আজ বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ঘোষিত ‘‌বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস-২০২৫’-এর প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যকর শহরের জন্য সুস্থ মাটি’। পৃথিবীতে সুস্থ মাটির গুরুত্ব তুলে ধরতে ও টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা বাড়াতেই এফএও প্রতি বছর দিবসটি পালন করে আসছে। এ উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে মৃত্তিকার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে নানা সভা, সেমিনার ও আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও অন্যান্য দেশের মতোই এই দিনের তাৎপর্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কারণ স্বল্প আয়তনের এ জনবহুল দেশে সুস্থ ও উর্বর মাটির গুরুত্ব অপরিসীম। আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষ মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

স্বাস্থ্যকর মাটি ক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। মাটিই উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়, যা আমাদের খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। মাটি পানি ফিল্টার করে পানযোগ্য করে তোলে, বন্যার ঝুঁকি কমায় ও অসংখ্য জীবের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের আবাদি জমির মাটির স্বাস্থ্য আজ হুমকির মুখে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার, জৈব পদার্থের অভাব ও অপরিকল্পিত চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্রমেই কমছে। ফলে খাদ্যের গুণগত মান ও খাদ্যোৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

মৃত্তিকাসম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ওপর সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হয়। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের প্রয়াত রাজা আদুলিয়াদেজ ভূমিবল মৃত্তিকাসম্পদের গুরুত্ব, তার ভাবনা ও আন্তরিকতা এবং এ সম্পদের প্রতি তার আবেগ দিয়ে সারা বিশ্বের মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি ১৯২৭ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩ অক্টোবর ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাই প্রয়াত রাজার সম্মানার্থে তার জন্মবার্ষিকীর দিন প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর দিবসটি পালন করা হয়।

মাটির চারটি প্রধান উপাদান হচ্ছে খনিজ, জৈব পদার্থ, পানি ও বায়ু। এর মধ্যে জৈব পদার্থ মাটির উর্বরতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি উর্বর কৃষিজমির মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমপক্ষে ৫ শতাংশ থাকা দরকার। ন্যূনতম ২ শতাংশ থাকলে সেটিকে ধরা হয় মোটামুটি মানের। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখন গড়ে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। মাটির এ জৈব দারিদ্র্য ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উত্তরাঞ্চলে খরা ও সারা দেশে অপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে থাকা ইটভাটাগুলো মাটির উপরিভাগের উর্বরতা কেড়ে নিচ্ছে।

জৈব পদার্থের প্রাকৃতিক উৎস বহু বিস্তৃত—বিভিন্ন জৈব সার, গাছের শুকনো লতা-পাতা, শাকসবজির অবশিষ্টাংশ, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ঘরোয়া জৈব বর্জ্য ও গরু-ছাগলের গোবর। একসময় গ্রামের কৃষক গবাদিপশুর গোবর বাড়ির এক পাশে গর্তে জমিয়ে রাখতেন এবং শুষ্ক মৌসুমে তা জমিতে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতেন। ফসল উৎপাদনে এ প্রাকৃতিক পদ্ধতি ছিল পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গরু-ছাগল পালনের দায়িত্ব এখন মূলত খামারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ খামারি ডেইরি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার কোনো সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে গোবর ও অন্যান্য বর্জ্য নদী, নালা, নর্দমা ও পুকুরে ফেলে দিচ্ছেন, যা কেবল পরিবেশ দূষণই করছে না, জৈব সার হিসেবে মূল্যবান সম্পদটিকেও অবহেলায় নষ্ট করছেন। দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে জৈব পদার্থের এ ঘাটতি উদ্বেগজনক। জৈব সার ব্যবহারে কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো, ডেইরি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা তৈরি এবং মাটির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। জৈব উপাদানহীন মাটি ভবিষ্যতে যেকোনো আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণে ব্যর্থ হবে, এ বাস্তবতা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বে মাটির গুণাগুণ দ্রুত কমছে। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ মাটির গুণাগুণ অবক্ষয় হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। যখন ভূমি অবক্ষয় হয়, তখন এটি খাদ্য সুরক্ষা, জলের প্রাপ্যতা ও বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সরাসরি অর্ধেক মানুষকে প্রভাবিত করে। ভূমি অবক্ষয়কে স্থলজ জীববৈচিত্র্য হ্রাসের একক বৃহত্তম কারণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনে যথেষ্ট অবদান রাখে।

টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা এবং সবার জন্য খাদ্যনিরাপত্তার একটি বড় অনুষঙ্গ হলো মাটির স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্যকর মাটি পুষ্টি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই জীবিকার জন্য অপরিহার্য। মাটির যত্ন নিতে এবং এটি রক্ষা করতে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি জরুরি। স্বাস্থ্যকর মাটি কেবল কৃষির জন্য নয়; বরং মানবজীবন, পরিবেশ ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার জন্যও অপরিহার্য।

কৃষিজ সব খাদ্যোৎপাদনের জন্য মৃত্তিকা একটি মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ। মৃত্তিকার স্বাস্থ্যের সঙ্গে পৃথিবীর সব জীবের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত। সেজন্য টেকসই কৃষিজ খাদ্যোৎপাদনের জন্য মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা একান্ত প্রয়োজন। জমির উর্বরা শক্তি সংরক্ষণে অবহেলা খাদ্যনিরাপত্তায় বড় হুমকি হতে পারে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ জরুরি। মনে রাখতে হবে, শুধু টেকসই কৃষি উৎপাদনই নয়, সমগ্র জীবমণ্ডলের অস্তিত্বও মাটির স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক মাত্রায় নির্ভরশীল। এটা ঠিক, একই জমি বারবার ব্যবহারে মাটি উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষকের খাদ্য ও আর্থিক প্রয়োজনের কারণেই তাকে উপর্যুপরি ফসল ফলাতে হচ্ছে। সমভূমিতে হোক বা পার্বত্যাঞ্চল—একই জমি বারবার চাষ করে কৃষি ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য কৃষক ও সরকারি পর্যায়ে অনুকূল নীতিকৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। কৃষকরা সংঘবদ্ধ না হলে কার্যকরভাবে নীতিকৌশল বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

টেকসই উন্নয়ন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কোনো কিছুই মাটির স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে অর্জন করা সম্ভব নয়। মাটির স্বাস্থ্য ধ্বংস হলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাড়বে এবং নগরের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাই মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের এখনই গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির উৎপাদনশীলতা এবং মাটিতে গাছের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানের মান বজায় রাখতে হবে। কারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভর করে টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার ওপর। সেজন্য মাটিকে সজীব রাখতে হবে, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে হবে।