মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটে না। উদ্ভাবনী দক্ষতা ও দক্ষ পেশাদার তৈরি হয় না। আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে চাই শিক্ষা ব্যবস্থার মজবুত বুনিয়াদ। পৃথিবীব্যাপী শিক্ষার বুনিয়াদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রাথমিক শিক্ষাকে। তাই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষার মান নিশ্চিত প্রসঙ্গে বরাবরই প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকারে রেখেছে। এর ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষাকে শতভাগ অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করেছে। সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় সমমানের শিক্ষা নিশ্চিতে জোর দেয়া হয়েছে। শিক্ষার উপাদান মূলত তিনটি—শিখন, শেখন ও মূল্যায়ন। এ তিন পদ্ধতিকেই ফিনল্যান্ড, জাপান, কানাডার মতো উন্নত দেশগুলো করেছে যুগোপযোগী এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত বলা যায়।

দেশটিতে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশের বয়সসীমা সাত বছর। এর আগে কেউ চাইলে ঐচ্ছিকভাবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিতে পারে, বাধ্যবাধকতা নেই। প্রাথমিকে শুরুর অন্তত দুই বছর শিক্ষার্থীদের কোনো ফলাফল বা মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয় না। বরং ফলাফলের মাধ্যমে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা নিজেদের শিখন পদ্ধতির মূল্যায়ন করেন। আবার শিক্ষার্থীর কেবল বিষয়ভিত্তিক সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হয় না। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পারফরম্যান্সের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। এছাড়া দেশটিতে প্রাথমিক শিক্ষায় যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত করা হয়। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে। কেবল স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেই প্রাথমিকে শিক্ষক হওয়া যায় না। এজন্য শিক্ষক তৈরি-সংশ্লিষ্ট বিশেষ প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট অর্জন করতে হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত কোর্স থাকে, যাতে শিক্ষকরা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। অন্য উন্নত দেশগুলোর প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামো ও শিক্ষক নিয়োগের ধরনও অনেকটা একই।

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি বহুল আলোচিত হলেও এক্ষেত্রে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার মানোন্নয়নে শিখন-শেখানো ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। বরং বর্তমান সরকারও অতীতের মতো অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ উপলক্ষে এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মোট তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে গঠন করা পরামর্শক কমিটির সুপারিশ ছিল সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া। কোথায় শিক্ষক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে এগুলোর ভিত্তিতে প্রকল্প নেয়া প্রয়োজন। এছাড়া শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কেননা পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ইত্যাদি ছাড়া মানসম্মত শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অবকাঠামোগত সুবিধা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নে অবকাঠামোই শেষ কথা নয়, তা বিভিন্ন ধাপে বাস্তবায়িত প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়।

মানসম্মত শিক্ষার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। কিন্তু এদিকে আজও বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে না। এমনকি বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষকের ঘাটতি। সে সমস্যার সমাধানের গতিও বেশ ধীর। অথচ জাপান, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ যারা শিক্ষায় অগ্রসর দেশ তারা পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দেয়। এছাড়া এসব দেশে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামো এখনো দুর্বল। দেশে পাঠ্যক্রম বারবার পরিবর্তন করে যতই আধুনিক করা হোক, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবু দেশে শিক্ষকদের প্রতি সেই আস্থা ও মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এটা না হলে শিক্ষা খাতে সংস্কার কঠিন হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নেয়া হয়েছে তাতে মানসম্পন্ন শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ—সব পর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই। সেজন্য শিক্ষক নিয়োগ সুপরিকল্পিত হতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন পাঠ্যক্রমসহ শিখন-শেখানো পদ্ধতির আধুনিকায়ন। কোনো দেশের শিক্ষার মান নির্ধারণের অন্যতম উপাদান পাঠ্যক্রম। কেননা এটি শিশুদের শেখার গতি, মানসিক চাপ ও দক্ষতা বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পাঠ্যক্রম হতে হবে আনন্দদায়ক ও সৃজনশীল। কিন্তু দেশের পাঠ্যক্রম মুখস্থনির্ভর করে তোলা হয়েছে। তাই শিখন-শেখন পদ্ধতিও সেকেলে রয়ে গেছে। এ কারণে মূল্যায়নও করা হয় গতানুগতিকভাবে, সামষ্টিক বিষয়ের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। উপরন্তু দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বিভিন্ন স্তর ও কারিকুলামে বিভক্ত, যা এখানে বৈষম্যও বাড়িয়েছে। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা যায়নি, বরং এটি হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। প্রকৃত প্রস্তাবে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠ্যক্রম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের পাঠ্যক্রমের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এসব বিদ্যমান বিভাজন ও পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ভারসাম্যপূর্ণ বিভাজন ও ধাপে ধাপে উন্নয়নশীল কাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। শিশুদের মানসিক বিকাশ, শেখার গতি ও শিক্ষার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিক্ষায় অগ্রসর দেশগুলোর শিক্ষার মডেল বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এসব দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই বই পড়ানো হয় এবং একই ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। এগুলোর বাইরে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ইউনেস্কোর মতে, কোনো দেশের বাজেটের ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। বিপরীতে আমাদের দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে। আবার দেখা যায় বরাদ্দের সিংহভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় অন্য উদ্যোগগুলো আর হয়তো নেয়া হয় না। সুতরাং শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে এ খাতে সরকারকে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।