দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দফায় দফায় কর্মসূচি দিলেও তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধানের পথ বের করতে পারেনি সরকার। সর্বশেষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রথমবারের মতো কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তাতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এরই মধ্যে ধুকতে থাকা শিক্ষা খাতের সমস্যাগুলোকে আরো প্রকট করে তুলেছে। শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের কারণে দেশজুড়ে দুই স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সমস্যা সমাধানে সরকারের কালক্ষেপণ, শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অভাব ও শিক্ষক-সরকার সম্পর্কের টানাপড়েন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের মতো কর্মসূচিতে সারা দেশে বার্ষিক পরীক্ষার সময়সূচি ভেঙে পড়েছে ও শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে এসে মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বছর শেষে বার্ষিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা। এ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের সারা বছরের পড়াশোনার মূল্যায়ন করা হয়। বর্তমান অচলাবস্থা নষ্ট হলে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়ায় ঘাটতি বেড়ে যাবে।

এ কথা সত্য যে শিক্ষকদের অনেক দাবি দীর্ঘদিনের, কিছু দাবি ন্যায্যও। বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, শূন্যপদ পূরণ ও পেশাগত মর্যাদার বিষয়ে তাদের অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। তাই চলমান সংকট সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে গুরুত্ব সহকারে সমাধানের পথে এগোতে হবে।

আবার শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন।

তবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আলোচনা। শিক্ষক ও সরকারের মধ্যে অবিলম্বে কার্যকর আলোচনা শুরু হওয়া উচিত, যাতে যৌক্তিক দাবিগুলো সমাধান হয় ও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা যথাসম্ভব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যায়। সংকট বাড়িয়ে তোলার পরিবর্তে সরকার ও শিক্ষকদের উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া।

শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার মধ্যেই চার দফা দাবিতে গত সোমবার থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। মাধ্যমিক শিক্ষকদের চারটি দাবি হলো সহকারী শিক্ষক পদকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’-এর গেজেট প্রকাশ, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দ্রুত কার্যকর করা, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ দেয়া এবং ২০১৫ সালের আগের মতো সহকারী শিক্ষকদের দুই-তিনটি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ। অন্যদিকে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে বর্তমানে সহকারী শিক্ষকদের একাংশ আপাতত ১১তম গ্রেড দেয়াসহ তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন।

প্রাথমিকের শিক্ষকরা চলতি বছর মোট তিন দফায় কর্মবিরতিতে গেছেন। প্রথম দফায় কর্মবিরতিতে যান গত ২৬ মে। প্রথম দফায় তাদের মূল দাবি ছিল সহকারী শিক্ষকদের জন্য বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেড। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে আছেন। পরবর্তী সময়ে বেতন গ্রেড দশম করাসহ তিন দফা দাবি জানিয়ে সহকারী শিক্ষকরা গত ৯-১১ নভেম্বর পর্যন্ত কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি পূরণে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসে ১১ নভেম্বর তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলেও ২৪ নভেম্বর থেকে তিন দফা দাবিতে আবারো কর্মবিরতি পালন করছেন। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার দফা ও তিন দফা দাবি নিয়ে টানা কর্মবিরতির ফলে সারা দেশে পরীক্ষার সূচি ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ দুটি স্তরের শিক্ষকদের পৃথক আন্দোলন সারা দেশের শিক্ষাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এ সংকটের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান না হলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তেই থাকবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে যে অবস্থায় গেছে, তাতে শিক্ষক ও সরকার উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে স্থবিরতা দূর করে শিক্ষাঙ্গনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকার একাধিক পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নয় সদস্যের কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ইমেরিটাস অধ্যাপক। সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নেও তার নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠিত হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগ মুহূর্তে বা পরীক্ষার মধ্যে কর্মবিরতি বা আন্দোলন হলে তা শিক্ষার্থীদের ক্ষতির মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে। করোনাকালীন শিখন ঘাটতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার বহু পুরনো সমস্যার মধ্যে শিক্ষার্থীরা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারেনি। এমন সময়ে বর্তমান অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছে। তারা পাঠে মনোযোগ হারিয়েছে, পিছিয়ে পড়েছে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। বর্তমানে কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। সমাধানের প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। অর্থাৎ সময়মতো আলোচনায় বসা, বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা ও যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়া ও শিক্ষক সমাজের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে সরকারকে। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় ঘাটতি, পদোন্নতিতে বিলম্ব, আর্থিক বৈষম্য—এসব সমস্যা সমাধান প্রয়োজন ও তাদের প্রাপ্য সম্মানও নিশ্চিত করা উচিত।

দেশের সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষায় এখন প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। পরীক্ষার সময় আন্দোলন বা দাবি আদায়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি—এ দুটোর কোনোটিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাঙ্ক্ষিত সমাধান নয়। সরকার ও শিক্ষকদের আলোচনার মাধ্যমেই দ্রুত যৌক্তিক সমাধানে আসতে হবে।