন্য নীতিমালায় সংশোধন জরুরি।

বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে। এ তিনটি সংকট পরস্পর সংযুক্ত, নাকি আলাদাভাবে মোকাবেলা করতে হবে?

আমার পর্যবেক্ষণ হলো এ সংকট কেবল সাময়িক কোনো ব্যবস্থাপনা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি টেকসই কাঠামোগত সংস্কার। যদি আমরা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, তা দিয়ে আমরা অবশ্যই এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসতে পারব। প্রথমত, আমাদের মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার নীতিতে আরো স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে হবে। টাকার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া বা একটি মার্কেট-বেজড এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। এটি রফতানি ও প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স বাড়াতে সহায়তা করবে, যা সরাসরি রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের রাজস্বনীতিতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে, যাতে সরকারকে ঋণ নেয়ার ওপর কম নির্ভর করতে হয়। তৃতীয়ত, আমদানির ক্ষেত্রে বিলাসদ্রব্য পরিহার করে কেবল প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং জ্বালানি আমদানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, আমদানির ওপর অতিরিক্ত কড়াকড়ি যেন আবার উৎপাদন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এছাড়া সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ বা ইজ অফ ডুইং বিজনেসের উন্নতি করতে হবে। কেবল ঋণের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে।

আপনার উত্থাপিত ডায়নামিক স্টকাস্টিক জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম (ডিএসজিই) মডেলে দেশের বাজার বিশ্লেষণ করেছেন। এ ধরনের মডেলিং কি দেশের নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে, নাকি গবেষণা আর নীতির মাঝে এখনো বড় ফারাক রয়ে গেছে?

ডায়নামিক স্টকাস্টিক জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম বা ডিএসজিই মডেল দেশের জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণ করে। এ মডেলটার মূল উদ্দেশ্য আসলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের আকস্মিক বদলের ফলে দেশীয় অর্থনীতির বিভিন্ন চলকে কেমন প্রভাব ফেলে তা গাণিতিকভাবে দেখা। আর এক্ষেত্রে অনেকগুলো জরুরি ফল বেরিয়ে এসেছে। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ে তখন আমাদের দেশের মানুষের ব্যক্তিগত ভোগ উল্লেখযোগ্য হারে কমে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রায় সবকিছুর দায় বাড়ে। আর বিপরীতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে। এটা দেশের সামগ্রিক চাহিদাকে সংকুচিত করে এবং ভোগান্তি বাড়ায়। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণভাবে নানা ধরনের ক্ষোভও বাড়ে। চাহিদা সংকুচিত হওয়ার আবার অপ্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব আছে। কারণ বিনিয়োগ কমে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমে এবং নতুন কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা চালু করার উৎসাহ থাকে না। অর্থাৎ মূলধন গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। এটা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিএসজিই মডেলটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কারণ এ ধরনের মডেলে সিমুলেশন-নির্ভর কিছু ফল পাওয়া যায়। এ মডেলটির একটি বড় শক্তি হলো বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কী ঘটছে সেটিই এর মাধ্যমে জানা যায় না। বরং ভবিষ্যতে কী ঘটবে তার পূর্বানুমানও পাওয়া যায়। তাই ডিএসজিই মডেল আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মুদ্রানীতির ভূমিকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেয় এবং সুদের হার অনেক বাড়িয়ে দেয়, তবে সেটি উৎপাদন বা আউটপুটকে আরো কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ এখানে একটি পলিসি ট্রেড-অফ তৈরি হয়। সবশেষে আমি লক্ষ করেছি যে এ ধরনের শক থেকে অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ সময় নেয়। এ যে রিকভারি পিরিয়ড বা মেমোরি ইফেক্ট, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। গবেষণালব্ধ ধারণাগুলো নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় প্রতিফলিত কতটা হয় বলা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশে যখন সিদ্ধান্ত বা নীতিমালা নেয়া হয় তখন এ ধরনের কোয়ান্টিটেটিভ মডেল তেমন গুরুত্ব পায় না। অথচ এ ধরনের মডেলের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এগুলো তাদের কিছু বার্তা দেয়। জ্বালানি তেলের দাম পরিবর্তনের প্রভাব কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি পুরো সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দেয়। তাই আমাদের এমন একটি সমন্বিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং প্রবৃদ্ধির গতিকেও ধরে রাখবে।