তবে গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে এর যে স্বাভাবিকতা, শহরে তেমনটি নয়। সে আলোচনার প্রসঙ্গ অবশ্য অন্য। বৈশাখের এখন যে জৌলুসপূর্ণ আয়োজন তা শহরেই বেশি দেখা যায়। ঢোলের বাদ্য, সাংস্কৃতিক আয়োজন, পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, বাহারি রঙের পোশাকের ঢল—এসব মিলিয়ে এখনো বৈশাখ আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ মহোৎসবের কোলাহলের নিচে কিছু বিতর্ক বা প্রশ্ন সবসময়ই থাকে। কিন্তু কোলাহলকে কেউ পরিপূর্ণভাবে থামাতে পারে না। ফলে জাতীয় জীবন এমনকি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব থেকে যায়। যদিও বৈশাখকে আমরা বাংলা বর্ষবরণ বলি, কিন্তু এটি শুধু বাঙালির উৎসব নয়, বরং এ ভূখণ্ডে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তারও। ফলে বৈশাখ বা নববর্ষ উৎসবের সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক দিকটি সম্পূর্ণ বৈচিত্র্যময়। নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে এখন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বেড়েছে। অনেকেই এখন শহরের মেকি আবহ থেকে মুক্তি পেতে চায়। আবার ফিরতে চায় গ্রামীণ ওই সংস্কৃতিতে। সে প্রচেষ্টা থেকেই তো শহরে শুরু হয় নানা আয়োজন। এভাবে আপাতদৃষ্টে শহরের বৈশাখের সঙ্গে গ্রামের বৈশাখের সাংস্কৃতিক এমনকি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেরও তুলনামূলক অবস্থান দেখা যায়।

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস নিয়ে বহু লেখা হয়েছে। তবে যদি জাতীয় তৎপরতার আঙ্গিকে বিবেচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, এটিকে সর্বজনীন রূপ দেয়ার চেষ্টাটুকুর পেছনে অর্থনৈতিক উদ্যোগই ছিল। মোগল আমলে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। এ সন প্রবর্তনের মাধ্যমে মোগল সম্রাট আকবর কৌশলগতভাবে খাজনা আদায়ের সুবিধা করে নিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, বছরের শেষদিন পর্যন্ত কৃষকদের সব খাজনা পরিশোধ করতে হতো। আর বছরের প্রথম দিনটাতে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। তবে আপ্যায়নটি সম্মানের ছিল না। একপেশে দয়ার দান হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বৈশাখকে কেন্দ্র করে এমন অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করায় গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ হয়েছে কিছুটা হলেও। অধিকাংশ অঞ্চলে হালখাতা ছিল এ দিনের কেন্দ্রীয় আয়োজন। ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খুলতেন। পুরনো-নতুন খদ্দেরদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন, নতুন বছরের ব্যবসায়িক সম্পর্ক পাকা করতেন। এ হালখাতার সংস্কৃতি আজও ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও টিকে আছে। আধুনিক সময়ে বৈশাখ উৎসবের অর্থনীতি বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে। এ উৎসবকে ঘিরে পোশাক শিল্প, ফুলের বাজার, খাদ্য ব্যবসা, কারুপণ্য ও লোকশিল্পসহ বহু আয়োজন শুরু হয়েছে। এ ধরনের বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে অর্থের ব্যবহার থাকবেই। অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণায় এ উৎসবকে ঘিরে বছরে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।

