ব্যাংক খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন ও বিনিয়োগে স্থবিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মন্দা। বিশেষত একটি অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে এক ধরনের আর্থসামাজিক স্থবিরতা ও নানা ক্ষয়ক্ষতিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থনীতিকে স্থবির করে তোলে। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে তা ৮-৯ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষত ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আমদানি-রফতানির গতি বাড়েনি বলে সার্বিক পরিস্থিতিও তেমন উন্নত হয়নি। সরকারের প্রচেষ্টায় প্রবাসী আয় বাড়লেও অন্য কোনো সূচকে বিশেষ উন্নতি হয়নি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতি আস্থার সংকট থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
চলতি বছর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে পুনরায় রাজনৈতিক সরকার অধিষ্ঠিত হয়। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এ অল্প সময়ে সরকারকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। এরমধ্যে বাজেট প্রণয়ন একটি। এবার এমন একসময় বাজেট প্রণীত হচ্ছে, যখন মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে, রাজস্ব সংগ্রহ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এ পর্যন্ত রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃস্থ উভয় ঋণ লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। সঙ্গে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের নানা ত্রুটি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো বড় জটিলতা। উৎপাদন ও রফতানির ধীরগতির কারণে দেশে কর্মসংস্থানের পরিসর সংকুচিত আর দারিদ্র্য হার বেড়েছে। দারিদ্র্য হার বর্তমানে ৩০ শতাংশে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সবদিক সামাল দিয়ে বাজেট করা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। সরকারি অর্থের চাহিদা বাড়ায় সরকার এখন সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়নের দিকে এগোচ্ছে।
এবারের বাজেটের আকার বিগত বছরের বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। এডিপির আকার হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকার ওপর, যা বিগত বছরের তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি হবে। তবে এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকবে। বাজেটের আরো একটি অগ্রাধিকার খাত হবে সামাজিক সুরক্ষা খাত। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের একটা বিরাট অংশ চলে যায় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিতে এবং উন্নয়ন বরাদ্দ অবকাঠামো নির্মাণে। এ বরাদ্দ দিয়ে যদি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন সম্ভব না হয়, তবে বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। এজন্য শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন, নিয়মানুবর্তিতা ও কারিকুলাম যুগোপযোগীকরণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট থেকে অতীতে বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনা হলেও অনেক মেশিন ব্যবহারোপযোগীই হয়নি। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য খাবার ও ওষুধ সরবরাহের অর্থ অপচয়ের কথা শোনা যায়। এডিপির বড় বাজেট যদি দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা যায় তাহলে জনমানুষের উপকার হবে, কর্মসংস্থান হবে, রাজস্ব বাড়বে। বিগত কয়েক বছর এডিপির বাস্তবায়ন সুখকর ছিল না। চলতি বছরের নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। সেজন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দই বড় কথা নয়, দক্ষতার সঙ্গে সঠিকভাবে ব্যয় করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন অনেক জরুরি। এবারের বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের বর্তমান নীতি পদ্ধতি, সামর্থ্য, নেতৃত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে ২০২৬-২৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে সরকারের উচ্চাভিলাষী বাজেট শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না। আমাদের দেশে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশ সহনীয়। অনুমান করা যাচ্ছে যে ২০২৬-২৭ সালে বাজেটে ঘাটতি ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে।
এর মানে এই নয় যে সরকার আরো সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করুক। বরং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এনবিআরের সবচেয়ে অগ্রাধিকার কাজ হবে করজাল বাড়ানো। জনবল ও অফিস সংখ্যা বাড়িয়ে নিবিড় জরিপের মাধ্যমে করদাতা সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সব ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের করের আওতায় আনতে হবে। করের আওতা বৃদ্ধি, আদায় নিশ্চিতকরণ ও কর ফাঁকি রোধে কর কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও সততা অতীব প্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে। বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যথাযথ আয়কর ও ভাট প্রদান করে না। এক শ্রেণীর কর্মকর্তাদের এদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে। ভ্যাট অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু হলেও এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর খরচ ও বিক্রয় শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে, যা প্রশিক্ষিত জনবলের মাধ্যমে এনবিআর তদারক করবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টার্নওভারের ওপর আদায়কৃত ভ্যাট কখনো সঠিকভাবে আদায় করতে দেখা যায় না। আবার যারা নিয়মিত আয়কর ও ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছেন তাদেরই আরো বেশি ট্যাক্স দেয়ার জন্য হয়রানির অভিযোগ শোনা যায়। এনবিআর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের পাহাড়সম অভিযোগ। অভিযোগের সব সত্য এমন নয়, তবে অধিকাংশই সঠিক। এ অবস্থায় এনবিআরের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের কৌশলী, পেশাদার, সৎ এবং মানবসম্পদ পরিচালনায় দক্ষতাসম্পন্ন হতে হবে। একদিকে অধীনস্থদের যেমন কঠোর শাসনে রাখতে হবে, অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মানবিক গুণসম্পন্ন হতে হবে।
এডিপি বরাদ্দের ক্ষেত্রে পূর্বে থেকে চালু প্রকল্পে বরাদ্দ প্রদান জরুরি। অর্ধসমাপ্ত প্রকল্প ফেলে রাখলে একদিকে যেমন সম্পদের অপচয় হয়, অন্যদিকে প্রকল্প সমাপ্ত হলে দেশ ও জনগণ যে সুবিধা পেত তা থেকে বঞ্চিত হয়। উন্নয়ন প্রকল্প ঠিকমতো চালু থাকলে কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও জিডিপি বেড়ে যায়। বাজেট প্রণয়নে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিতে হবে, যা হলো বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। এডিপিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং তা যথাযথ ব্যয় করে পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়। বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য সরকারকে—বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, নীতিসহায়তা দিতে হবে, ব্যাংক ঋণ সহজ করতে হবে, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে, প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে, শিল্পায়ন বাড়ানোর জন্য কোনো কোনো সেক্টরে আমদানি শুল্ক রেয়াত বা কর কমিয়ে দিতে হবে। ব্যবসা ভালো হলে বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্ব বাড়বে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট জিডিপির ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বেসরকারি বিনিয়োগ গতিশীল না হলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ হতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমপক্ষে জিডিপির ২৮-২৯ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতাও বেসরকারি বিনিয়োগ কম হওয়ার অন্যতম কারণ। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে বেশকিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট রয়েছে এবং এজন্য ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঋণ পাচ্ছেন না।
বড় বাজেট করে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পাবেন না। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনেকটা উচ্চাভিলাষী হবে বলে মনে হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করত পারে। এ বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ আশানুরূপ না হলে ঋণের পরিমাণ আরো বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের সংগৃহীত অর্থের একটি বিশাল অংশ চলে যাবে ঋণের দায় মেটাতে। সরকার বিদেশী বহুজাতিক সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে যে ঋণের প্রত্যাশা করে তা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বিদেশী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় দেশের মুদ্রা সরবরাহে চাপ পড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রফতানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হলে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে এমনটিই প্রত্যাশিত।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব; চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত










