একটা দেশ যখন দীর্ঘ প্রতিকূলতার পথ পাড়ি দেয়, তখন তার অর্থনীতি ঠিক মানুষের মতো আচরণ করে। কখনো হাঁপায়, কখনো থামে, কখনো আবার সাহস সঞ্চয় করে নতুন করে এগিয়ে যায়। ২০২৫ সালের ঝড়ো সময় অতিক্রম করে বাংলাদেশ এখন এক মৃদু আলোছায়ার প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ঝড় থেমে গেছে; এটা নিশ্চিত। কিন্তু আকাশ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।

২০২৬ তাই এক প্রতীক্ষার বছর। যেখানে অগ্রগতির আলো ঝলমল করছে দিগন্তে, আবার পাশেই অন্ধকারের ছায়া ঘনিয়ে আছে। এ দুই বিপরীতের মাঝেই ২০২৬-এর মূল প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি ফিরে পাবে পুনরুদ্ধারের পূর্ণশক্তি, নাকি আবারো অনিশ্চয়তার খাঁচায় বন্দি থাকবে?

২০২৬: আলোর সম্ভাবনা

মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা; জীবনের ভার কমার আশ্বাস

২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রথম সম্ভাব্য স্বস্তি হলো মূল্যস্ফীতি শীতল হওয়ার ইঙ্গিত। ২০২৫ সালের কঠোর মুদ্রানীতি দেশের অর্থনীতিকে যেন বরফের জল ঢেলে ঠাণ্ডা করেছে। এবার সেই ঠাণ্ডা প্রভাব ধীরে ধীরে বাজার ব্যবস্থায় ছড়িয়ে যাওয়ার সময়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল ও ডলারের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং মুদ্রানীতি ধারাবাহিক হলে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশের ঘরে নামার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি শুধুই একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি সাধারণ মানুষের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জায়গা। যে মা প্রতিদিন খাবারের তালিকা ছোট করেন, যে প্রয়োজনমতো সবজিও কিনতে পারেন না; যে মধ্যবিত্ত প্রতি মাসে নিজের সঞ্চয় ভাঙেন—তাদের জন্য এ সূচকই বলে দেয়, সামনে হয়তো জীবনের দহন একটু কম হবে। মূল্যস্ফীতি কমা মানে বাজারের আগুন নিভে যাওয়া নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে ছাই হওয়া। ২০২৬ সালে সেই ছাইয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে উজ্জ্বল।

বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের শিরায় রেমিট্যান্স যেন এক নিরবচ্ছিন্ন নদী। দূর মরুভূমির তপ্ত বাতাসে কাজ করা শ্রমিকের ঘাম যখন দেশে পাঠানো টাকায় রূপ নেয়, তখন সেই টাকা শুধু পরিবারকে বাঁচায় না, পুরো দেশের অর্থনীতিকে শ্বাস নেয়ার ক্ষমতা দেয়। ২০২৬ সালের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো রেমিট্যান্সের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ অব্যাহত থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার শক্তিশালী, জাপান-কোরিয়ার মতো নতুন দেশে চাহিদা বাড়ছে, সরকারি প্রণোদনা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে।

এতে রিজার্ভে থাকবে স্বস্তির পরশ। ডলার বাজারে চাপ কমবে। গ্রামীণ অর্থনীতিও পাবে নতুন গতি। গ্রামের দোকানদার থেকে শহরের ছোট উদ্যোক্তা সবাই জানেন, রেমিট্যান্স হলো সেই সূক্ষ্ম বায়ুপ্রবাহ যা পুরো অর্থনীতিকে নীরবে টিকিয়ে রাখে।

রফতানি বাজারে নতুন অর্ডার—শিল্পের বুকে নবজোয়ারের ইঙ্গিত

২০২৬ সালের আরেকটি উজ্জ্বল দিক রফতানি খাত। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আবারো নিজের অবস্থান ফিরে পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ন্ত্রণের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে। ইউরোপে বাড়ছে কেনাকাটা। বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন ভারসাম্যে ফেরত আসছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দক্ষতা, শ্রমশক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে বিশ্ববাজারের নজরে আবারো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। পানির ওপর ভাসমান শাপলার মতো, একটু জায়গা পেলেই নতুন করে ফুল ফোটানোর ক্ষমতা আমাদের শিল্পের রয়েছে। ২০২৬ সালে সেই ফুল ফোটার সম্ভাবনা প্রখর।