বৈশাখের আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় সংবাদমাধ্যম, সাময়িকী এবং টেলিভিশনে এ নিয়ে নানা আয়োজন। এ সময়টা শিল্পীদের জন্য বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। শহুরে কোলাহল আর জাঁকজমকের জন্য জাতীয় তৎপরতাও বাড়ে। এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গনেও এক ধরনের তোড়জোড় দেখা যায়। কিন্তু সর্বোপরি গোটা তৎপরতায় থাকে মেকি ব্যবস্থাপনা। এখন পহেলা বৈশাখ পেয়েছে বাণিজ্যিক রূপ। বিশেষত বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো এখন লোকসংস্কৃতির সৃজনশীলতাকে ভিন্ন বাণিজ্যিক রূপ দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি আবেগ থাকায় এ ব্যবসায়গুলো থেকে পণ্য কেনার আগ্রহ বেশি। কিন্তু প্রতিবারই শহরের আয়োজনের মধ্যে এক ধরনের মেকি ভাব দেখা যায়। এজন্য শুরু হয় নানা সমালোচনাও। অনেক মহলে বলা হয়, এটি একদিনের বাঙালিয়ানা। আবার অনেক সময় শুরু হয় বিতর্ক। তাই এখন অনেকেই বৈশাখ এলেই ছুটে যেতে চান স্বাভাবিক পরিসরে। অনেকে চলে যেতে চান পার্বত্য চট্টগ্রামে বা দেশের যেসব প্রান্তিক অঞ্চলে এখনো বৈশাখ প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন উৎসব।

গ্রামীণ পরিসরে বৈশাখ বরাবরই নিজস্ব ও ঘরোয়া পরিসরে উদযাপন করা হতো। ইতিহাসও বলে, গ্রামীণ পরিসরে বা কৃষি অর্থনীতির তাগিদেই বৈশাখ অন্য ধরনের উৎসব। এ উৎসব শ্রমজীবী মানুষ করে রোদে-ঘামে, ধানের ভাতে জীবনের উৎসবের মাধ্যমে। ইলিশ-পান্তা এগুলোই প্রধান খাদ্য উপকরণ নয়, পান্তা-ইলিশ বরাবরই অভিজাত শ্রেণীর খাবার টেবিলের আয়োজন। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় দেশের সবার পক্ষে এখনো এমন বিলাসবহুল খাবার পাতে তোলা তাদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু তাতে কী? বাঙালির অধিকাংশ সাংস্কৃতিক চর্চায় বরাবরই ভোজনরসিক হওয়ার প্রবণতা ছিল। এজন্য তারা সামান্য লতা, শাক কিংবা অন্যান্য সবজির ব্যবহারেও নানা খাবারের পদ তৈরি করে নিয়েছে। বৈশাখের সময় এজন্য গ্রামীণ হাট-বাজারে গেলে আবারো দেখা যায় এসব উপকরণ এখনো কতটা জনপ্রিয়। উৎসব উপলক্ষে এগুলোর চাহিদা থাকে বেশি বলে মনে হয় বছরের এ সময়টাতেই এসব উপকরণের দাম বাড়ছে। কিন্তু বছরজুড়েই মূলত গ্রামীণ জীবনে এসব উপকরণ থাকে। আবার ইলিশ-পান্তার রেওয়াজ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মিষ্টি, দই এবং পিঠা-পুলির চাহিদা তুঙ্গে থাকে। গ্রামীণ মেলা থেকে শুরু করে শহুরে রেস্তোরাঁ—সবখানেই খাবারের এক বিশাল বাণিজ্য চলে। গ্রামীণ পরিসরে এখনো অনেকের এমন ভাবনা আছে যে বছরের এ সময়টায় ভালোমন্দ খেলে বছরজুড়ে ভালো কিছুই খাওয়ার সুযোগ হবে। এটি গ্রামীণ ও প্রান্তিক সংস্কৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং সাধারণ চাহিদারও বড় প্রতিফলন। শ্রমজীবীরা, যারা অর্থনীতিতে গতিশীল রেখেছে, তারা যে খাদ্যের নিরাপত্তা চায় সেটির প্রতিফলন ঘটে এ উৎসবে।

