দেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সেই সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে বেকারের সংখ্যাও। বিপুল পরিমাণ বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারত বৈদেশিক শ্রমবাজার। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের অভিবাসন খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর প্রধানতম কারণ হলো সিন্ডিকেট ও দালাল শ্রেণীর দৌরাত্ম্য, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ওপর পড়ছে। এর বাইরে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার ব্যবস্থা। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ১০ লাখ ৭৬ হাজার বাংলাদেশী, যার প্রায় ৬৭ শতাংশ কর্মী ভিসায় গিয়েছেন সৌদি আরবে। এর বাইরে বাকি কর্মীদের অধিকাংশ গেছেন সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপসহ মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশে। কোনো কারণে যদি সৌদি আরবের বাজার বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেশের জনশক্তি রফতানি বড় বাধার মুখে পড়বে। জনশক্তি রফতানি এক দেশকেন্দ্রিক হওয়া কখনই উচিত নয়। জনশক্তি রফতানিতে গন্তব্য রাষ্ট্রের মধ্যে বৈচিত্র্যায়ণ আনা দরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা ছিল বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ, বন্ধ শ্রমবাজার চালু করা এবং নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান। বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সৌদি আরবকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বন্ধ অনেক শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়নি। মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজার খুলে দেয়ার ব্যাপারে অনেকেই আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এসব উদ্যোগ ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। মালয়েশিয়া থেকে এক-দেড় লাখ কর্মী নেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও চলতি বছরে সেখানে কর্মী গেছেন মাত্র কয়েক হাজার। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে। ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কার্যত সৌদি আরবকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, চলতি বছর বিভিন্ন দেশে মোট কর্মী গেছেন ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৯৭৬ (এ হিসাব ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত)। এর মধ্যে ৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৮৬ কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। এর বাইরে ১ লাখ ৪ হাজার ৬৭৮ গেছেন কাতারে। বাকি শ্রমবাজারের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ১২ হাজার ৯৩১, মালয়েশিয়ায় ৩ হাজার ৫, ওমানে ৬৪২ ও সিঙ্গাপুরে ৬৭ হাজার ৬৯০ জন। বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক দশক আগেও বিদেশে বাংলাদেশীদের বড় শ্রমবাজার ছিল অন্তত ১২টি। এখন তা দু-তিনটি দেশে নেমে এসেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ছাড়া আরো যে পাঁচ দেশ শীর্ষ শ্রমবাজারের তালিকায় আছে তার মধ্যে বর্তমানে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, কাতার ও মালদ্বীপের বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন না।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদামতো দক্ষ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১০৪ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান উপযোগী ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পৌনে ১২ লাখের বেশি কর্মীকে। যদিও বিবিএসের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩-এর তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী। অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিদেশ পাড়ি জমানোর আগে কর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশই দক্ষতা অর্জন করেন বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জনশক্তি রফতানিতে সম্ভাবনাময় গন্তব্যের নাম জাপান। সামনের ১৫ বছরে দেশটিতে এক কোটির বেশি কর্মী প্রয়োজন। কৃষিকাজ, নির্মাণ খাত, কেয়ার গিভার, অটোমোবাইল, শিপিংসহ ১৬ ক্যাটাগরিতে জাপানে জনশক্তি রফতানির সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ উল্লেখ করার মতো কর্মী পাঠাতে পারছে না। অন্যদিকে নেপাল, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যাচ্ছে দেশটিতে। ভাষা না জানা ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমের চাহিদা কমে গিয়ে বাড়ছে কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও পেশাভিত্তিক দক্ষ শ্রমিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মী এখনো বিদেশে যাচ্ছেন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে। ফলে তারা কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নানা ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছেন। শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ব্যর্থতার মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারা। আধুনিক শ্রমবাজারে শুধু শারীরিক শ্রম নয়, বরং কারিগরি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও পেশাগত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় সেই প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। ফলে বাংলাদেশী কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি অতীতে অবৈধভাবে বিদেশে প্রবেশ, ভুয়া কাগজ ব্যবহারসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং মানবেতর জীবনযাপনের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যার প্রভাব এখনো শ্রমবাজারে পড়ছে।

ক্রমেই অবৈধ অভিবাসন বাড়ছে। সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এ যাত্রায় প্রাণহানির আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি ইউরোপের দেশগুলোর কঠোর নীতির কারণে ভবিষ্যতে বৈধ শ্রমবাজার তৈরির সম্ভাবনাও আরো ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষতা ও পরিকল্পনার অভাবে এ অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বৈধ পথে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করতে হলে এ খাতের সিন্ডিকেট ভাঙার পাশাপাশি দালালদের দৌরাত্ম্য দূর করতে হবে। বিদেশগামী শ্রমিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। সুতরাং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিং কেন্দ্রগুলোর পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা উচিত। বিদেশী ভাষা, কম্পিউটার, কেয়ার গিভার, যন্ত্রচালনা বা অপারেটিং স্কিল, নির্মাণ, ড্রাইভিংয়ে দক্ষতা অর্জনে জোর দিতে হবে। দক্ষ কর্মী তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায় সৌদি আরবনির্ভর এ একমুখী শ্রমবাজার ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই জনশক্তি রফতানিতে গন্তব্য ও শ্রমিকের ধরনে বৈচিত্র্যায়ণ আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।