এটি স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নে সহায়ক হবে। নাগরিকের চিকিৎসা-ইতিহাস, বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন, রেফারেল তথ্য এবং হাসপাতালভিত্তিক সেবা যদি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা যায়, তবে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার গতি বাড়বে। তবে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা করলে সরকারের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘিরে প্রশ্ন থেকে যায়।

মাঠ পর্যায়ে নতুন যেকোনো প্রকল্প, এমনকি পাইলট প্রকল্প হলেও সেটি নেয়ার আগে কিছু পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হয়। তা না হলে প্রকল্পের কোনো উপযোগিতা থাকে না। এর সুফল জনগণ পায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এমন বহু প্রকল্পের নজির দেশে রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বিগত সরকারের সময়ে সরকারি সেবা পেতে দালাল চক্র, হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার মতো পুরনো সমস্যার ইতি টানতে ‘এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবা’ নামক উদ্যোগের কথা বলা যায়। এর লক্ষ্য ছিল পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, অনলাইন জিডি, ভূমিসেবাসহ ৪৫০টির বেশি সেবা যেন জনগণ এক স্থান থেকেই পেতে পারে। প্রাথমিকভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ঢাকার ছয় এলাকায় ওই কেন্দ্র চালু করা হয়। উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও বাস্তবে এর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে প্রয়োজনীয় সমন্বিত প্রযুক্তিগত কাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ইত্যাদির অভাবে। এটা একটা উদাহরণ মাত্র।

অতীতে স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটালসেবাভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার অধিকাংশই কার্যকর করা যায়নি। টেলিমেডিসিন সেবার কথাই বলা যায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও এ সেবার পরিসর সেভাবে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই কাঠামোগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার সমস্যায় জর্জরিত। অর্থায়নের স্বল্পতা থেকে শুরু করে চিকিৎসক-নার্স ও টেকনোলজিস্ট সংকট, সেবার মানে বৈষম্য, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, এমনকি অনেক নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও এখনো মৌলিক সেবা কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। আর ডিজিটাল অবকাঠামো বা এর ব্যবহার হয় যৎসামান্যই। অনেক হাসপাতালে রোগীর নথি এখনো কাগজভিত্তিক। কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত, কোথাও ইন্টারনেট দুর্বল, কোথাও কম্পিউটার থাকলেও ব্যবহারযোগ্য নয়। আবার অধিকাংশ স্বাস্থ্যকর্মী এখনো ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত নন। এ বাস্তবতায় ই-হেলথ কার্ড চালু করা হলে তা কার্যকর সেবা ব্যবস্থার বদলে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই মাঠ পর্যায়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সরকারের উচিত আরো গভীর পর্যালোচনা করা।

ই-হেলথ কার্ড চালুর আগে প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রযুক্তি অবকাঠামো। কার্ড বিতরণ তুলনামূলক সহজ, কিন্তু এটাকে কার্যকর করতে হলে যেসব পূর্বশর্তের পরিপালন আবশ্যক, সেগুলো নিশ্চিত করাই বিচক্ষণ হবে। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বলা হয়েছে যে কার্ড চালু প্রকল্পের প্রথম ধাপ হিসেবে পাঁচটি জেলায় সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখায় যে কেবল এটিকে কার্যকর করতে হলে এর বাইরেও অনেক প্রয়োজনীয় কাজ রয়েছে, যা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবার আগে দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা। প্রতিটি জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ডিজিটাল ডিভাইস, নির্ভরযোগ্য সার্ভার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নিরাপদ নেটওয়ার্ক থাকতে হবে। যে হাসপাতালে এখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ইন্টারনেট সমস্যা বা কম্পিউটার সংকট রয়েছে, সেখানে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করা কঠিন।

এছাড়া ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে হলে অবশ্যই প্রশিক্ষত জনবল লাগবে। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, রেকর্ডকিপার ও প্রশাসনিক কর্মীদের ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহারে প্রশিক্ষিত করতে হবে। হাসপাতালভিত্তিক আইটি সাপোর্ট টিম ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না। যেখানে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জনবল সংকট, সেখানে নতুন প্রযুক্তি চালু করার আগে প্রয়োজনীয় জনশক্তি নিশ্চিত করা একটা বড় পূর্বশর্ত।

এছাড়া প্রয়োজন সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য তথ্য ব্যক্তিগত তথ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি। একজন নাগরিকের রোগের ইতিহাস, মানসিক স্বাস্থ্য, পরীক্ষার ফলাফল বা চিকিৎসা নথি অননুমোদিতভাবে ফাঁস হলে তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কে তথ্য দেখবে, কীভাবে অনুমতি দেবে, কোথায় তথ্য সংরক্ষণ হবে, ফাঁস হলে দায় কার—এসব বিষয়ে শক্তিশালী আইন ও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে বিশ্বে অন্যতম সফল দেশ হলো এস্তোনিয়া। জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়পত্রের সঙ্গে স্বাস্থ্য রেকর্ড সংযুক্ত। রোগী নিজেই দেখতে পারেন কে তার তথ্য ব্যবহার করেছে। শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ও আইনি কাঠামো তাদের সাফল্যের মূল কারণ। পাশের দেশ ‘ভারত আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন’-এর অধীনে ধাপে ধাপে ডিজিটাল হেলথ আইডি চালু করছে। স্বেচ্ছাভিত্তিক নিবন্ধন, পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার কৌশল নিয়েছে।

বাংলাদেশেও এক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে এগোতে পারে। প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কাঠামো তৈরির পর মাঠ পর্যায়ে কার্ড চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। এরপর ক্রমেই জাতীয় পর্যায়ে এটির বিস্তার হতে পারে।

ই-হেলথ কার্ডের ধারণা নিঃসন্দেহে আধুনিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্য খাতে আগে থেকে বিদ্যমান গভীর সংকটগুলো অমীমাংসিত রেখে এটিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প বানানো হলে তা নীতিগত প্রশ্ন তোলে। ডিজিটাল রূপান্তর দরকার, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক পরিস্থিতির মানোন্নয়ন ছাড়া সে রূপান্তর অমূলক হয়ে থাকবে।