বিশেষ করে প্রাথমিক জ্বালানি গ্যাসের সংকট এতটাই প্রকট যে পণ্যটির অভাবে বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী চার কারখানাও। এতে স্বাভাবিকভাবেই ইউরিয়া সারের স্থানীয় উৎপাদন কমেছে। কেননা এ সার উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস।
গ্যাস সংকটে স্থানীয় উৎপাদন হ্রাসের কারণে আমদানির মাধ্যমে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। এতে ক্রমেই সারের ক্ষেত্রেও জ্বালানির মতোই আমদানিনির্ভর হয়েছে দেশ। বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ সারই আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এজন্য একদিকে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তার অভিঘাত যে দেশের সার মজুদ ও সরবরাহের ওপরও এসে পড়বে, তা আগে থেকেই অনুমেয়।
বিশ্বে সমুদ্রপথে ৩০-৩৫ শতাংশ সার পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এটা বাস্তব দেশের জন্য বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানির বাজার সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে কেবল ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একমাত্র সংকট নয়, বাংলাদেশের মতো আর্থিক সক্ষমতার দেশের পক্ষে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির প্রভাব বহুমাত্রিক। এমন পরিস্থিতিতে সার আমদানিতেও যদি নিয়মিত ব্যয়ের চেয়ে অস্বাভাবিক মূল্য পরিশোধ করতে হয় দেশকে, তাহলে অর্থনীতির চাপ আরো বাড়বে। এক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাসের সংস্থান করে সারের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো ইউরিয়া সারের চাহিদা বিবেচনায় বর্তমানে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানি করার সফল উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ হলো সার। এরমধ্যে আবাদি জমিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করা হয় ইউরিয়া সার। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তথ্য বলছে, দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে ১৩ লাখ টনের বেশি সার আমদানি করা হলেও বর্তমানে মজুদ রয়েছে নিরাপদ সীমার নিচে। অর্থাৎ চার লাখ টনের কম ইউরিয়া সারের মজুদ রয়েছে দেশে। এ মজুদ দিয়ে আমন মৌসুমের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন আমন দেশের দ্বিতীয় প্রধান ধানের মৌসুম। এবার আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ টন। জুলাই-আগস্ট থেকে আমনের বীজতলা প্রস্তুতের কাজ শুরু হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এবার ৬০ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হবে। সুতরাং সরকারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ ইউরিয়া সার কারখানাগুলো চালু করে সীমিত পরিসরে হলেও উৎপাদনে ফেরানো উচিত। দীর্ঘমেয়াদে সার কারখানাগুলো যেন কখনো বন্ধ না হয় সেটি নিয়েও সরকারকে কাজ করতে হবে। চাহিদার অনুপাতে দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর পরও গ্যাস সংকটে পণ্যটির সরবরাহে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়াটা কোনো টেকসই সমাধান নয়, বরং এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসবে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইউরিয়ার মূল্য প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো কৃষি উৎপাদনের উপকরণের জোগানের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতায় আমদানি ব্যাহত হওয়া কেবল বাণিজ্যিক জটিলতা নয়। এটি সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
দেশের মানুষের প্রধানতম খাদ্যশস্য হলো চাল, যা ধান থেকে আসে। ধান উৎপাদনের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৌসুম হলো আমন। ফলে এ সময় ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এ মৌসুমে ব্যবহার হয়। অথচ স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা সীমাবদ্ধতায় তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে একটি কারখানা বা আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকা কোনোভাবেই কৃষির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এ সময় কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত সার পৌঁছতে না পারলে ধানের ফলন কমার শঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিশ্ববাজারে যখন দাম বাড়ে, তখন সরবরাহকারীরা চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহা দেখায়, নতুন দরপত্রে সাড়া কমে যায়, পরিবহন ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়ে। আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে যতটা দ্রুত দামের পারদ বাড়ে, ততটা গতিতে কমে না। আবার বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর যে ফের অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে বারবার সেদিকেই ঝুঁকেছে, সেটা জ্বালানি হোক বা সার। এ ধরনের নীতি-কৌশল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সরকার একদিকে বলছে বন্ধ সার কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে বলছে সব কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এটা বাস্তবতা। রাতারাতি কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকার দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট দূর করার উদ্যোগ নেবে, সে বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চায় উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিকও। সার কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে গ্যাসের সংকটও দূর হোক সেটা চাওয়া। জ্বালানি আমদানিনীতি থেকে বেরিয়ে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে সরকার মনোযোগ দিক। আর স্বল্পমেয়াদে আমদানি করা গ্যাসের একটি অংশ কৃষি উৎপাদনের কৌশলগত খাতে বরাদ্দ দেয়া হোক। কারণ সার উৎপাদন ব্যাহত হলে তার ক্ষতি কেবল শিল্প খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতিতেও পড়বে। একই সঙ্গে সারের মজুদ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। মৌসুমভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাস, আগাম ক্রয়চুক্তি, বহুমুখী আমদানি উৎস এবং জরুরি রিজার্ভ—এসব ছাড়া ভবিষ্যৎ সংকট ঠেকানো যাবে না। জিটুজি চুক্তির পরিসরও বাড়াতে হবে, যাতে স্পট মার্কেটের ওপরও নির্ভরতা কমানো যায়। ইউরিয়া সংকটকে সাময়িক বাজার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিও জাতীয় কৃষিনীতি কৌশলের দুর্বলতারই প্রতিফলন। এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কৃষি খাতের বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কখনই হবে না।










