আমাদের দেশের অর্থনীতিতে গরিব-ধনী উভয়ই ভূমিকা রাখেন। আমাদের পুরো উন্নয়নের বিষয়টা মোটাদাগে দুটো বড় খাত থেকে আসে। প্রথমত, বিভিন্ন পর্যায়ের ট্যাক্স, দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে আনা ঋণ সহায়তা। একজন ভিক্ষুক থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত ট্যাক্স দেন। শিল্পপতিরা কীভাবে ট্যাক্স দেন সেটা না বললেও হয়। তবে ভিক্ষুক কীভাবে ট্যাক্স দিতে পারেন? সারা দিন যে অল্প পরিমাণ টাকা পান সন্ধ্যাবেলায় ক্ষুধার তাগিদে তাও দোকানে যায়। তিনি যখন পণ্য কেনেন তখন সবার মতো তাকেও ভ্যাট দিতে হয়। আজকে জন্ম নেয়া শিশুর ট্যাক্স থাকে, যখন তার বাবা-মা তার জন্য কিছু কিনতে যান তখন ট্যাক্স দিতে হয়। বিদেশ থেকে যে ঋণ আনা হয় সে ঋণের দায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে সদ্য জন্ম নেয়া শিশু সবার ওপরই সমানভাবে পড়ে। যেহেতু দায়িত্ব তারা নিচ্ছে অর্থনীতিটাও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই হতে হবে। তা না হলে বড় অবিচার হবে। সে অবিচারটাই আমাদের সমাজে চলছে। এটা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। এখন এটা বন্ধ হবে কীভাবে? বাংলাদেশের ছোট জমিনে ১৮০ মিলিয়ন (১৮ কোটি) লোক বসবাস করে! এত ছোট জমিনে এতসংখ্যক মানুষের বাস দুনিয়ার আর কোথাও নেই। তাহলে মানুষ কি আমাদের জন্য বোঝা? অবশ্যই না।
আমরা জনসংখ্যাকে জনশক্তি ও জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারি। যদি আমাদের সেই পরিকল্পনা থাকে। পরিকল্পনা না থাকলে ১৮ কোটির জায়গায় ১৮ লাখ থাকলেও আমরা সমাজকে সাজাতে পারব না। এখন এই ১৮ কোটি মানুষ জনসম্পদে রূপান্তর হবে কীভাবে? ২৫ ভাগ মানুষ জনসম্পদে পরিণত হওয়ার প্রাথমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শুরুতেই পেছনে পড়ে যায়। যারা প্রান্তিক মানুষ তাদের সন্তান স্কুল-মাদ্রাসায় যায় না বা যেতে পারে না। কেউ দুই-এক ক্লাস পড়লেও জীবিকার তাগিদে ছোট মানুষটা কাজে লেগে যায় পরিবারকে সাহায্য করার জন্য। তার মেধা এখানেই শেষ! হয়তোবা তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বা বড় কোনো অর্থনীতিবিদ লুকিয়ে আছে, দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদের কেউ এখানে লুকিয়ে আছে। কিন্তু সে তো পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তাকে কে পথে নিয়ে আসবে? এ দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ। কিন্তু এটা তো হচ্ছে না। তাহলে এ অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে কীভাবে এগোনো যায়?
