বড় ধরনের দুর্নীতির কারণে আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে গেছে, সরকারি ব্যয় বেড়েছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি আজ খাদের কিনারায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য হলো এ ধসে যাওয়া অর্থনীতিকে দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে পুনরুদ্ধার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। যাতে ২০৪০ সাল তথা ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আমরা দুটি বিষয়কে শনাক্ত করেছি। একটি হচ্ছে খাতভিত্তিক। আমরা সৃজনশীলতা কৌশল, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা ও অভিজ্ঞ পরামর্শকের মাধ্যমে কোন সেক্টরে কী করব তার একটি পথরেখা তৈরি করছি। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে তার বিস্তারিত এখানে তুলে ধরতে পারছি না। আমরা মোটাদাগে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

আপনারা জানেন, আমাদের অর্থনীতির ভিত তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), রেমিট্যান্স ও কৃষি। আমাদের রফতানিতে বৈচিত্র্য আনার কথা বলা হলেও আমরা মূলত আরএমজি ও রেমিট্যান্সের ওপরই বড় আকারে নির্ভরশীল। এখানে বৈচিত্র্য আনা সময়ের দাবি। আমাদের জিডিপির এ তিন খুঁটিকে রেখে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর করতে পারি, যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়। এছাড়া বৈচিত্র্যের জন্য আমাদের যে অবকাঠামো ও শিক্ষা দরকার সেটি করতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গাণিতিক ও ভাষাগত উন্নয়ন ও দরকার।

ডিজিটাল ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ জনশক্তি আমাদের আছে। তার জন্য যে অবকাঠামো ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দরকার সেটা দিতে পারিনি বলে পিছিয়ে পড়েছি। এ খাতের মাধ্যমে ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করা কোনো ব্যাপার না। সস্তা শ্রমের তৈরি পোশাক খাতের বাইরে এসে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা যদি ইলেকট্রনিকস খাতের অ্যাসেম্বলিং জোরদার এবং সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপন করি, তাহলে বড় অংকের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা এবং শক্তিশালী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা বিস্তৃত করতে হবে। বর্তমানে ৫২-৫৫ শতাংশ এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছেছে। তা অল্প সময়ের মধ্যে ৯৫ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংস্কার করতে পারি, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সনদভিত্তিক, এটাকে দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। এটা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সম্ভব বলে মনে করি। কারণ জামায়াত যা বলে তা করে। আগে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে সেটা দিয়ে দেশের সেবা করেছি।

আমাদের যে জনশক্তি আছে সেটাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি তাহলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতা দরকার, মানুষের যে প্রত্যাশা, জুলাই অভ্যুত্থানে মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে সেটা পূরণ করার যে ধরনের জনশক্তি দরকার সেটা জামায়াতের আছে।

ভিয়েতনাম আজকে যে অবস্থায় গিয়েছে তা শুধু দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে। অথচ দুর্নীতির কারণে আমাদের জিডিপির ৩৩ শতাংশ চলে যায়। আমাদের আহরিত করের ৩০ শতাংশ যায় দুর্নীতিতে। আমরা যে কেনাকাটা (প্রকিউরমেন্ট) করি তা যদি ইলেকট্রনিক্যালি করতে পারি তাহলে লুটপাট কমানো যাবে। এতে অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যাবে। সেজন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার দরকার। শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, যদি আমরা আমাদের তরুণদের, বিশেষ করে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগাতে চাই। তা না হলে ২০৩৫ সালের পর তরুণরা সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সব রাজনৈতিক দলেরই অঙ্গীকার হওয়া উচিত, তরুণ জনগোষ্ঠীর উপযোগী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। জামায়াতে ইসলামী মনে করে, শুধু জেলা-উপজেলা নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা দরকার। প্রান্তিক কৃষকের প্রয়োজন মেটানো এবং তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য একটা প্লাটফর্ম করা দরকার। সে প্লাটফর্ম থেকে বীজ, সার, বিপণন সব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের উদ্যোক্তা শ্রেণীতে পরিণত করতে হবে। সব পর্যায়ে উদ্যোক্তা শ্রেণীর বিকাশ ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মধ্যে আমরা সে চিন্তাচেতনা দেখিছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক চিন্তা থেকে সরে এসেছি।

সামনে নির্বাচন আসছে। সব দলকেই তাদের অর্থনৈতিক ইশতাহার উপস্থাপন করতে হবে। সেখানে অগ্রাধিকার থাকতে হবে উদ্যোক্তা শ্রেণীর বিকাশ ও তরুণদের কর্মসংস্থান। সর্বোপরি দেশের সার্বিক উন্নয়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে। দেশ অনেকদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া আমাদের জন্য মডেল হতে পারে। একসময় মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পড়তে আসত। আজ শিক্ষা ও গবেষণায় মালয়েশিয়া বিশ্বে অনন্য জায়গা করে নিয়েছে। অর্থনীতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা যে ধরনের কৌশল নিয়ে সফল হয়েছে সে কৌশল গ্রহণ করতে পারি। এখানে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সুবিধা হলো তাদের প্রশিক্ষিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শ্রমশক্তি।

দেশকে একার পক্ষে বা কোনো দলের পক্ষে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। সব অংশীজনের অংশগ্রহণেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের দল-মত নির্বিশেষে একত্রে কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এ কাজই করবে।

মো. সফিউল্লাহ: সিনিয়র সচিব (অব.) ও জামায়াতের প্রতিনিধি

[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অর্থনীতিতে ন্যায্যতা’ শিরোনামে তৃতীয় অধিবেশনে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে]