ইতিহাসে ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি আজ অনেকেই মনে করছেন, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতও হয়তো বিশ্ব ব্যবস্থায় তার অবস্থানকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। তবে এ তুলনা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবতা ততটাই জটিল।

সুয়েজ সংকটের সময় মিসর যখন খালটি বন্ধ করে দেয়, তখন তা শুধু একটি জলপথের অবরোধ ছিল না, বরং একটি বৃহৎ শক্তির অর্থনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেয়ার ঘটনা। ব্রিটেন তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ঋণ ও আর্থিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নেয়া ঋণ তার আর্থিক স্বাধীনতাকে কার্যত সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে সুয়েজ সংকট ব্রিটেনের পতনের কারণ নয়, বরং একটি পূর্বনির্ধারিত পতনের প্রকাশ ছিল।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সে অবস্থায় নেই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত ভুল, অস্থিরতা বা অবিবেচক সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো শক্তিশালী। এর মূল কারণ ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য। বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তার ঘাটতি অন্য দেশগুলোর উদ্বৃত্তের মাধ্যমে পূরণ হয়। অন্যান্য দেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালাতে ডলার অর্জন করতে হয়, ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ভার বহুলাংশে বাইরের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে—এ এক ধরনের ‘অসাধারণ সুবিধা’, যা ব্রিটেন কখনই অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাপী ডলারনির্ভর ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে জ্বালানি, অস্ত্র ও কাঁচামাল কেনার জন্য বিশ্বের বহু দেশকে ডলার ব্যবহার করতে হয়। এ বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক আর্থিক শক্তি দিয়েছে, যার কারণে শুধু একটি জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া তার আধিপত্যকে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে দিতে পারে না।

তবু ইরান সংকটের প্রভাব একেবারেই তুচ্ছ নয়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তেলের দাম বাড়ে, আর তার প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। যারা পরিবহন ও খাদ্য উৎপাদনের ব্যয়বৃদ্ধির বোঝা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সাধারণ মানুষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনে এখন অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা ব্রিটেনের ক্ষেত্রে ছিল না।

আর্থিক খাতেও পার্থক্য স্পষ্ট। সুয়েজ সংকটে লন্ডনের আর্থিক কেন্দ্র বড় ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াল স্ট্রিট বরং বাজারের অস্থিরতা থেকে মুনাফা করছে। বড় ব্যাংক ও করপোরেশনগুলো এ অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হচ্ছে, যদিও সাধারণ নাগরিকদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ বৈপরীত্য—যেখানে শাসক শ্রেণীর সম্পদ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু জনগণের দুর্দশা বাড়ে—যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এক গভীর সংকটকে তুলে ধরে, যা ট্রাম্পের উত্থানের অন্যতম কারণ।

তবে এ সংঘাতের একটি দীর্ঘমেয়াদি দিকও রয়েছে, যা আরো গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দ্বৈত অবরোধের পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনছে। অনেক দেশ এরই মধ্যে ডলারনির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তান তার শিল্প কাঠামোকে ধীরে ধীরে তেলনির্ভরতা থেকে সরিয়ে বিদ্যুৎনির্ভর অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চীনা সৌর প্যানেল ও রেনমিনবি-ভিত্তিক লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও। তারা বিকল্প অর্থনৈতিক ও আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে, যেমন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা, ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম, ব্লকচেইনভিত্তিক ব্রিকস পে, এমনকি উইচ্যাটের মতো প্লাটফর্ম। এগুলো এখনো ডলারের বিকল্প হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করার ঘটনা বিশ্বকে আরো একটি বার্তা দিয়েছে—আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতে পারে। এ বার্তা শুধু প্রতিপক্ষ দেশগুলোর নয়, বরং মিত্র দেশগুলোর কাছেও উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা নিজেদের সম্পদ সুরক্ষার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে। এসব পরিবর্তন একসঙ্গে ইঙ্গিত দেয় ডলারের আধিপত্য হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার দিকে বিশ্ব এগোচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় ইউরোপের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তাহলে প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সুয়েজ মুহূর্ত’? সম্ভবত নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো সে ধরনের আর্থিক ও কাঠামোগত দুর্বলতায় ভোগে না, যা ব্রিটেনকে ১৯৫৬ সালে বিপর্যস্ত করেছিল। তবে এটি ‘গ্যালিপোলি মুহূর্ত’ হয়ে উঠতে পারে—একটি এমন ঘটনা, যেখানে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়ন, এবং কৌশলগত বিভ্রান্তি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে অপ্রত্যাশিত বিপদে ফেলতে পারে।

১৯১৫ সালের গ্যালিপোলি অভিযানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ঠিক এ ভুলগুলোই করেছিল। একটি দুর্বল মনে হওয়া প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে তারা বড় ধরনের সামরিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার মুখে পড়ে। আজকের পরিস্থিতিতেও সে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অবমূল্যায়ন করছে, অথচ বাস্তবে এ সংঘাত তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

অতএব, ইরান যুদ্ধ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পতনের সূচনা নয়, কিন্তু এটি এমন একটি সংকেত, যা ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থায় ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের পথ তৈরি করছে। এ পুনর্বিন্যাস ধীর, জটিল ও বহুস্তরীয়; যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করছে। সে প্রক্রিয়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আগামী বিশ্বরূপ।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ইয়ানিস ভারুফাকিস: গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও মিরা টোয়েন্টি ফাইভ দলের নেতা। এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক