অথচ শহর এলাকায় লেকগুলো শুধু নান্দনিক জলরাশি নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটানে প্রতি বর্গমাইলে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের বাস। কেন্দ্রীয় নগর এলাকার প্রায় ৮২ শতাংশ এলাকা এখন কংক্রিটে ঢাকা এবং প্রতি হাজার মানুষের জন্য মাত্র শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান রয়েছে, যা বাসযোগ্যতার নিরিখে পর্যাপ্ত নয়। এজন্য শহরের লেকগুলো এক ধরনের শ্বাসযন্ত্র। পরিবেশবিষয়ক গবেষকদের মতে, ঢাকার যেসব এলাকায় বড় জলাশয় বা পার্ক রয়েছে, ওই এলাকাগুলোর তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী ঘিঞ্জি এলাকার তুলনায় ১-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম হতে পারে। আপাতদৃষ্টে তাপমাত্রার এ পার্থক্য তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু যে শহরের তাপমাত্রা গত ১০ বছরে ১৭২টি তাপপ্রবাহ দেখেছে এবং ঢাকা শহরের কেন্দ্র যখন পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত গরম হতে পারে, সেখানে জলাশয়ের শীতলকারী ভূমিকা সামান্য বলা যাবে না। বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ লেক মৃত নয়, বরং মৃত্যুর মুখে। এ পার্থক্যটুকু অনুধাবন করে লেক সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
রাজধানীর লেকগুলোর বেহাল দশার পেছনে কারণ একটি নয়, বরং পরস্পর জড়িত অনেক ব্যর্থতার যোগফল। মূল সমস্যা হলো লেকের সঙ্গে অপরিশোধিত স্যুয়ারেজ বর্জ্যের সরাসরি সংযোগ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জরিপে দেখা গেছে, গুলশান লেকের আশপাশে প্রায় ৮৫ শতাংশ বাড়ির পয়োনিষ্কাশন লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে মিলেছে। ঢাকা ওয়াসা শহরের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছে। দাশেরকান্দিতে দক্ষিণ এশিয়ার একক বৃহত্তম শোধনাগার থাকলেও সংযোগ নেই। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘরের বর্জ্য পানি গিয়ে মিলছে লেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিক আগ্রাসন ও নাগরিক অসচেতনতা। লেকের জায়গা দখল করে ব্যবসা চলছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বসছে মেলা, তৈরি হচ্ছে পার্কিং লট। আবাসিক ভবনগুলো থেকে অবাধে সরাসরি প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য লেকে ফেলা হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধানমন্ডি লেকের প্রতি কেজি পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ৩০ হাজার। অথচ চীনের সবচেয়ে দূষিত সাংহাই নদীর তলদেশে এর পরিমাণ মাত্র ৮০২টি। এ তুলনাই নগরে লেক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দলিল। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, হাতিরঝিলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত জীবাণুর অস্তিত্ব মিলেছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকিস্বরূপ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন এ দূষণ ভূগর্ভস্থ পানি কিংবা রাস্তার হকারদের রান্নার মাধ্যমে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের গবেষণা বলছে, ঢাকার মাইক্রোক্লাইমেট নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপাদান গাছপালা নয়, জলাশয়। ফলে লেকগুলো নষ্ট হলে শহরের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। গবেষণা বলছে, তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক রোগ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়ে। আবার দূষিত লেক থেকে ভূগর্ভস্থ পানিতে বিষ মিশছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পানীয় জলের সংকট আরো গভীর করে তুলবে। নগরের এ লেকগুলো জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ হিসেবে কাজ করে। আচমকা বৃষ্টি বা বর্ষা মৌসুমে সড়কে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। লেকগুলো ভালো থাকলে বৃষ্টির পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে দূর করতে পারে।
শহরে লেক পুনরুদ্ধার এক ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগও। এক্ষেত্রে ভারতের হায়দরাবাদ শহর একটি উদাহরণ। জনঘনত্ব ও আর্থসামাজিক সমস্যা এবং শহরটির সঙ্গে আমাদের বেশ মিল রয়েছে। এ শহরের হুসেন সাগর লেক পুনরুদ্ধার করার পর প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘুরতে আসছে। বর্তমানে লেকের বার্ষিক অ্যামেনিটি বা সুযোগ মূল্য ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সমতুল্য। এছাড়া ভারতের চেন্নাই ২১০টিরও বেশি লেক ও পুকুর পুনরুদ্ধার করেছে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়ন এবং বহুস্তরীয় প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে। চীনের তাইহু লেক একসময় সর্বনিম্ন মানের