বর্তমানে দেশে প্রচলিত অর্থনীতিতে যেমন সরকারি মারপ্যাঁচ আছে, লালফিতার দৌরাত্ম্য আছে, ঠিক তেমনিভাবে দুর্বৃত্তপনাও আছে। একজন উদ্যোক্তা চিন্তা করলেন তিনি কারখানা করবেন। প্রথমে তাকে এক টুকরো জমি তো নিতে হবে। যেই জমি কিনতে গেছেন হাজারো সমস্যা তাকে ঘিরে ধরেছে! যে জমিটায় এক মাসে পরিষ্কারভাবে কাজ শুরু করার কথা সেখানে এক বছরেও কিছু হচ্ছে না! একটার পর একটা ঝামেলা তাকে গ্রাস করছে, ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্র নিজেই সে দুর্বৃত্তায়নে সহায়তা করছে! এটা ব্যাখ্যাতীতভাবেই স্পষ্ট। যেখানে উদ্যোক্তার পাঁচ বছরের মধ্যে সফলতার মুখ দেখার কথা সেটা দেখা যায় ১০ বছর লাগছে! কিন্তু এর ভেতরেই তিনি বিপদে পড়ে গেলেন। তিনি এরই মধ্যে ব্যাংক লোন এনেছেন, ঝামেলার ফলে লোনটা মন্দ ঋণ (এনপিএল) হয়ে যাবে!
সমাজের পক্ষ থেকে চাঁদা, দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের এমনভাবে নিরুৎসাহিত করে, নিজ দেশে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা করে না। যেটা আছে সেটাই বাঁচানো নিয়ে ব্যবসায়ীদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আমরা যখন বিদেশী বিনিয়োগের জন্য তাদের সঙ্গে আলাপ করি, তারা বলে তোমার দেশ তো স্থির নয়। ব্যবসার পরিবেশ নেই, লালফিতার দৌরাত্ম্য আছে! তোমার দেশে আমার টাকা ও আমার জীবন নিরাপদ নয়। আমার জীবন ও টাকার নিরাপত্তা ছাড়া তোমার দেশে বিনিয়োগ করব কেন? তোমরা পরিবেশ তৈরি করো, আমরা আসব। আমরা যখন বলি এখানে সস্তা শ্রমবাজার আছে, উৎপাদন ব্যয় কম হবে, লাভ বেশি হবে তখন তারা বলে উৎপাদন করতে পারলেই না আমরা লাভ করব! এটা শুধু বিদেশীদের কথা নয়, সব ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারই কথা।
অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বলা হয় সুবিধাবাদী। যখন যে সরকার আসে তার সঙ্গেই আঁতাঁত করে। এটা কেউ করে মন থেকে, কেউ বাধ্য হয়ে। আর আঁতাত ছাড়া উপায়ও নেই ব্যবসা বাঁচাতে গেলে! এর দায় তাদের নয়, দায় রাজনীতিবিদদের। রাজনীতির বাইরে কোনো অর্থনীতি নেই। সব নীতির সমন্বয় করবে, বিকশিত করবে ও নিয়ন্ত্রণ করবে রাজনীতি। মগজ ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক থাকবে। ব্যবসায়ীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রাজনীতির জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা যতই বলি-ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। এটাই সত্য। এখন যা পারলাম না তা কি আর হবে না? হবে, কাউকে না কাউকে করতেই হবে। প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আমি আপনি আমরা সবাই বাঁধব, শপথ নেন। আগে যেটা হয়নি এখন সেটা হতে হবে। সারা দুনিয়া পারলে আমরাও পারব।
আমাদের মেধাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমার দেশে পারছে না কেন? আমরা সেই উপযুক্ত পরিবেশ তাদের দিতে পারিনি, যার ফলে আমাদের মেধা চলে যায় অন্য দেশে। পাবলিক ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যারা লেখাপড়া করেন তারা তো মেধার দিক থেকে উন্নত, তারাও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যান, কিন্তু ফিরে আসতে চান না। তাদের যখন বলি তুমি এ দেশকে ভুলে গেলে কেন? তারা বলে, দেশ তো আমাদের চায় না! আমাদের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ নেই দেশে। আমি জানি, এ সরকারের সময়ও কিছু মেধাবী মানুষ দেশে চলে এসেছে। তারা কিন্তু টাকার সুবিধার জন্য আসেনি, দেশকে কিছু দেয়ার জন্য এসেছে। আমরা যদি এ আস্থাটা সবার মধ্যে আনতে পারি যারা বিদেশে সার্ভিস দিচ্ছে তারা দেশে ফিরে আসবে। তারা ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের নেতৃত্বও দিতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
আমি অনেক শিল্পপতির সঙ্গে কথা বলে দেখি তার সন্তানরা কোথায় আছেন। তারা জানান, বিদেশে পড়াশোনা করে সেখানেই থাকেন। কোনো একজনকে হয়তো দেশে রাখেন জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য। তাদের শঙ্কার জায়গা নিরাপত্তা! এটাই বাস্তবতা! আমাদের সমাজ এ নিরাপত্তা দিতে পারেনি!
