এ সহযোগিতার মনোভাব এক ধরনের যৌথ অঙ্গীকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। ওই যুগ শেষ হয়েছে। আমরা এখন এমন এক বহুজাগতিক বিশ্বে প্রবেশ করেছি। এ বিশ্বে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিতর্কিত নীতিমালা ও অস্থিরতা এত বেশি যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কাঠামোগুলো কাঠামোগত সংস্কার কিংবা উদার সহযোগিতার প্রত্যাশায় আর অপেক্ষা করতে পারছে না। এমন সময়ে প্রতিটি কাঠামোকে নিজস্ব সক্ষমতা গড়তে হবে এবং নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় নিজ নিজ অবস্থান নির্ধারণে আলোচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক অতীত থেকে বর্তমানে খোলামেলা রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি এক ধরনের পরিবর্তনকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। তার পরও বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা কখনই দাতব্য উদ্যোগ ছিল না। নিজ নিজ কর্মকাণ্ডকে সদিচ্ছার অভিব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করলেও প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজ স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করেছে। এখন আর ওই ছদ্মবেশ নেই। নতুন এ পরিবেশে কাজ করার অর্থ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততায় স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রাখা। এ পরিবেশের ঝুঁকি আর সুযোগগুলোকেও স্বীকার করে নেয়া জরুরি।
এক্ষেত্রে ভারতের উন্নয়নের গতিপথ অনেক সত্য উন্মোচন করে। বৈশ্বিক সহযোগিতা সদয় অনুপ্রেরণা দ্বারা পরিচালিত হয় এ ধারণার প্রতি দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহপ্রবণ অবস্থান রেখে চলেছে। অবশ্য দেশটি বাহ্যিক সম্পদ, বৈদেশিক নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি নেয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এগুলোকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু করেছে নিজস্ব শর্তে। গুরুত্ব দিয়েছে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ে। ভারত একা নয়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামও একই পন্থায় ভারসাম্য তৈরি চেষ্টা করেছে। এ অর্থনীতিগুলো সফল হয়েছে, কারণ দেশগুলোর স্বার্থের সঙ্গে বিদেশী অংশীজনদের স্বার্থ নিখুঁতভাবে মিলে গেছে। অংশীদারত্ব নির্মাণে কীভাবে একটি মৌলিক ভিত খুঁজে পাওয়া যায়, কীভাবে মতপার্থক্য সামলানো যায় এবং সার্বিকভাবে কার্যকর সমাধান কী হতে পারে—এসব উদ্ভাবন করতে শিখেছে। এটি অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে কার্যকর রূপ। অর্থাৎ দরকষাকষি সক্ষমতা বাড়ানো, কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন এবং কৌশলগত শিক্ষার সমন্বয় সাধন করেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মাঝারি আকারের শক্তিগুলোর কৌশলপত্রও নানাভাবে বিকশিত হচ্ছে।
এশিয়ার অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পেরেছে। তারা বাইরের কোনো পক্ষকে তাদের উন্নয়নের চিত্রনাট্য নির্ধারণের সুযোগ দেয়নি। জাপানের শিল্পনীতি, দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানিভিত্তিক রূপান্তর, চীনের রাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী সংকর মডেল, ভারতের ত্বরান্বিত সংস্কার এবং ভিয়েতনামের ধাপে ধাপে উন্নয়নে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে। এগুলো অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। চাপের মধ্যে শেখার সক্ষমতা থাকা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হয়েছে।
ভারত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ব্যবহারিক দিকটিকেই কাজে লাগিয়েছে। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলাকে আরো মজবুত করতে কাজ করেছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ও রাশিয়ার সঙ্গে শক্তি অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি নিজেকে উন্নত অর্থনীতি ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যে সেতুবন্ধকারী পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে ভারত গ্লোবাল সাউথের এমন এক মধ্যস্থতাকারী, যারা ভিন্ন স্বার্থের পক্ষগুলোকে সমন্বয় করতে পারে।
ভারতের অভিজ্ঞতা শুধু উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্যই নয়, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো অন্য মধ্যম আকারের শক্তিগুলোর জন্যও শিক্ষণীয়। এ দেশগুলো এখন একই দ্বিধার মুখোমুখি। দেশগুলো ভাবছে, স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে বৈশ্বিকভাবে সম্পৃক্ত থাকা যায়। বৈষম্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত বিঘ্নের কারণে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ চাপগুলো এ চ্যালেঞ্জকে আরো জটিল করে তুলছে। এসব সমস্যা মোকাবেলার একমাত্র উপায়, নিজস্ব সক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য ব্যাপক আলোচনা, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, উদ্ভাবন বাড়ানো এবং শেখার সক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করা। এসবের জন্য মানসিকতার বদল জরুরি। অর্থনৈতিক কূটনীতিকে শুধু বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা ও বিদেশী প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বরং যৌথভাবে সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক সুবিধাজনক ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি মাধ্যম হিসেবেও মানতে হবে। রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে প্রযুক্তিগত সহায়তাকে এখন শুধু একমুখী জ্ঞান হস্তান্তর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং পরামর্শদাতা মডেলগুলোর বিপরীতে আরেকটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা করা দরকার। এভাবে কোনো পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকার বদলে শেখার অন্তর্নিহিত সুযোগ পাওয়া যায়।
প্রতিটি দেশকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও নিজস্ব পদ্ধতির হালনাগাদ করতে হবে। ঝুঁকি ভাগাভাগি, সক্ষমতাকে একত্র করা এবং অর্থনীতির নতুন বাজার উন্মোচন করার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বই মূল লক্ষ্য হতে হবে। কিন্তু অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে সমান ভাগিদার হওয়ার জন্য অনেক সরকারের প্রতিষ্ঠানগত গভীরতা থাকে না। অনেক সরকার এ সক্ষমতা অর্জনেও নানাভাবে ব্যর্থ হয় বা সংগ্রাম করতে থাকে। এজন্য এশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয়। বৈশ্বিক সদয় সহযোগিতার জন্য অপেক্ষা করে কোনো দেশই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে শেখা, সক্ষমতা বাড়ানো, কঠোরভাবে দরকষাকষি, সৃজনশীল পন্থায় সমঝোতা ও ব্যবহারিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে, তখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অগ্রগতি সম্ভব।
আধুনিক সময়ে নীতিনির্ধারকদের স্বায়ত্তশাসন ও সহযোগিতার মধ্যে একটি বেছে নেয়া নয়, বরং এ দুটোর সক্ষমতাই গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে যে দেশগুলো নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবে এবং অন্যদের অনুকরণ না করে নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখবে তারা সফল হবে। এ দেশগুলো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে সম্পৃক্ত হতে পারবে। এশিয়ার উন্নয়নের গল্প বলে দেয়, এটি শুধু সম্ভবই নয়, বরং অনিশ্চিত এ বিশ্বে স্থিতিস্থাপকতা অর্জনের সবচেয়ে নিশ্চিত পথ।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
অশোক লাভাসা: ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অর্থ সচিব; এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট
রোলি আস্থানা: ওডিআই গ্লোবাল অ্যাডভাইজরিতে সিনিয়র উপদেষ্টা, চ্যাথাম হাউজের সহযোগী গবেষণা ফেলো