শহরে বৈশাখ এখন আরো বিস্তৃত। তবে সেটি কোনো কারণে বাজারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। লাল-সাদা পোশাকের ঐতিহ্য ছাড়িয়ে এখন বুটিক হাউজ ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। তবে স্থানীয় তাঁত, সিল্ক ও সুতি কাপড়েরও চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে মনোযোগ কম থাকায় বছরব্যাপী এ উদ্যোগগুলো চলমান থাকতে পারে না। অথচ এ উৎসবের প্রাণ বরাবরই এ শিল্প। মাটির শিল্প, শোলার কাজ, বাঁশ ও বেতের পণ্য এবং কুটির শিল্প। বৈশাখী মেলার মাধ্যমে গ্রামীণ কারিগররা তাদের সারা বছরের বড় আয়ের সুযোগ পান। তবু প্রশ্ন থাকে এর সুফল কী সবসময় তাদের কাছে পৌঁছায়? এর কিছু উত্তর সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আসে। সেখানেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় অনেক ক্ষেত্রে। পুরনো দিনের মতো আড়ম্বর না থাকলেও আজও অনেক ব্যবসায়ী বিশেষ করে স্বর্ণের দোকান ও পাইকারি বাজারে ‘হালখাতা’ পালন করেন, যা মূলত বকেয়া আদায় ও নতুন আর্থিক বছর শুরুর একটি সুন্দর মাধ্যম।

পহেলা বৈশাখের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রতিফলন সম্ভবত ঘটে এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং দেশের যেসব স্থানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বাস। তাদের বর্ষবরণের আয়োজন সবার মন আকর্ষণ করেছে। তাই এখন অনেকেই বৈশাখের বহু আগে থেকেই ভেবে রাখেন, কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে একটু ছুটি পেলেই সেখানে ছুটে যাবেন কীভাবে। ফলে পাহাড়ের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতাও বাড়ছে। এ একটি উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ি কুটির শিল্প, সাংস্কৃতিক পণ্য, খাদ্য কিংবা অন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জাতীয় জীবনের সংযোগ বেড়ে চলেছে। এমনকি ভূখণ্ডভিত্তিক বৈচিত্র্যও চোখে পড়ছে। বৈচিত্র্যের স্বীকৃতিই হওয়া উচিত পহেলা বৈশাখের প্রকৃত চরিত্র। তবে সংবাদমাধ্যমে যে পহেলা বৈশাখকে তুলে ধরা হয় বা বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয় তা শহুরে কিংবা নাগরিক কোলাহলের বৈশাখ। অথচ দেশের হাজার হাজার গ্রামে একেবারে নিজস্ব ঘরানায় দিনটি পালিত হয়। এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা জাতীয় পরিসরে নেই। গ্রামের বৈশাখ হয়তো আরো খাঁটি অর্থে সর্বজনীন। লাঠিখেলা, বাউলের আসর, বৈশাখী মেলার ধুলোমাখা আনন্দ—এ বৈশাখ প্রান্তিক মানুষের নিজের ভাষায় লেখা উৎসব, যা এখনো অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু গণনায় আসে না। এর সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক চরিত্রটিও তাই আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।

তবু বৈশাখের অর্থনীতি এখনো বিকাশমান। কিন্তু এ অর্থনীতির সুফল কি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়? গ্রামের কারিগর, লোকশিল্পী, বৈশাখী মেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অন্যরাও কি এ উৎসবের আর্থিক উপকারিতার অংশীদার, নাকি তারাও প্রান্তিক থেকে যান শহরের জৌলুসে? পহেলা বৈশাখ নিয়ে এখন যে কথা হয় তা সম্পূর্ণ নয়। একটি জাতির উৎসব তখনই সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন হয়, যখন সে উৎসবে সবার মুখ দেখা যায় এবং সবার অবদানকে পরিমাপ করা যায়। তবে পহেলা বৈশাখের শক্তি এখানেও যে এটি বারবার রূপ বদলেছে, প্রতিরোধের ভাষা হয়েছে এবং জাতীয় মুক্তির প্রতীক হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে হলে চাই আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টি। প্রান্তের মানুষও কেন্দ্রে আসবেন এবং তাদের শ্রমকে অপ্রাতিষ্ঠানিক রূপে না ভেবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে আসার নীতিসিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।

সাইমন জাকারিয়া: লোকগবেষক ও উপপরিচালক (ফোকলোর বিভাগ), বাংলা একাডেমি