দূষণে আক্রান্ত ছিল; জনসংখ্যা ও শিল্পায়ন অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও কঠোর নীতি ও আন্তরিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে লেকের পানির মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। ম্যানিলার পাসিগ নদী ১৯৯০ সালে ‘জৈবিকভাবে মৃত’ ঘোষণা পাওয়ার পরও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, বেসরকারি অর্থায়ন ও নাগরিক সম্পৃক্ততায় সেখানে আবার জলজ প্রাণের চিহ্ন ফিরেছে। ইন্দোনেশিয়ার লেক তোবা অঞ্চলে পর্যটননির্ভর উন্নয়নে ৮৭ কোটি ডলারের বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে, ১৮ হাজার মানুষ প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং ৯ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এসব শহরের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায় সম্পদের ঘাটতি নয়, বরং কর্মোদ্যোগ ও সদিচ্ছাই লেক পুনরুদ্ধারের মূল।
আবার উপরোক্ত উদাহরণ দেখে তুলনা করলে বোঝা যায়, ঢাকার হাতিরঝিল বা ধানমন্ডি লেকও বৈধ হকার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থার কেন্দ্র হতে পারত। এসব লেক সুস্থ থাকলে ওয়াটার ট্যাক্সি ও নৌকার মাধ্যমে বিকল্প নগর পরিবহনের সুযোগ বাড়ত, যা যানজটে জর্জরিত ঢাকার মানুষের জন্য সত্যিকারের স্বস্তি হয়ে উঠত। পাড় ঘিরে হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, পাখি দেখার এলাকা—এসব গড়ে উঠলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বিনোদনের সুলভ সুযোগ তৈরি হতো। ম্যানিলার পাসিগ নদী পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার সময় যখন ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল, তখন স্থানীয় মানুষের যাতায়াত সময় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। আমাদের শহরেও এ সম্ভাবনা এখনো আছে। অন্যদিকে লেকসংলগ্ন আবাসনের অর্থনৈতিক মূল্যও বিবেচনায় নেয়া দরকার। একসময় লেকভিউ অ্যাপার্টমেন্ট অন্য এলাকার তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হতো। আজ সে সম্পদমূল্য নষ্ট হয়েছে লেকগুলোর বেহাল দশার জন্য। লেক পুনরুদ্ধার মানে ঢাকার রিয়েল এস্টেট বাজার, পর্যটন খাত ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা।
ঢাকার লেকগুলোর বেহাল দশার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দায়ী। গুলশান লেক ও হাতিরঝিল রাজউকের অধীনে আর ধানমন্ডি লেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে। এদিকে পয়োনিষ্কাশন ওয়াসার হাতে। এমন বিভক্ত দায়িত্ব কাঠামো সংকট মোকাবেলাকে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় আটকে রেখেছে। এজন্য লেকগুলোকে পৃথকভাবে নয়, একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। এ কাঠামোয় রাজউক, দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও পরিবেশ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি স্যুয়ারেজ বিচ্ছিন্নকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। লেকে পয়োবর্জ্যের সংযোগ বন্ধ করা ছাড়া বাকি সব উদ্যোগ অর্থহীন। ঢাকা ওয়াসাকে স্পষ্ট সময়সীমা দিয়ে লেকসংলগ্ন এলাকায় পয়োনিষ্কাশন লাইন স্থাপন ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এটি ব্যয়বহুল হলেও এড়ানোর পথ নেই। ‘পলিউটার পেজ’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যে বাড়ি বা প্রতিষ্ঠান লেকে বর্জ্য ফেলছে, তার বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিধান কার্যকর করতে হবে। জরিমানা থেকে আসা অর্থ লেক পুনরুদ্ধার তহবিলে জমা হবে। লেককে প্রবাহমান রাখার ব্যবস্থা করা অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়সাপেক্ষ ও দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ।
লেকপাড়কে পরিকল্পিত ‘পাবলিক স্পেস’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। লেকের পাড়ে থাকতে হবে হাঁটার পথ, বসার জায়গা, নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র ব্যবসার অঞ্চল। এ পরিকল্পনায় আশপাশের বাসিন্দা, হকার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশীদার করতে হবে। আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়নের সুযোগ নেয়া দরকার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও জলবায়ু তহবিল থেকে নগর জলাশয় পুনরুদ্ধারে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেরও সে পথে হাঁটার সক্ষমতা আছে। লেক বাঁচানো কেবল পানি পরিষ্কার করার বিষয় নয়। এটি একটি শহরের মানুষের তাপ থেকে বাঁচার, বন্যা থেকে সুরক্ষার, মানসিক শান্তি পাওয়ার ও জীবিকার সুযোগ তৈরির বিষয়। সভ্য নগর গড়ার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের বিষয়টি মনে রেখে কর্মোদ্যোগ ও পরিকল্পনা নিতে হবে।










