এ পরীক্ষা স্বচ্ছ, নকলমুক্ত ও অর্থবহ করার নিমিত্তে শিক্ষামন্ত্রী বেশকিছু পদক্ষেপের কথা কিছুদিন ধরে বলে আসছেন যেগুলো আমরা মনেপ্রাণে সমর্থন করি এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা প্রদানের জন্যও প্রস্তুত। ঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে, বিশেষভাবে তদারকিও করা হবে এসব কেন্দ্র, এভাবে পর্যায়ক্রমে সব কেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। আগের মতো ’হেলিকপ্টার মিশন’ও থাকবে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শন করা হবে দেশের যেকোনো কেন্দ্র। চমৎকার সিদ্ধান্তের ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে শুরু হলে প্রথম দিকে হয়তো কয়েক বছর পাসের হারে ধস নামবে, সেটি দেখে যেন সংশ্লিষ্টরা এবং সরকার পুনরায় ছাড় দেয়ার চিন্তা না করে। এসব পদক্ষেপ নেয়ার পর যে অবস্থা হবে সেটিই বাস্তব। তবে কোথাও না কোথাও থেকে এবং কাউকে না কাউকে এটি শুরু করতেই হতো। কারণ শিক্ষা বিস্তারের নামে, পরীক্ষা পাসের নামে যা চলছে তা পুরোপুরি জোচ্চুরি, এ অবস্থা জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড় করিয়েছে। আমরা শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বিশেষ করে যাদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিতি আছে তাদের শিক্ষার দৈন্যদশা দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী এসএসসি এমনকি এইচএসসি পাস করে যাচ্ছে অথচ বাংলায় দুটো বাক্য ভালোভাবে লিখতে পারছে না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া), বই পড়তে পারছে না ইংরেজি তো দূরের কথা। একই অবস্থা ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, বিজ্ঞান সর্বত্র। এই যখন অবস্থা তখন আমরা দেখি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেই কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন, এক গোলকধাঁধার মতো এবং অবাস্তব কিছু কথাবার্তা নিয়ে আলোচনা জুড়ে দেন।
বিগত বছরগুলোয় পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়ার হার হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল, এখনো তেমন একটা ভাটা পড়েনি। কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীদের জানার পরিধি এতটুকুও বাড়েনি, ওই ফল বহন করে না কোনো গুরুত্ব। যখন বলা হয় যে অমুক এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মনে প্রশ্ন আসে শিক্ষার্থীটি কী তার নিজ শ্রেণীর বই সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্মাতে পেরেছে, তার নিজ শ্রেণীর বাংলা, গণিত, ইংরেজি কিংবা সমাজবিজ্ঞান বই সম্পর্কে কিছু বলতে পারে। আরো প্রশ্ন জাগে যে সে কোন এলাকা থেকে পাস করেছে। গ্রামের এমন স্কুলে যেখানে দেখাদেখি করে লেখার অপার সুযোগ রয়েছে নাকি ঢাকার কোনো নামকরা স্কুল থেকে পাস করেছে, নাকি সেনাবাহিনী পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেছে মোটকথা তার ফল নিয়ে এক বাক্যে কেউ স্বীকার করতে পারছে না যে এটি তার নিজের যোগ্যতায় পাওয়া। আরো প্রশ্ন জাগে শিক্ষার্থীটি কোন গাইড পড়ে আর কোন কোচিংয়ে পড়াশোনা করে পাস করেছে ইত্যাদি অনেক কিছু। অথচ তার ফল শুনলে একটা ধারণা হওয়ার কথা ছিল সে একজন সফল ও ক্রিয়েটিভ শিক্ষার্থী। সে ভবিষ্যতে
দেশের কোনো কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করে সমাজ ও দেশের সেবা করবে।
এসএসসি পরীক্ষা থেকেই অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া থাকছে না ভেন্যু কেন্দ্র (পরীক্ষা কেন্দ্রের সহযোগী কেন্দ্র)। পরীক্ষার্থীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর প্রদান করা হবে। কোনো ধরনের অতিরঞ্জিত নম্বর দেয়া হবে না। কোনো শিক্ষক যদি অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে থাকেন তাকেও বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এত ছোট দেশে একেক বোর্ডে একেক ধরনের প্রশ্ন, এক এক বোর্ড উত্তরপত্র পরীক্ষণ করান একেক রকমের, ফলেও বেশ তফাত দেখা যায় যদিও সবার সিলেবাস ও কারিকুলাম এক। এ বৈষম্য রোধকল্পে সব বোর্ডের প্রশ্ন এক করার কথা আশাব্যঞ্জক এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে মূল্যবান সময় সাশ্রয় করতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে এবং এরই মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এ দুই পরীক্ষায় বিষয়সংখ্যা কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বিষয় সংখ্যা কমানোর বিষয়টি আরো ভেবেচিন্তে করা উচিত বলে আমরা মনে করি।
যদি কোনো পরীক্ষা কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে কেবল পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরীক্ষা সম্পূর্ণ নকলমুক্ত ও প্রশ্নফাঁসমুক্ত করতে সরকার এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অসুদপায় অবলম্বনের বিষয়টিতে শিক্ষকরা কিছু বলতে পারছিলেন না। এর রকম বাধ্য করা হলে তারা সাহসী হবেন এবং সবাই একটি বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকবেন। নকলকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ অভিভাবকরাও
তখন শিক্ষকদের বলতে পারবেন না যে অমুক শিক্ষক অযথাই কড়াকড়ি করেছেন।
সারা দেশে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করেছে, যেখান থেকে দেশের প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সন্দেহভাজন চক্রের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হবে। বিশেষ করে ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে যারা অর্থ হাতিয়ে নেয়, তাদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। এসএসসির প্রশ্নপত্র এরই মধ্যে জেলা পর্যায়ে চলে গেছে। মন্ত্রণালয় ২৯২টি ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল করেছে, তবে বিকল্প উপায় না থাকায় শুধু নিকলী ও অষ্টগ্রামে দুটি ভেন্যু কেন্দ্র রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, সেসব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে বৈঠক চলমান। এ বছর যে স্কুলের পরীক্ষা, সেই স্কুলের কোনো শিক্ষক ওই কেন্দ্রে ঢুকতে পারবেন না। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নগুলো প্রথমে ফয়েল প্যাকে ভরা হয়েছে, সেই ফয়েল প্যাক আবার সিকিউরিটি খামে ভরা হয়েছে। এ খামটি ওয়ান টাইম অর্থাৎ একবার খুললে তা আর লাগানো যায় না। আর ট্রেজারি থেকে প্রশ্ন নেবেন একজন ট্যাগ অফিসার। এরপর পরীক্ষা শুরুর ১৫-২০ মিনিট আগে ট্যাগ অফিসার, পুলিশ অফিসার ও কেন্দ্র সচিবের স্বাক্ষরে প্রশ্নের খাম খোলা হবে। এবার যেহেতু ভেন্যু কেন্দ্র নেই, তাই মূল কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র ভেন্যু কেন্দ্রে নিতে হবে না। এভাবে প্রশ্নফাঁসের সম্ভাবনা অনেকটাই কম বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা সচল রাখতে হবে। ক্যামেরায় ধারণকৃত সব ভিডিও যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করতে হবে। সব পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে ঘড়ি (কাঁটাওয়ালা) টানানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরমার্শক্রমে পরীক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্র সচিব ছাড়া পরীক্ষার হলে কোনো শিক্ষক, পরীক্ষার্থী যেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর তিনদিন আগে ট্রেজারি বা থানা লকারে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্রের প্যাকেট সংশ্লিষ্ট তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। এ সময় ট্রেজারি অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কেন্দ্র সচিব ও পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। ১৯৮০ সালের এ আইনটি সংশোধন করে পাবলিক পরীক্ষা নকল বা অন্যান্য অপরাধের বিচার আরো কঠোর করার ব্যবস্থা নেয়া হবে।
খাতা দেখায় কোনো গ্রেস নম্বর থাকবে না অর্থাৎ অনুকম্পার সুযোগ থাকছে না। শিক্ষার্থীরা যা লিখবে তার ভিত্তিতেই নম্বর দেয়া হবে। মেধার প্রকৃত লড়াইয়ের জন্যই এ ব্যবস্থা। কোনো ধরনের দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়ে অযোগ্যদের পার করে দেয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং কোনো ধরনের অটো পাসের ব্যবস্থা না রাখা। অত্যন্ত কার্যকরী সিদ্ধান্ত! বহুবার বিষয়টি নিয়ে লিখেছি। শিক্ষার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপই বটে! অত্যন্ত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। আমরা বলতে চাই এগুলো মূল সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে বাকি যে অনিয়মগুলো চলে আসে সেগুলো মূল শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বাই-প্রডাক্ট। মূল ঠিক হলে বাকিগুলো অটোমেটিক ঠিক হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের অনুকম্পা বা খয়রাতির নম্বর না দেয়াই হচ্ছে মূল সিদ্ধান্ত। এটি করা হলে শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে বসবে, ক্লাসে যাবে, কিছু জানার চেষ্টা করবে। শিক্ষকরাও পড়িয়ে মজা পাবেন, পড়াতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা বুঝবে তাদের অবস্থান কোথায়। গোটা সমাজ ও দেশ বুঝতে পারবে পাস ফেলের তফাত। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ভর্তি ও অন্যান্য বিষয় নির্ভর করা যাবে। এখন না পড়ে, খাতায় উল্টাপাল্টা কিছু লিখে এলেও পাস। ফলে কেউ বই পড়তে চায় না, শিক্ষকরা আগ্রহ নিয়ে পড়ান না, শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে না, ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া কিছু বোঝা যায় না। যেসব কেন্দ্রে নকলের সুবিধা বা দেখাদেখি করে লেখার সুবিধা থাকে সেসব কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা ভালো পাস করে, গ্রেড পায়, যাদের সেই সুবিধা কম তারা কম নম্বর পায় অর্থাৎ পাবলিক পরীক্ষার ফল আমাদের শিক্ষার্থীদের মান যাচাইয়ের বিষয়ে কোনো মেসেজ দেয় না। আমরা পত্রিকার পাতাসহ বিভিন্নভাবে সব সরকারকেই এ সত্য উপলব্ধি করার এবং সেভাবে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ ও পরামর্শ দিয়ে এসেছি দেশের শিক্ষাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সবাই বড় বড় প্রজেক্ট আর বড় বড় পদ্ধতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আসল জায়গা খালি বা ফাঁকা রেখে বড় বড় কাজের কথা শুনতাম। বর্তমান সরকার সেই মূল বিষয়গুলোতেই হাত দিয়েছে যেটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। যারা দেশের ও শিক্ষার প্রকৃত মঙ্গল চায় তাদের এসব পদক্ষেপকে সমর্থন করতে হবে এবং সহায়তা করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রীকে আরেকটি অনুরোধ করব। আপনার সিদ্ধান্তগুলোকে আমরা স্বাগত জানাই। এসব সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়ন হলে কয়েক বছর ধরে পাসের হারে মারাত্মক ধস নামবে সেটি দেখে যেন সরকার আবার পিছিয়ে না যায়। কারণ শিক্ষার মঙ্গলের জন্য গৃহীত সব সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপই অত্যন্ত ইতিবাচক।
মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)










