সর্বশেষ ৪৫তম বিসিএসের রেজাল্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পুলিশ ক্যাডারে প্রথম তিনজনই মেডিকেলের ছাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে আরো দেখা যাচ্ছে, বিসিএসের পররাষ্ট্র, পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারে প্রকৌশলী-ডাক্তারদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ছোটবেলায় কারো জীবনের লক্ষ্য রচনা লিখতে দিলে বেশির ভাগ ছাত্রের লেখায় আসত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হব। খুব কমই শোনা গেছে কেউ আমলা বা পুলিশ হতে চায়। আমাদের দেশে কিছু কিছু পেশার ক্ষেত্রে একসময় অনেক নেতিবাচক ধারণা ছিল, কিন্তু কালের আবর্তে সেটা প্রায় ঘুচে গেছে। পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারের যে বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধা বা আরেকটু খোলাসা করে বললে যে রকম ক্ষমতা তা দেখে ভবিষ্যৎ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা এ দুই ক্যাডারে আসার জন্য নিজেদের ব্যাপকভাবে প্রস্তুত করে তুলছে, যার ফলে আজ বিসিএস রেজাল্টে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই অনেকেই স্বীকার করবেন যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা যদি পণ করে বিসিএস দিয়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে আসতে চায় তবে তাদের ঠেকানো অবশ্যই মুশকিল হবে। তবে আমার আলোচনার বিষয় হলো, কেন মহৎ পেশা ছেড়ে ছাত্ররা প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে আসতে চায় তা পর্যালোচনা করা এবং এর সম্ভাব্য প্রতিকার বের করা। প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারের সীমাহীন ক্ষমতা এবং অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে এই ক্যাডারের বৈষম্য সমাজের মেধাবী ছাত্রদের আকৃষ্ট করছে।
কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের বৈষম্য পেশাজীবীদের মাঝে মানসিক অসন্তোষ তৈরি করে। একজন ডাক্তার হাসপাতালের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেও বৃহত্তর প্রশাসনিক ক্ষমতা তার হাতে থাকে না। একজন ইঞ্জিনিয়ার প্রকল্প পরিচালনা করতে পারেন, কিন্তু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা সীমিত। বিপরীতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ডিসি বা ইউএনও প্রশাসনিক, উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এ ক্ষমতার পার্থক্য অন্য ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তার কাছে বৈষম্য বলে মনে হয়, যা তাদের প্রশাসন ক্যাডারের দিকে আকৃষ্ট করে। সামাজিক মর্যাদার বৈষম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়াররা পেশাগতভাবে সম্মানিত হলেও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সামাজিক পরিচিতি অনেক বেশি বিস্তৃত। একজন ইউএনও বা ডিসির সমাজে দৃশ্যমানতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা মানুষের কাছে বেশি পরিচিত।
অনেকে মনে করেন, প্রশাসনে গেলে তাদের সামাজিক প্রভাব ও পরিচিতি বৃদ্ধি পাবে। অথচ মেধাবীদের থাকার কথা ছিল সৃষ্টিশীল পেশায়, যা মানবতার কল্যাণে উৎসর্গীকৃত হবে। এসব মহৎ পেশা ছাত্রদের আরাধ্য হওয়া উচিত ছিল। যারা ভবিষ্যতের সুনাগরিক গড়ে তোলার কাজ করবে তাদের পেশাকে টাকা-পয়সা এবং মানসম্মানের দিক থেকে সবার ওপরে রাখা উচিত ছিল। যাতে সুশিক্ষিত ছাত্ররা এসব পেশায় আসতে গৌরব বোধ করে। কিন্তু আমাদের দেশে চলছে উল্টোরথ। যেখানে ক্ষমতার দাপট দেখানো যায় সেদিকেই মানুষজন ছুটে চলে। কিছু কিছু পেশায় একদিকে যেমন ক্ষমতা, অন্যদিকে তেমনি আছে শত রকম দেখা-অদেখা সুবিধা। একটি দেশে সব ধরনের পেশাজীবী মানুষের প্রয়োজন। তাই সব কাজের কাজি দু-একটি পেশায় সীমাবদ্ধ না রেখে, যে কাজে যে এক্সপার্ট তাকে সে কাজেই নিয়োগ দেয়া এবং উল্লেখিত পেশার সবচেয়ে পারদর্শী কর্মীকেই এ পেশার নেতা নির্বাচন করা উচিত। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের চেয়ে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্রের পেছনে সরকারের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারি এ বাড়তি খরচের পেছনে প্রত্যাশা থাকে তারা নিজের পঠিত পেশায় যোগদান করে মানুষকে সেবা দেবেন।
আবার এটাও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত তিনটি বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ ক্যাডারে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের প্রায় ৩০ শতাংশই মেডিকেল কলেজ বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এসেছেন। আন্তঃক্যাডারের মধ্যে পেশাগত ভারসাম্য আনা তথা প্রকৃত মেধাবীদের তাদের নিজ নিজ বিশেষায়িত পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা দরকার। যাতে মেধাবী ছাত্ররা বিশেষায়িত পেশায় আসার আগ্রহ বোধ করে এবং একচেটিয়াভাবে প্রশাসন, পুলিশ বা পররাষ্ট্র ক্যাডারে সবার চোখ না থাকে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ঘটানো। কিন্তু বিভিন্ন কমিশন করা হলেও ১৮ মাস পরও বৈষম্যবিষয়ক সমাধান খুব একটা এসেছে বলে প্রতীয়মান হয়নি। তাই সামনের দিকে প্রত্যাশা থাকবে, নতুন সরকার এসে বিসিএসসহ বিভিন্ন খাতের বৈষম্য নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক










