দেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সেই সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে বেকারের সংখ্যাও। বিপুল পরিমাণ বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারত বৈদেশিক শ্রমবাজার। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের অভিবাসন খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত, যার প্রধানতম হলো সিন্ডিকেট ও দালাল শ্রেণীর দৌরাত্ম্য। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ওপর পড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস এবং জাতীয় প্রবাসী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও এ বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, দালাল চক্রের জালিয়াতির কারণে বিদেশে শ্রমবাজারের ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে লোক পাঠাতে গেলেই কাগজপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া যায়।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সংঘটিত হচ্ছে অবৈধ পথে কর্মী পাঠানো, মানব পাচারের মতো অপরাধ। এগুলোর পাশাপাশি রয়েছে জাল কাগজপত্র, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ। যে কারণে বিভিন্ন সময়ে বেশকিছু দেশে শ্রম অভিবাসন বন্ধ হয়েছে। বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকরা কাজ করছেন—এমন প্রচারণা থাকলেও বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসন মূলত কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর সিংহভাগ অভিবাসী উপসাগরীয়, অন্যান্য আরব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১২-১৩টি দেশেই যাচ্ছেন। পাঁচ বছরে ৯৭ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ১০টি দেশে। গত বছরে ৯০ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মী অভিবাসিত হয়েছেন মাত্র ছয়টি দেশে। যার মধ্যে সৌদি আরবেই গেছেন ৬০ শতাংশ কর্মী। আবার এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অভিবাসন সংখ্যা কমেছে। এর আরেকটি বড় কারণ হলো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দক্ষতার অভাব। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকদের চারটি দক্ষতার স্তরে ভাগ করেছে—প্রফেশনাল, দক্ষ, অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ। বাস্তবে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক প্রবাসী শ্রমিক অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ শ্রেণীতে কাজ করেন। এতে তারা পারিশ্রমিকও তুলনামূলক কম পান। যে কারণে অভিবাসী কর্মীর সংখ্যার তুলনায় দেশে রেমিট্যান্স কম আসে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বৈধ পথে এবং দক্ষ কর্মী প্রেরণে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। আজ আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস এবং জাতীয় প্রবাসী দিবস। এর প্রতিপাদ্য হলো ‘দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ/রেমিট্যান্স দিয়ে গড়ব স্বদেশ’। এ প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরেই নীতিনির্ধারক ও অংশীজনরা ব্যক্ত করে আসছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পক্ষে খুব বেশি কিছু করার আর সময় নেই। আবার যে পরিমাণ সমস্যা অভিবাসন খাতে বিদ্যমান সেটিও সরকারের পক্ষে দেড় বছরে সমাধান করা সম্ভব ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়। এ কথা সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও ওই অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে এ খাতের সমস্যা আরো কঠিন ও জটিল। এটা সমাধানের জন্য যে পরিমাণ প্রচেষ্টা দরকার এখনো সরকার সেটা করে উঠতে পারেনি। আগামীতে নির্বাচিত সরকার এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেই প্রত্যাশা রয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য টেকসই অভিবাসন খাত জরুরি। তাই নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ও সুবিধাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
প্রায় দেখা যায় প্রবাসী কর্মীরা দেশের এয়ারপোর্টে হয়রানি ও লুটের শিকার হন। এয়ারপোর্টে তাদের লাগেজ কেটে জিনিসপত্র চুরি করে নেয়া হয়। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রবাসে দেশের নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিতের কথা বলা হয়, অথচ দেশেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না! জানা গেছে, সম্প্রতি বিশেষ এক ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজ চুরির বিষয়টি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটা কতটা টেকসই সমাধান হবে তা পর্যবেক্ষণের বিষয়। বাংলাদেশী প্রবাসী কর্মীদের সব ধরনের সুরক্ষা দিতে সরকারের আরো বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মনোযোগ দিতে হবে বৈদেশিক শ্রমবাজার অক্ষুণ্ন রাখার প্রতি। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে বৈধ পথে কর্মী পাঠানোর বিষয়টিকে। এ খাতে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ও দালাল শ্রেণীর দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তাদের আধিপত্য অভিবাসন খাতের নানা সমস্যার মূল কারণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সরকার নির্ধারিত অর্থের চেয়ে বিপুল অংকের টাকা গুনতে হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের। তার পরও তারা বিদেশে গিয়ে নানা প্রতারণার শিকার হন। তাই বৈধ পথে কর্মী প্রেরণের যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো অনতিবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দক্ষতা বাড়ানোও আবশ্যক।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদামতো দক্ষ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১০৪ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান উপযোগী ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পৌনে ১২ লাখের বেশি কর্মীকে। যদিও বিবিএসের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩-এর তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী।
প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাবে বিদেশগামী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ কারণে তাদের আয়ও অনেকাংশে সীমিত থাকে। প্রকৃত অর্থে কর্মীদের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির মধ্যে রাখা প্রয়োজন। এছাড়া দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিং কেন্দ্রগুলোর পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করা উচিত। বিদেশী ভাষা, কম্পিউটার, কেয়ারগিভার, যন্ত্র চালনা বা অপারেটিং স্কিল, নির্মাণ, ড্রাইভিংয়ে দক্ষতা অর্জনে জোর দিতে হবে। সর্বোপরি দক্ষ কর্মী তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়লে বৈধ পথে জনশক্তি রফতানির পথও সুগম হবে বলে আশা করা যায়।










