রাশিয়ার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এক অযৌক্তিক সংঘাত, যা অবশ্যই অবসান হওয়া জরুরি। কিন্তু কীভাবে? সামরিক পরিস্থিতি যখন কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, তখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পক্ষেই রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা স্বাভাবিক। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক শান্তি পরিকল্পনা দেখে মনে হবে এর খসড়া যেন ক্রেমলিনে বানানো। এ কথা বলা কঠিন নয়, এ রাজনৈতিক খেলায় জয়ের পাল্লা নিশ্চিতভাবেই আগ্রাসীর দিকেই ভারী।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক ও ত্রুটিপূর্ণ ২৮ দফা পরিকল্পনাটি আসে চারটি পৃথক ঘটনার পর, যেগুলোর প্রতিটিই এক পর্যায়ে গিয়ে চরম সংকটে পৌঁছেছিল। প্রথমটি হলো ইউক্রেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার অভিযোগ। ইউক্রেনের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো থেকেই এসব অভিযোগের সূত্রপাত হয়, যা পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর একটি বড় প্রয়াস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার হুমকি বাড়াচ্ছে, এমনকি এমন অস্ত্র পরীক্ষা করছে, যা যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপের অন্য নিচু উপকূলীয় দেশগুলোর দিকে তেজস্ক্রিয় সুনামি পাঠাতে সক্ষম। ক্রেমলিনের দাবি ‘বুরেভেস্তনিক’ নামের পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটি কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা বাড়ানো থেকে বিরত রাখা।

তৃতীয়ত, ইউরোপের প্রতিষ্ঠানবিরোধী জনতুষ্টিবাদী দলগুলো এবং মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের সোচ্চার কণ্ঠগুলো ঘটনাকে তাদের এজেন্ডার শীর্ষে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি তারা এমন এক সময়ে প্রচার চালাচ্ছে, যখন ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের সরকারগুলোকে দুর্বল, অদক্ষ এবং স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া পুষিয়ে নেয়া ও বিভক্ত সমাজকে পুনরায় সংহত করার বিষয়ে দিশাহীন বলে মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্লেষকরা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যেখানে মারিন ল্যাপেনের চরম ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি, জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি এবং নাইজেল ফ্যারাজের রিফর্ম ইউকে যথাক্রমে ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনে ক্ষমতায় আসতে পারে।

সবশেষে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও ইউরোপের রাজনীতিকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার তেল কিনে নিষেধাজ্ঞা ক্ষুণ্ন করছে। প্রকৃতপক্ষে এখন এ ক্রয় দুই দেশেই সীমিত—হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া, যা ড্রুজবা পাইপলাইনের দক্ষিণ শাখার সঙ্গে সংযুক্ত। চেক প্রজাতন্ত্র, যা আগে রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। চলতি বছরের শুরুতেই ট্রান্সআল্পাইন পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত রুশ-বহির্ভূত জ্বালানিতে সম্পূর্ণভাবে রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। প্রকৃতপক্ষে মূল দায়ী দেশটি হলো হাঙ্গেরি, যার ক্রেমলিনঘেঁষা সরকার স্পষ্টভাবে ট্রাম্পের কাছে রুশ জ্বালানি কেনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল এবং ট্রাম্প তা আনন্দের সঙ্গে মঞ্জুর করেছিলেন।

সর্বশেষ মার্কিন শান্তি প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান, যা কিছু পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক (প্রয়াত জর্জ কেনানসহ) দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে এনেছেন। এ বয়ানে ন্যাটোকে মস্কোর জন্য একটি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য পশ্চিমাদের দেয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে রুশ সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দাবি করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণের অঙ্গীকারই ছিল সেই বিস্ফোরক, যা একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেয়। ফলে ২০১৪ সালে রাশিয়া একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যা পরে ২০২২ সালে আরো বিস্তৃত আকার ধারণ করে।

অবশ্যই এ বয়ানটি কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। রাশিয়ার ন্যাটোর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ১৯৯০ বা ২০০০-এর দশকে শুরু হয়নি, বরং এটি ঘটেছে সেই মুহূর্তে যখন পশ্চিমা বিশ্ব নিজেই ভাঙনের মুখে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর। ঠিক তখনই ন্যাটোবিরোধী যুক্তি একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে পশ্চিমা জোটকে বিভক্ত করার চেষ্টা শুরু হয়।

যারা বিশ্বাস করে যে ন্যাটো সম্প্রসারণের কারণে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউক্রেনে ঘটেছে, তারা ক্রেমলিনের ‘‌ন্যাটো হুমকি’র যুক্তিকে গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তা ক্রেমলিনের জন্য প্রকৃত হুমকি যেমন সফল গণতন্ত্রী বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বকে খাটো করে ফেলছে। ক্রেমলিনে উনবিংশ শতকের ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, স্বৈরাচার ও জাতীয়তাবাদ মূল্যবোধের ওপর এখনো নির্ভরশীল। এ দৃষ্টিভঙ্গি রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও স্বনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে রূপ দেয় আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার অধিকারে।

এ পরিস্থিতিতে সংঘাত কি থামানো সম্ভব? কার্যকর যুদ্ধবিরতি নাগরিকদের জীবন পুনর্গঠন, জরুরি অবকাঠামো পুনঃস্থাপন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের সুযোগ দিতে পারে। তবে যদি এটি রাশিয়ার রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টার ফল হয়, তাহলে ইউক্রেন, ইউরোপ এবং বিশ্বের জন্য এর প্রভাব ভয়াবহ হবে। এমনকি সংশোধিত ট্রাম্প পরিকল্পনাও, যা ন্যাটোর কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ইউক্রেনের দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে দেখা হচ্ছে পেছন থেকে ছুরিকাঘাতের ক্ল্যাসিক উদাহারণ হিসেবে। যদিও ইউক্রেনীয় বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়নি, তবু যুদ্ধের ফলাফল দেশটির জন্য বিধ্বংসী হবে। ইউক্রেনীয়রা স্বাভাবিকভাবেই এর জন্য দায়ীদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করবে। একই সঙ্গে তা যেকোনো সংবেদনশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার আশা শেষ করে দেবে, দেশটিকে আবার স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দেবে।

মূল ট্রাম্প পরিকল্পনাও ইউরোপ ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্বল করার পাশাপাশি এর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চিহ্নিত হবে কেবল কাগজের বাঘ হিসেবে, এমন এক রাজনৈতিক খেলোয়াড় যার বড় বড় কথা এবং চিন্তা আছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ইচ্ছা ও শক্তি নেই।

সেক্ষেত্রে ইউরোপের রাজনীতিবিদদের চরম ডানপন্থার কাছে হার মানতে হতে পারে, যা এখন সার্বভৌমত্বের পুরনো ও নস্টালজিক সংস্করণের প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ধারণাকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে নিয়েছিল ফ্রান্স ও জার্মানি। পরিস্থিতি বিশেষ করে এ দুই দেশের জন্যই বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও নাজি সহেযাগী মার্শাল ফিলিপপেঁতারের দাবি মোতাবেক ‘‌ফ্রান্সের বিপজ্জনক সময়ের সুরক্ষাকবচ’কে ফিরিয়ে আনা হতে পারে। সার্বভৌমত্বের প্রাক-ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধারণার দিকে প্রত্যাবর্তন প্রতিবেশীদের ওপর জার্মানির আধিপত্য দাবিকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

বাকি বিশ্বের জন্য রাশিয়ার ইতিহাসবোধকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া বিশ্বের মঞ্চে মার্কিন ক্ষমতা বা প্রভাবের চূড়ান্ত পতনের ইঙ্গিত দেয়। বার্তাটি সহজ ও স্পষ্ট— এখন যেহেতু কোনো বিষয়েই শক্ত অবস্থান নেই, যুক্তরাষ্ট্রকে সহজেই কিনে নেয়া যায়।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

হ্যারল্ড জেমস: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক