পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন এফএও, আইএফএডি ও ডব্লিউএফপিতে। ২০২০-২২ মেয়াদে ৩৮ সদস্যবিশিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের আকস্মিক উত্থান, হরমুজ প্রণালির সঙ্গে যুক্ত বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আসন্ন হুমকি এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার এ সময়ে পাকিস্তানের এ প্রচেষ্টায় আসলে কতটা আশাবাদী হওয়া যায়? এ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা কি সত্যিকারের কোনো কূটনৈতিক সুযোগ নাকি স্বল্পমেয়াদে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা?

গত কয়েক সপ্তাহে কূটনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পাকিস্তান যা অর্জন করেছে তা অসাধারণ। গোটা বিশ্বই এ উদ্যোগের প্রশংসা করছে। কারণ অনেকেই মনে করছে পাকিস্তানের উদ্যোগ এ অঞ্চলই নয় বরং গোটা বিশ্বকে বিপর্যয়ের খাদ থেকে উদ্ধার করেছে। এখন পরিস্থিতি উত্তেজনা প্রশমনের দিকে এগোচ্ছে। এমন একটা সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এত উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় বসানোর বিষয়টা অকল্পনীয়ই ছিল। কারণ বিগত ৪৯ বছর ধরে এমন কিছু ঘটেনি। এখন যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে সেটাই আমরা দেখছি। পরিস্থিতি যেদিকে যায় তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কখনো ভালো খবর পাই, আবার কখনো কখনো বাজে খবরও পাই। গোটা বিশ্বই এখন পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে। সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে আছে কয়েকটি রাজধানী—তেহরান, রিয়াদ, ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন। কাজটা কোনো অংশেই সহজ নয়, বরং এটা খুব চ্যালেঞ্জিং।

মনে রাখতে হবে, শান্তি আর চুক্তির পথে বিরাট বাধা আছে। দুই পক্ষের মধ্যকার আস্থার ঘাটতি এখানে সবচেয়ে বড় বাধা। এক পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আর অন্য পক্ষে ইরান। এ দুই পক্ষের আস্থার ঘাটতি ঐতিহাসিক। আপাতদৃষ্টে এ ঘাটতি পূরণ করার কাজটি অনেক কঠিন। তবে এখন যে অচলাবস্থা রয়েছে সেটি নিরসনে পাকিস্তান তাদের বৈশ্বিক নির্ভরযোগ্যতা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ বিরোধী সব পক্ষ অর্থাৎ ইরান, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের প্রতি এ পক্ষগুলোর বিশ্বস্ততাকে পুঁজি করে সংঘাতময় পক্ষগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করার চেষ্টা চলছে। তবে কিছু গুরুতর বিষয়ের সমাধান জরুরি। মূলত পাকিস্তানে দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা এবং ইরান ১০ দফা দাবি উত্থাপন করে। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে ছিল। ওই অবস্থানে থেকে পাকিস্তানের একান্ত ও নিবিড় কূটনীতির মাধ্যমে ২০ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১০ দফা কাঠামোতে ঐকমত্য হয়েছে। প্রথম দফার আলোচনাটি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, দুই কি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় এ আলোচনার পরও এক ধরনের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল। আসলে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষের ধারণাই আলাদা। এছাড়া ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো কর্তৃক জব্দকৃত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্তকরণের বিষয়টি ছিল। সবশেষে হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। ইরান এটি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল আর যুক্তরাষ্ট্র আর অধিকাংশ দেশই যুদ্ধের আগে প্রণালিটি স্বাভাবিকভাবে যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল তা চাচ্ছিল।

সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরান সফর করেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সেনাপ্রধানের সঙ্গে সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য তাদের প্রচেষ্টা চলমান। এরই মধ্যে হরমুজ ফের অবরোধ দিয়েছে তেহরান। পাকিস্তানের এ কূটনীতিক প্রয়াসের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?

এই তো কিছুদিন আগেও আমরা বেশ ভালো কিছু খবর পেয়েছি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধমুক্ত করতে রাজি হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোও যেতে পারত। এদিকে লেবাননেও আমরা যুদ্ধবিরতি দেখেছি। আরো কিছু বিষয় আছে যা দেখে মনে হচ্ছে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষই কাছাকাছি পর্যায়ে আসছে।

বাংলাদেশসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানিনির্ভর দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে নানামুখী সংকটে পড়েছে। পাকিস্তানও এর বাইরে নয়। এ সময়ে তারা পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিচ্ছে? তাছাড়া এমন সংকটকালে পাকিস্তান যেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেকটা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করছে তা থেকে আমরা কীভাবে শিক্ষা নিতে পারি?

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো জ্বালানি পণ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিপাকে রয়েছে। অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপানসহ এশিয়ার একটি বড় অংশ জ্বালানি পণ্যের সংকটে রয়েছে। জ্বালানি পণ্য সরবরাহ বাদেও বড় আরেকটি হুমকি আছে। বিশ্বের প্রায় ৩৪ শতাংশ সার এ হরমুজ প্রণালি দিয়েই তো আসে। হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ পরিস্থিতি থাকলে এবং দ্রুত যদি অচলাবস্থার নিরসন না হয় তাহলে আগামী মাসগুলোতে খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা প্রবল। এদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাটুকু চমৎকারই বলতে হবে। ষাট ও সত্তরের দশকে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের একটা বড় অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। জলবিদ্যুৎ বাঁধের ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামো গড়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা নীতিপর্যায়ে কিছু ভুল করি। জ্বালানি মিশ্রণকে জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ তাপবিদ্যুতের দিকে বেশি নির্ভরশীল করে ফেলা হয়। এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য এখন সেখান থেকে ফিরে আবারো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। শুধু জলবিদ্যুৎ নয়, সৌর ও বায়ুশক্তির দিকেও মনোযোগ বেড়েছে। সৌরবিদ্যুতের বিষয়ে পাকিস্তানে যা ঘটছে তা মুগ্ধ করার মতো। রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পর্যায়ে কিন্তু এ উদ্যোগ পুরোপুরি নির্ভর করেনি। বরং বেসরকারি খাতই এর প্রসার ঘটিয়েছে। মাইক্রোসোলারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে হাজার হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। মানুষ ছাদে সোলার প্লান্ট স্থাপন করেছে, এমনকি কারখানাগুলোও সৌরচালিত জ্বালানি ব্যবহারের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এখন পর্যন্ত পরিসংখ্যান অসাধারণ। কিছু অনুমান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে সোলারের মাধ্যমে দশ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ক্ষমতা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এটি দেশকে তার জ্বালানি মিশ্রণ পরিবর্তনে সত্যিই সাহায্য করেছে। আমি মনে করি, মাইক্রোসোলারই ভবিষ্যতের পথ। বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সময় লাগে আর এর কিছু সমস্যাও রয়েছে। কিন্তু মাইক্রোসোলার ব্যতিক্রম, এটি সফল হয়েছে। আর এর খরচ এমন এক পর্যায়ে নেমেছে যে তাপবিদ্যুৎ বা অন্যান্য জ্বালানি উৎস থেকে অনেক কম মূল্যে উৎপাদন করা যায়। এ সফলতা সম্ভব হয়েছে কারণ এর বাজারটা লাভজনক। আর আমাদের দেশ এমনিতেও সূর্যের আশীর্বাদপুষ্ট। এদিকে বায়ুচালিত জ্বালানির মাধ্যমে পাকিস্তানে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা যুক্ত করেছে। অবশ্য এটির ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা মাইক্রো উইন্ড পাওয়ার প্রযুক্তি পেলে এ উদ্যোগ আরো সফল হবে। তবে এখনো মাইক্রোসোলার দারুণভাবে সফল। আমি মনে করি, বাংলাদেশও এ উদ্যোগগুলো অনুসরণ করতে পারে।

ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিসর সীমিত। তবে সম্ভাবনা যেহেতু আছে সেহেতু কোন কোন খাতকে বিবেচনায় এনে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরো উন্নত করা যেতে পারে?

আমার তো মনে হয় অনেকগুলো পরিপূরক খাত রয়েছে। এ কথা সত্য, দুই দেশের রফতানি ও আমদানির ধরন অনেকটা এক। দুই দেশই টেক্সটাইল ও চামড়াজাত পণ্যের বড় রফতানিকারক। আর যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য আমদানি করে থাকি। কিন্তু একই খাতে সংযোজিত মূল্য তৈরি করার এবং সমন্বয় সাধনের বড় সম্ভাবনা আছে। টেক্সটাইল খাতের কিছু কিছু জায়গায় পাকিস্তান এগিয়ে আছে। এদিকে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। পাকিস্তান মূলত হোম টেক্সটাইল তৈরিতে বিশেষায়িত। আবার অস্ত্রোপচারের উপকরণের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। ওষুধ তৈরিতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেছে। এভাবে দেখা গেলে দুই দেশের মধ্যে খাতভিত্তিক সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। আমাদের মধ্যে সহজেই মাল্টিবিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের আসলে দুটো কাজ করতে হবে। প্রথমত, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গড়তে হবে। আর দ্বিতীয়ত, দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। প্রতিনিয়ত প্রতিনিধি দলের যাতায়াত এবং দুই দেশের বিভিন্ন ব্যবসার সুযোগ সম্পর্কে ভালো তথ্য প্রচারে মনোযোগ দিতে হবে। সম্ভবত আমাদের বিকল্প ব্যবস্থারও প্রয়োজন। যদি আমাদের সব বাণিজ্য ডলারে করতে হয়, তবে কখনো কখনো এটি কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ উভয় দেশের বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ পড়ে। তবে আমরা যদি বাণিজ্যের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আসতে পারি, তবে তা খুব সহায়ক হবে।

দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময়েও সার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার কি এখন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে?

