জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদ এক সময় শেষ হয়ে আসবে তা সর্বজনবিদিত। এর পরও দেশের জ্বালানি নীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ ও এর ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। জ্বালানি খাত হয়ে উঠেছে জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর। এ খাতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগের সিংহভাগই ব্যবহার করা হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণে। ফলে এ জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। আর গ্যাসের ওপর অতি নির্ভরতার কারণে এরই মধ্যে এ প্রাথমিক জ্বালানির মজুদ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানি করা হয়েছে এলএনজি। এতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েছে, তেমনি বেড়েছে ঋণের বোঝাও। পাশাপাশি দেশ তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের নামও। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলংকার কথাই বলা যায়। দেশটি ২০২২-২৩ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে পড়ে। তীব্র জ্বালানি ঘাটতি, ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা ও বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এসব সংকট উত্তরণে দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে ধাপ বাড়ায়। বর্তমানে শ্রীলংকার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যা মূলত জলবিদ্যুৎ। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৭০ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তি সংযোজনের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভোল্টেজ ওঠানামা কমানো ও সাপ্লাই স্থিতিশীল করা। শ্রীলংকার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপের মতো তুলনামূলক ছোট আকারের অর্থনীতির দেশগুলো জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানো, প্রাকৃতিক ও অনিশ্চিত জ্বালানি উৎসের বিকল্প খোঁজা, স্থানীয় অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্য হারে নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে।

দুঃখজনকভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ অর্থনীতির বহুমুখী সংকটে থেকেও বাংলাদেশ এখনো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। যদিও পুরো বিশ্ব টেকসই জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমাধান হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশকেও জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদনে মনোনিবেশ করা ছাড়া উপায় নেই। এজন্য জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ কাঠামোয় পরিবর্তন বিশেষ দরকার।

দেশের জ্বালানি খাতে উন্নয়নের নামে যে বিনিয়োগ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে, তা টেকসই নয়। বরং অর্থনীতি পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে বলে বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলন ২০২৫ এ বক্তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে এ সম্মেলনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে তা বেশি উদ্বেগজনক।

এডিবির বাংলাদেশ বিষয়ক জ্বালানি বিনিয়োগের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে গ্যাসভিত্তিক অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ফলে একদিকে দেশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতায় আটকে থাকছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত কার্যত উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুতে সীমিত অর্থায়ন এবং বায়ুবিদ্যুতে শূন্য বিনিয়োগ এ বাস্তবতারই প্রতিফলন।

এ বিনিয়োগ কাঠামো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে এনেছে। উচ্চ সুদের ওসিআর ঋণের আওতায় গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলেও সেগুলো বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে অচল। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও এসব কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ জ্বালানি খাত সরাসরি আর্থিক সংকটে রূপ নিয়েছে। আবার পরিবেশগত ক্ষতিও হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা নীতিগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অনীহার কারণে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। রুফটপ সোলারের মতো উদ্যোগ কাগজে-কলমে থাকলেও কার্যত বিদ্যুৎ উৎপাদনে অবদান নগণ্য। সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে আর্থিক প্রণোদনা, শুল্কছাড় ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা ইত্যাদি সুবিধা প্রয়োজনমাফিক পাচ্ছেন না নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তারা।

এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবতে হবে জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল নিয়ে। বহুজাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের দেয়া অর্থ কোন খাতে এবং কেন ব্যবহার করা জরুরি তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। জীবাশ্ম জ্বালানি ও ঋণনির্ভর উন্নয়নের পথ থেকে সরে এসে অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি খাতের নীতি নিতে হবে।

জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আহরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। জানা গেছে, বিশেষ আইনের অধীনে বিগত সরকারের অনেকগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) বাতিল হয়েছে। যদিও তার কারণ জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়নি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের নীতিগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও এক্ষেত্রে জরুরি। সবচেয়ে জরুরি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, যাতে খাতটিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা যায়।

চার ধাপে ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হলেও এর মধ্যে ২২টিতে দরপত্র পড়েছে একটি করে। আর ১৩টিতে কোনো দরপত্র পড়েনি বলে সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, গড়ে প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে দর পড়েছে ১ দশমিক ৪টি। অর্থাৎ দরপত্র প্রতিযোগিতামূলক হয়নি। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং দরপত্রে অংশ নেয়ার শর্তাবলি কঠিন হওয়ায় অনেক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়নি বলে তাদের গবেষণা জরিপে উঠে এসেছে। এগুলো সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) দ্রুত সংশোধন করে তাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশীদারত্ব বাড়ানোর কথাও বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। টেকসই জ্বালানি খাতের জন্য এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেই ধারণা। এর বাইরে স্বল্পমেয়াদি হিসেবে কেন এখনো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিদ্যমান অবকাঠামোগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না তার কারণ অসুন্ধান করতে হবে এবং সমাধানের দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি শহরের আবাসিক ভবন, সরকারি অফিস, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বহুতল ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন কার্যক্রমকে গতিশীল করা উচিত।