মূলত সরকারের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যতা আনার ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমাদের এ দুটো বিষয়কে মোটাদাগে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ চ্যালেঞ্জটি এখন নানা কারণেই বহুমুখী আকার ধারণ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে ২০২৪-২৫ সালে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়, সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অথচ এর আগের বছর তা ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। এখানে রাজস্ব জিডিপির ক্ষেত্রেও আমরা এক ধরনের নিম্নমুখিতা দেখি। ২০২৩-২৪ সালে যা ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ তা পরের অর্থবছরে হয়ে যায় ৭ দশমিক ৮১। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এ পরিসংখ্যান লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। বিষয়টি শুধু রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাংক খাতও তারল্য সংকট, অব্যবস্থাপনাসহ নানা জটিলতায় ভুগছে। এসব জটিলতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে একাধিক ঝুঁকি। সেসব ঝুঁকির ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনাগত সংকটকেই বেশি দায়ী করতে হয়।
রাজস্ব আদায়ের প্রসঙ্গে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর যে বাজেট পেশ করেছিল তার পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারিত হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। আর মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এদিকে রাজস্ব আয় ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা এবং এক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। অতীতেও দেখা গেছে, মূল বাজেটের রাজস্ব আয়-ব্যয় সংশোধিত বাজেটের মাধ্যমে কমানো হয়েছে। ফলে প্রকৃত আর রাজস্ব ব্যয় হয়েছে আয়ের তুলনায় কম। এ ধারাবাহিকতা যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে তা জুলাই-ডিসেম্বর (২০২৫-২৬)-এর প্রাক্কলনেই দেখা গেছে। বিষয়টি সামষ্টিকভাবে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের জন্য ইতিবাচক নয়। নব্বইয়ের দশক থেকেই সরকার রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের কিছুটা বহন করতে পারত। পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। পরের অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) তা অব্যাহত থাকে। সারা বছরে যে রাজস্ব আয় সংগ্রহ হচ্ছে তা দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। এটি হলো একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট পথনকশা আমাদের গড়ে ওঠেনি।
বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজস্ব আহরণের ক্রমাগত অবনতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে মাত্র ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা রাজস্ব আহরিত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। বছর শেষে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বলতে গেলে অসম্ভব। অথচ পরিচালন ব্যয় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে—প্রশাসনিক ব্যয় গত বছরের তুলনায় ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে। সামনে এটি আরো বাড়বে এমনটি বলাই যায়। কারণ এখনো প্রশাসনিক স্তরে অনেকে যুক্ত হবেন, নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোর জন্য ব্যয় বাড়ছে। কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যাতে কেউ আসলে সুযোগ-সুবিধা নেই বলে অনিয়মে জড়াতে না পারেন। কিন্তু এসব উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও সরকারের পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। তাছাড়া সরকারের আর্থিক সংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উৎস ব্যাংক খাত এখন অনেক নাজুক অবস্থায় আছে।
সরকারের পরিচালন ব্যয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে আর্থিক খাতের অবনতি একটি বড় সংকট। ব্যাংক খাতের সংকট গভীর। গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণের ৩৫ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৪৪ লাখ কোটি টাকা খেলাপি। বাস্তবে এ পরিমাণ আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অনেক খেলাপি ঋণকে নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এ তারল্য সংকটে ব্যবসায় অর্থের জোগান ব্যাহত হচ্ছে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও অনুকূল নয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থির। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রফতানি আয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। এসব বিবেচনা করলে সরকারের পক্ষে নানাভাবে রাজস্ব আদায়ের পথ সংকুচিত হচ্ছে। যেসব পন্থায় রাজস্ব আদায় হচ্ছে বা এখনো যে রাজস্বগুলো আদায় হচ্ছে, তার বড় অংশই সাধারণ মানুষ, কর্মজীবীরা দিচ্ছেন।
নতুন সরকার বিএনপির ইশতাহারে কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ও খাল খনন কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পে-কমিশনের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় বহন করতে হবে। বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতিতে এসব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই এখনই প্রতিশ্রুতি পূরণের স্বার্থে নতুন পে-স্কেল নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। জরুরি ভিত্তিতে কিছু সেক্টরে ব্যয় সংকোচন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার এরই মধ্যে কৃচ্ছ্রসাধনমূলক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো ভালো। কিন্তু নানা মহল থেকেই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত, বেতন-ভাতা বাড়ানো এমনকি নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের দাবি আসছে। এসব এড়াতে হবে। তবে এড়ালেও এর ক্ষেত্রে বিবেচনা ও আশ্বস্তের জায়গা তৈরি করতে হবে। এ মুহূর্তে রাজস্ব আদায় কিংবা আর্থিক খাত দুটোতেই অনাস্থা একটি বড় সংকট। এ সংকট উত্তরণে সরকারকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়গুলো প্রভাবক হিসেবেই কাজ করবে। নতুন সরকারের করণীয় হবে একটি সুবিবেচিত ভারসাম্য বজায় রাখা। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য করের আওতা বাড়াতে হবে, করহার বাড়িয়ে নয়। করের হার না বাড়িয়ে আওতা বাড়ানোর সুবিধা হলো এটি পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ায়। ‘লাফার কার্ভ’ তত্ত্বের যুক্তিও আমাদের বলে, সুষম কর হার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজস্ব দুটোই বাড়াতে পারে। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে মুখ্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এনবিআরের ডেটাবেজের সঙ্গে ব্যাংক খাতের ডেটাবেজ (সিআইবি) ইন্টিগ্রেট বা সমন্বয় করা জরুরি। কেউ যদি ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করে কিন্তু কর রিটার্নে তা না দেখায়, তবে এ দুই খাতের সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
মুদ্রা ছাপিয়ে ব্যয় মেটানোর পথ নেয়া হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানের পরিবেশও এ মুহূর্তে অনুকূল নয়। তাই দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আদায় ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যয় নির্ধারণ—এ দুটোই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একমাত্র পথ। এক্ষেত্রে সরকারের জরুরি পরিচালন ব্যয়গুলোকেই গুরুত্ব দিতে হবে। বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাদ দিতে হবে। যেমন নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে অনেক প্রকল্প নেয়া হয়। এগুলোর অধিকাংশই পরিবেশ সংবেদনশীল এমনটি নয়। যে প্রকল্প বা সিদ্ধান্তগুলো সরকারের পরিচালন ব্যয় আরো বাড়াবে, সেগুলো এড়ানোই ভালো। নতুন সরকারের সফলতা নির্ভর করবে জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতির মোহ ত্যাগ করে বাস্তববাদী ও সুষম অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের ওপর। এটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে অপরিহার্য।
আমিনুর রহমান: জ্যেষ্ঠ পরিচালক, অ্যাকনাবিন ও সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)