২০২৬—ঝুঁকির ছায়া

কিন্তু সম্ভাবনার পাশে ছায়া না থাকলে তা বাস্তব মনে হয় না। ২০২৬ সালেও কিছু ভয়াবহ ঝুঁকি আমাদের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। এগুলো সামলানো না গেলে আলো দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে।

ক. ব্যাংক খাত—অর্থনীতির অনিশ্চিত হৃৎস্পন্দন

যে অর্থনীতি ব্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যাংক খাতের ওপর। এ বছরও ব্যাংক খাত আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। একীভূত করা হয়েছে পাঁচ দুর্বল ব্যাংককে। কাগজে এটি সুশাসনের ঘোষণা মাত্র। কিন্তু বাস্তবে এটি এক সাহসী সার্জারি; যেখানে ত্রুটি হলে রোগীই বিপন্ন।

খেলাপি ঋণের পাহাড় না কমলে, ব্যাংকের গভর্ন্যান্স যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে ব্যাংক খাত আবারো অস্থিতিশীল হবে। আর ব্যাংক দুর্বল হওয়া মানে অর্থনীতির সব সড়কই দুর্বল হয়ে পড়া। এতে বিনিয়োগ থামে, ব্যবসা দমে, প্রবৃদ্ধি কমে। ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় শঙ্কা এখানেই।

খ. এলডিসি উত্তরণের চাপ—নতুন প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্র

বাংলাদেশ শিগগিরই এলডিসি সুবিধা হারাবে। এ সুবিধা হারানো মানে শুধু শুল্ক হারানো নয়। এটি প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করা। পোশাক শিল্প যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ায়, আইটি-কৃষি-লেদার খাতে বৈচিত্র্য না আসে, জ্বালানি-শ্রম-লজিস্টিক খরচ না কমে; তাহলে রফতানি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এলডিসি উত্তরণের পথ একদিকে গর্বের, অন্যদিকে ভয়াবহ পরীক্ষার।

গ. জ্বালানি সংকট—শিল্পের অজানা রাত

গ্যাসের চাপ কমে গেলে যন্ত্র থেমে যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে একটি কারখানা শুধু অন্ধকার হয় না। বন্ধ হয়ে যায় তার অস্তিত্বের লড়াই। ২০২৬ সালে জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে শিল্পে ধস নামতে পারে। অর্থনীতির রথ তখন চাকা হারাবে।

ঘ. রাজনৈতিক স্থিতির অভাব—সব সম্ভাবনার ওপর ছায়া

অর্থনীতি আলো ভালোবাসে, রাজনীতি ভালোবাসে শান্তি। এক টুকরো অস্থিতিশীলতা, একটি সহিংস ঘটনা, একটি বিক্ষোভ বিনিয়োগকারীর মনে ভয়ের জন্ম দেয়। ২০২৬ সালে রাজনৈতিক স্থিতির অনুপস্থিতিতে অর্থনীতি ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়বে।

২০২৬-এর পুনরুদ্ধারের তিনটি স্তম্ভ

অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে তিনটি স্তম্ভকে একই সঙ্গে শক্ত করতে হবে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—উন্নয়নের প্রথম শর্ত

রাজনৈতিক স্থিরতা ছাড়া অর্থনীতি দাঁড়াতে পারে না। ব্যবসা, বাজার, ব্যাংক—সবকিছুই নির্ভর করে পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশের ওপর।

২০২৬ সালে আমাদের প্রথম কাজ হবে দেশকে এমনভাবে স্থিতিশীল রাখা, যাতে মানুষ ভবিষ্যৎকে ভয় না পায়।

ব্যাংক খাত সংস্কার—অর্থনীতির রক্ত শুদ্ধ করা

ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে হলে দরকার খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে পুনরুদ্ধার; দুর্বল ব্যাংকের পেশাদার পুনর্গঠন; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। যদি ব্যাংক খাত শক্ত না হয় কোনো প্রবৃদ্ধি স্থায়ী হবে না।

বিনিয়োগে নতুন গতি—অর্থনীতির নতুন শ্বাস

বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যেটা জরুরি তা হলো গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা; রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বাড়ানো; বিদেশী বিনিয়োগের জন্য কার্যকর প্রণোদনা এবং দেশী উদ্যোক্তার ঝুঁকি কমানো। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। কর্মসংস্থান বাড়লে আয় বাড়বে। আয় বাড়লে অর্থনীতি আবার দৌড়াতে শিখবে।

কী করলে ২০২৬ সত্যিকারের অগ্রগতি পাবে?

দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রা যেন এক নদীর স্রোত—তার পথচলায় প্রথম দরকার প্রশাসনিক সংস্কার। যেখানে অতি-আমলাতন্ত্রের শুষ্ক পাথর সরিয়ে দেয়া হবে, সহজ হবে ব্যবসার অনুমতি। কর-ট্যারিফ-লাইসেন্সের পথচলা হবে সরল ও স্বচ্ছ। সেই স্বচ্ছ পথ ধরেই অর্থনীতি খুঁজে পাবে নতুন নিশ্বাস।

জ্বালানির ভবিষ্যৎও আজ এক রূপান্তরের আহ্বান জানায়। গ্যাস ও বিদ্যুতের একমুখী নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে সূর্যের আলো, বাতাসের স্পন্দন আর ব্যাটারির সঞ্চয়ে গড়ে উঠবে স্থায়িত্বের নতুন বুনিয়াদ। শিল্প তখন আর দোদুল্যমান থাকবে না, দাঁড়াবে নিজের শক্তিতে, দূরদৃষ্টির ওপর ভর করে।

রফতানির দিগন্তেও চাই বহুবর্ণের প্রসার। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, লেদার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং; সবই যেন হয়ে ওঠে সম্ভাবনার নতুন পালতোলা নৌকা। যে নৌকায় ভর করে অর্থনীতি ভেসে যাবে আরো বহু দূর।

শহর-গ্রামের বৈষম্যও কমাতে হবে যেন নদীর দুই কূল সমান উচ্চতায় দাঁড়ায়। গ্রাম যদি হয় কর্মসংস্থানের উর্বর মাঠ, তবে শহরের ওপর চাপ কমবে, আর সমাজে ফিরে আসবে সুষম শান্তির ছন্দ।

সবশেষে মানবসম্পদই আমাদের আগামীর সূর্য। প্রযুক্তি, ভাষা, সৃজনশীলতা—এ তিন আলোর মশালে আলোকিত হবে তরুণ মন। আর তাদের হাতে ভবিষ্যৎ প্রসারিত হবে আরো দীপ্তি নিয়ে। দক্ষ মানুষই গড়ে দেবে সেই শক্তির ভিটে, যেখানে প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যা নয়; একটি জাতির স্বপ্নপথের মৃদু অথচ দৃঢ় পদচিহ্ন।

শেষ কথা: ২০২৬—পুনরুদ্ধারের বছর না অনিশ্চয়তার কুয়াশা?

বাংলাদেশ যেন আজ দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা সেতুর এক প্রান্তে—পেছনে ফেলে এসেছে ঝড়ো ২০২৫। সামনে অপেক্ষা করছে অনিশ্চয়তার নদী। ঝড় থেমেছে ঠিকই, কিন্তু সেতুর ভাঙা অংশ এখরো দাগ কেটে আছে সময়ের বুকে। ২০২৬ তাই শুধু আরেকটি বছর নয়; এটি পুনর্গঠনের, পুনর্বাসনের, নতুন করে দাঁড়িয়ে ওঠার কঠিন অথচ আশাব্যঞ্জক মুহূর্ত।

এ সেতু আবারো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হলে তিনটি ভিত্তি পূরণ হওয়া চাই—স্থিতিশীল রাজনীতি, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব গতিময় পরিবেশ। রাজনীতির স্থিরতা হবে সেই মাটির মতো, যার ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতি শ্বাস নেবে স্বাভাবিক ছন্দে। শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা হবে রক্তনালির মতো, যা শিরায় শিরায় পৌঁছে দেবে আস্থা, পুঁজি ও প্রবাহের প্রাণশক্তি। আর বিনিয়োগের গতিময়তা তৈরি করবে সেই সেতুর লোহার ফ্রেম; যেটি ধরে রাখবে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির নতুন কাঠামো।

এ তিন শর্ত পূরণ হলে ২০২৬ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের পুনর্জন্মের বছর। একটি সেতুর মতো যা ভাঙা প্রান্ত থেকে মানুষকে আবারো পৌঁছে দেবে স্বপ্নের পারে। যদি তা না হয়, তবে আমরা আরেকটি বছর ধরে ভেসে থাকব। দিক হারানো এক নৌকার মতো, যার বুকে আছে শক্তি, আছে সম্ভাবনা, কিন্তু নেই সঠিক দিশা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখনই লেখা হচ্ছে; এক অমসৃণ খাতায়। তবে কলম আমাদেরই হাতে। কোন পাতায় আলো ফুটবে, আর কোন পাতায় অন্ধকার ঘনাবে; তা নির্ধারণ করবে আজকের সিদ্ধান্ত, আজকের প্রজ্ঞা, আজকের সাহস।

আশানুর রহমান: ব্যাংকার ও লেখক