আমাদের দৃষ্টি মাত্র তিনটি জায়গায়। এগুলো ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে। প্রথমে শিক্ষা। সার্টিফিকেট প্রডাকশনের শিক্ষা নয়। প্রফেশনাল শিক্ষা দিতে হবে। প্রত্যেকটা ব্যক্তি হবে একেকজন সম্পদ বা শক্তি। কৃষক হলেও তিনি হবেন দক্ষ কৃষক। কৃষি হবে আমাদের কারখানা। প্রত্যেকটা ঘর হবে কারখানার হাব। এটা সম্ভব। জাপানে অনেক পণ্য আছে যেগুলো ঘরে তৈরি হয়। একেকটা ঘরকে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। ফলে প্রত্যেকটা ঘর একটা কারখানা হয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, হলো দুর্নীতি। এটা আমাদের সমাজের সর্বত্র বিস্তৃত! আল্লাহ আমাকে মাফ করুন, আমি বিস্মিত হই জেনে, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগের জন্যও নানা লেনদেন করতে হয়! আমরা দুর্নীতি দমনের জন্য পাতা ও ডাল ধরে টান দিই! কিন্তু মূল জায়গা অক্ষতই রয়ে যায়! দুর্নীতি যারা করে তারাও দুর্নীতির শিকার হলে পছন্দ করে না। তার মানে এটাকে সবাই ঘৃণা করে। কিন্তু নিজের জায়গায় লোভ সামলাতে পারে না। অথবা সিস্টেম (ব্যবস্থা) তাকে বাধ্য করে। যদি একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা যায় তখন সবাই কমফোর্ট জোনে চলে আসবে। তখন প্রত্যেকেই যার যার কাজটা করবে সম্মানের সঙ্গে। সবার জায়গায় সবাই নিরাপদ হবে।
আমাদের তৃতীয় দৃষ্টি হলো ন্যায়বিচার সর্বত্র ও সর্বজনের জন্য। এ তিন জিনিসকে যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি, আমাদের ব্যবসা হবে টেকসই ও সফল। জাতি হবে অগ্রসরময় বহুমুখী। এ তিনটিকে নিশ্চিত করা না গেলে কোনোভাবেই আশা করা যায় না দেশ ভালোর দিকে এগোবে। বরং আরো খারাপের দিকে ধাবিত হবে। আমরা যেভাবে নিজ সন্তানের মৃত্যুকে বরদাশত করতে পারি না তেমনি দেশের নীতিবোধের মৃত্যুকেও বরদাশত করতে পারি না। এ জায়গায় বলব রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হলো মূল ইচ্ছা। এ জায়গা ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে। তবে হ্যাঁ, একদিনে হবে না। ক্রমান্বয়ে একটা পরিবর্তন আসবে ইনশাআল্লাহ। আমরা বিপ্লবী পরিবর্তনের দিকে নয়, যৌক্তিক পরিবর্তনের দিকে যেন নিতে পারি ঐকবদ্ধভাবে। আমি সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে আহ্বান করব আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ হই এবং শপথবদ্ধ হই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ডা. শফিকুর রহমান: আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অর্থনীতিতে ন্যায্যতা’ শিরোনামে তৃতীয় অধিবেশনের চেয়ার হিসেবে দেয়া বক্তৃতায়]










