সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে ভ্রমণরত বিলাসবহুল ক্রুজ ‘এমভি হন্ডিয়াস’-এ হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত এখন পর্যন্ত এ রোগে তিনজনের মৃত্যু ঘটায় উদ্বেগের মাত্রা আরো বেড়েছে। ভাইরাস শনাক্তের আগেই জাহাজ ছেড়ে যাওয়া কয়েক ডজন যাত্রীর সন্ধানে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন তৎপর। এজন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জানিয়েছে সংস্থাটি। ভাইরাসটির প্রভাব বিচারে বাংলাদেশে এখনই উদ্বেগের কারণ না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা নানা সংকট বিবেচনায় নজরদারি বাড়ানোর তাগাদা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অতীতেও বহুবার এসব বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের উদ্বেগের বাস্তবিক প্রমাণও মিলেছে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে হান্টাভাইরাস সম্পর্কে সচেতন হয়ে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

হান্টাভাইরাস কোনো নতুন রোগ নয়। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগের নজরদারি শুরু হয়। এরপর ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। অঞ্চলভেদে এর ঝুঁকি আলাদা। যেহেতু এ ভাইরাসের স্বীকৃত কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই সঠিক সময়ে এটি শনাক্ত করা না গেলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। মূলত ইঁদুর বা এ-জাতীয় প্রাণী থেকে ভাইরাসটি মানুষের দেহে ছড়ায়। অঞ্চলভেদেও এ ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি আলাদা। আমেরিকা অঞ্চলে হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোমের কারণে মৃত্যুঝুঁকি ৩৫-৬০ শতাংশ। অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপে ঝুঁকি তুলনামূলক কম (১-১৫ শতাংশ)। এসব তুলনামূলক হার বিচারেও এবারের উদ্বেগের মাত্রা ভিন্ন। সরাসরি এ ভাইরাসে মানুষ সংক্রমিত হয় না। কিন্তু এবার সংক্রমণে চিহ্নিত হান্টাভাইরাসের উপধরনটি সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হচ্ছে। তাছাড়া এ সংক্রমণ ঘটেছে আন্তর্জাতিক এক ক্রুজ জাহাজে। সেখানে একই ছাদের নিচে ২৮ দেশের নাগরিক ছিলেন। সংক্রমণের আগেই অনেক যাত্রী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড দীর্ঘ হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই অজান্তে বাহক হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন। আক্রান্ত হলে উপসর্গ অনুযায়ী সামান্য চিকিৎসা দেয়া গেলেও অনেক সময় এসব উপসর্গকে ভিন্ন রোগের লক্ষণ বলে বিবেচনার ঝুঁকি থেকে যায়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, এ ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার অভাব। সাধারণত এর সংক্রমণে জ্বর, বমি দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া ও সর্দির মতো সমস্যা হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য অবশ্য হান্টাভাইরাস আতঙ্ক নয়। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে রোগটি প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। দেশের আন্তর্জাতিক বিমান বা সমুদ্রবন্দর দিয়ে প্রতিনিয়ত বহু মানুষ যাতায়াত করছে। এ যোগাযোগের পথে সংক্রমণ প্রবেশের ঝুঁকি আছে। তাছাড়া দেশের নগর-গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই ইঁদুরের উপদ্রব পুরনো সমস্যা। খাদ্যগুদাম, বস্তি এলাকা ও অপরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় ইঁদুরের অবাধ বিচরণ হান্টাভাইরাসের বাহক ইঁদুরের সংস্পর্শ বাড়িয়ে দিতে পারে। এদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। তাই সতর্কতা নয়, জরুরি প্রতিক্রিয়া কার্যক্রমও চালু করা জরুরি।

হান্টাভাইরাস প্রতিরোধে এখন থেকেই পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। করোনা মহামারীকালের মতো এবার বিমান ও সমুদ্রবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং তাপমাত্রা পরীক্ষা আবারো চালু করতে হবে। \বিশেষত যেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে এ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গেছে, সেসব দেশের যাত্রীদের ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো দরকার। সীমান্তবর্তী মাধ্যমে এ ভাইরাসের প্রবেশের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য পাশের দেশ ভারত, মিয়ানমারের পরিস্থিতির দিকেও শ্যেনদৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এজন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিতরণের পথ সুগম করতে হবে। এছাড়া দেশের ভেতরেও নজরদারি বাড়াতে হবে। দেশের যেকোনো প্রান্তে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হঠাৎ জ্বর-শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব হলে দ্রুত এপিডেমিক ইনভেস্টিগেশন টিম পাঠিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করতে হবে। এজন্য দেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। যেহেতু এ ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের ধারণা কম, তাই এ বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা নেয়ার সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে এ মুহূর্তে হামের প্রকোপ বাদেও ঠাণ্ডা ও সর্দিজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। হান্টাভাইরাসের উপসর্গগুলোকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রোগীদের সতর্কতা বাড়াতেই প্রচারে জোর দিতে হবে।

দেশে জনস্বাস্থ্য কাঠামোর পুরনো দুর্বলতা হলো প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে দেরি করা। তবে স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা বিবেচনায় সরকারের পক্ষে এখন দেরি করার সুযোগ কম। এখন থেকেই ‘প্রি-এমটিভ’ কিংবা আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে পদক্ষেপ নিতে হবে। হান্টাভাইরাস বা এ-জাতীয় সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে এখন থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য হান্টাভাইরাস শনাক্ত ও আইসোলেশন প্রোটোকল বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। হাসপাতালগুলোর আইসোলেশন ওয়ার্ড ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন করা জরুরি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দেশের জন্য একটি বড় সংকট। বিশেষত খাদ্যগুদাম কিংবা বাজার এলাকায় ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব বরাবরই বেশি। যেহেতু এ ভাইরাস ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই এসব স্থানে ইঁদুরের উপস্থিতি কমানোর পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এ রোগ প্রতিরোধে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চ পর্যায়ের জুনোটিক রোগ (প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ানো রোগ) পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে পারে। এ সেল নিয়মিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রাখবে। জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনাও দরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনগুলো একই ছাদের নিচে কাজ করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা স্পষ্টই জানিয়েছে, কভিডের মতো দ্রুত ছড়ানো ভাইরাস এটি নয়। তাও দীর্ঘ ইনকিউবেশন পিরিয়ড ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় এ ভাইরাসকে অবহেলার সুযোগ নেই। সতর্কতাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। হান্টাভাইরাসের বিষয়ে এখনই সচেতন হওয়া, প্রস্তুতি নেয়া এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দেয়া, এটাই বর্তমান সরকারের প্রথম দায়িত্ব।