সম্ভাবনা আছে। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের গোঁড়ামি ও অনমনীয় অবস্থানের জন্য পুরো প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ বাস করে। অথচ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য ৩ শতাংশেরও কম। নিখুঁতভাবে বললে, এটি হতাশাজনক। এ সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানো হয়নি। আমাদের সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, এ অঞ্চলে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ, বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক বিনিয়োগ, বিনিয়োগ সহযোগিতা, আঞ্চলিক পর্যটন এগুলোও জরুরি। আমাদের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং আরো অনেক ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র ব্যবহার করে আঞ্চলিক জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সেজন্য সার্ক একটি দুর্দান্ত মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু ভারতকে সঙ্গে নিয়ে বা ভারত ছাড়াই আমরা এগিয়ে যাব—এমন একটি পরিস্থিতি হয়তো সামনে দেখতে হতে পারে। গত বছর সার্কের মহাসচিব পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন এবং আমার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশী ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার ভালো আলোচনা হয়েছিল। সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে আমাদের বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্কের স্বপ্ন দেখেছিলেন। গত বছর সার্কের মহাসচিব পাকিস্তানে ছিলেন। তিনি অবশ্যই বাংলাদেশের। তিনি আমার অফিসে এসেছিলেন। আমরা খুব ভালো আলোচনা করেছি এবং সার্ককে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায় সে বিষয়ে ধারণা বিনিময় করেছি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সার্ক ছিল বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন। আমি মনে করি, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার এখনই সময়। এ বিষয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের মতো অভিন্ন মুদ্রা এবং মুক্ত সীমান্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন দক্ষিণ এশিয়ায়?

আমাদের ধীরে ধীরে ওই ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে এগোতে হবে। প্রথমে, আমাদের কম বাণিজ্য বিধিনিষেধ দিয়ে শুরু করতে হবে। সামনের পথ হলো পুরো অঞ্চলের জন্য একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল। পরবর্তী গন্তব্য হলো একটি সাধারণ বাজার হওয়া যেখানে মূলধন, পণ্য ও পরিষেবা চলাচল করতে পারে। এরপর আরো এগিয়ে যাওয়া যাবে। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো আমরা এখনো এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া শুরুই করিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পঞ্চাশের দশকে যাত্রা শুরু করে। আসিয়ান ও নাফটার মতো আরো অনেক সফল মডেল রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আঞ্চলিক সংহতির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়া অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের একটি বাস্তবসম্মত উপায়ে কোথাও এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা দেখছি। এটি কি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে গড়াবে নাকি শিগগিরই উত্তেজনা প্রশমিত হবে?

আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা হলো এটি যেন না বাড়ে। আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে পাকিস্তান। বিষয়টা দুঃখজনক, কারণ তারা এত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা পাকিস্তানকে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের জন্য তাদের ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না। তাদের কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের সব বিকল্প ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এক্ষেত্রে সামরিক বিকল্প, কাইনেটিক বিকল্প রয়েছে। আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং ট্রানজিট বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিকল্প রয়েছে, কারণ আফগানিস্তান একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। আমরা তাদের ট্রানজিট বাণিজ্যের সুযোগ দিতাম। আমরা কূটনীতি ব্যবহার করতে পারি, যা আমরা করে আসছি। এক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক জাতিসংঘভিত্তিক কূটনীতিও পরিচালিত হতে পারে। উত্তেজনা প্রশমনে সম্ভাব্য সব উপায়ই আমরা ব্যবহার করছি। আমাদের উদ্দেশ্য সরল। আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব না হয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেন থাকে। কারণ আমাদের অনেক মিল এবং ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। যদি সন্ত্রাসের প্রবাহ বন্ধ হয়, তবে উভয় দেশের জন্য সম্পর্কোন্নয়নের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। আফগানিস্তান তার ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়াকে সংযুক্ত করার দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি, বা সংযোগকারী হতে পারে। আশা রইল, শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা সংঘাত ও কলহের পরিবর্তে শান্তি ও অগ্রগতির পথে যাত্রা করবে।

গত বছর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ফ্লাইট শুরু হয়েছে। জনগণের সঙ্গে জনগণের (পিপল টু পিপল) সংযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মান ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন?

আমি একটি বিশাল সম্ভাবনা দেখছি। পাকিস্তান সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক চায়। এটাই আমাদের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা। আমরা আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতার সম্পর্ক চাই। আমরা আরো বেশি জনগণের মধ্যে যোগাযোগ দেখতে চাই, কারণ উভয় পক্ষেই এত মিল এবং সদিচ্ছা রয়েছে। সম্প্রতি আমার কাছে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ বা ৩০ জনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল যেখানে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, গবেষক, পণ্ডিত এবং কয়েকজন রাজনীতিবিদও ছিলেন। তাদের সদিচ্ছা সত্যিই মুগ্ধ করেছে। আমি বিশ্বাস করি পাকিস্তানের পক্ষেও আপনি সেই সদিচ্ছার সম্পূর্ণ প্রতিদান দেখতে পাবেন। এটিকে সব ক্ষেত্রে একটি ঘনিষ্ঠ, আরো সহযোগিতামূলক এবং পারস্পরিকভাবে উপকারী সম্পর্কে রূপান্তরিত করতে হবে।

ভাষান্তর: আমিরুল আবেদিন