এ জলজ বাস্তুসংস্থানগুলো শুধু কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য সম্পদের উৎস নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন-জীবিকারও ভিত্তি। জলজ বাস্তুসংস্থান দেশের কৃষি অর্থনীতি, মৎস্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু গত কয়েক দশকে এ প্রাণশক্তি অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্যের কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে এবং হচ্ছে। জাতিসংঘ পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি (ইউনেপ) কর্তৃক ঘোষিত ইউএন ডেকেড অন ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন (২০২১-৩০) বিশ্বব্যাপী পরিবেশের বাস্তুসংস্থান পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এ আহ্বানকে গুরুত্ব দেয়া অনেক জরুরি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জলজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রথম বড় আকারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। ১৯৭৭-৮০ সালে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে খাদ্যের বিনিময়ে কাজ (ফুড ফর ওয়ার্ক) প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের খাল খননে সংযুক্ত করেন। অন্যদের উৎসাহ দিতে তিনি নিজেও খাল খননে নেমে পড়েন। এ উদ্যোগ নেয়ায় গ্রামীণ অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে ও কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়। খাল ও বিলগুলোতে পানির প্রবাহ পুনঃস্থাপিত হওয়ায় মৎস্য সম্পদের সমৃদ্ধি ঘটে। মাছ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ মানুষের আমিষের চাহিদাও প্রাকৃতিকভাবে পূরণ হয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন গতি পায়। এ কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা আজও প্রাসঙ্গিক। এ কর্মসূচির ফলাফল ছিল বহুমাত্রিক। কৃষি উৎপাদন বাড়ায় খাদ্যের ঘাটতিই শুধু পূরণ হয় এমন না। গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়তে শুরু করে। বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে মানুষ নতুনভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পায়। মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য গ্রামীণ খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনে, যার ফলে মানুষ সহজে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে সক্ষম হয়। খাল খননের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং খরা মোকাবেলায় সেচের সুযোগ বাড়ে। এভাবে এ কর্মসূচি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, গত প্রায় তিন দশক ধরে জলজ বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার নিয়ে সরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। ফলে নদী ও খালের সংখ্যা কমেছে। অনেক হাওর ও বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলজ বাস্তুতন্ত্র শুকিয়ে গিয়েছে এবং অপরিকল্পিতভাবে নিচু জলাশয়/জমিগুলো ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন আয়তনের জলাশয়ে নিক্ষেপ করায় পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশে এখনো কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করা হয়নি। আবার তৈরি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপনের হার ৮০-৯০ শতাংশ হলেও অভিযোগ রয়েছে, পরিচালন ব্যয় কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান রাতে বা পরিদর্শনের বাইরে ইটিপি বন্ধ রাখেন। এভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়গুলোর পানি ক্রমে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। ফলে গ্রামীণ মৎস্যভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষের পথে। দেশী প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই আহরণ করা যেত। মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের আয় কমছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষদের আমিষের চাহিদা পূরণ হওয়া ব্যাহত হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার আবারো জলজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা; নদী, খাল-বিল, হাওর ও বাঁওড় ইত্যাদি জলাশয় দূষণ প্রতিরোধ এবং খাল-নদী খনন/পুনঃখননের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। চলতি বছর সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী ও হাজার হাজার খাল পুনরুদ্ধার, সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবেলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এরই মধ্যে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃষিকাজে সেচ সহজীকরণ এমনকি মাছ চাষেও ব্যাপক অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত নয়। খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, জীবিকার সংস্থান এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার প্রসঙ্গও জড়িত।

বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বেই ভালো কিছু উদ্যোগ রয়েছে। মরুপ্রবণতা রুখে দিতে আফ্রিকার গ্রেট গ্রিন ওয়াল প্রকল্প রয়েছে। লাতিন আমেরিকায় বন পুনরুদ্ধার কর্মসূচি রয়েছে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর রিভার রেস্টোরেশনের রিস্টোর প্রজেক্টের মাধ্যমে নদী পুনরুদ্ধার ও টেকসই ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। বন পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দ্য বন চ্যালেঞ্জে ৬০টিরও বেশি দেশ অংশ নিয়েছে। এ দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত ও নেপালও আছে। এ চ্যালেঞ্জের লক্ষ্য ২০৩০ সাল নাগাদ ৩৫০ মিলিয়ন হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি পুনরুদ্ধার করা। আফ্রিকার রিগ্রিনিং আফ্রিকা প্রকল্প স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কৃষি ও বনভূমি পুনরুজ্জীবিত করছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়ক। সমুদ্রভিত্তিক ইকোসিস্টেমে ইন্টারন্যাশনাল কোরাল রিফ ইনিশিয়েটিভ প্রবালপ্রাচীর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে কাজ করছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় অর্থনীতি ও ব্লু ইকোনমির সম্প্রসারণের জন্য অপরিহার্য। একইভাবে, গ্লোবাল পিটল্যান্ড ইনিশিয়েটিভ বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন সংরক্ষণাগার পিটল্যান্ড রক্ষায় কাজ করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় দ্য ইন্টারন্যাশনাল ‘‌ফোর পার থাউজ্যান্ড’ ইনিশিয়েটিভ মাটিতে জৈব কার্বন বৃদ্ধির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অবদান রাখছে। ‍সবই ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা।

ওই বৈশ্বিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খাল খনন কর্মসূচি অনেকাংশে একাত্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদী ও খাল খনন/পুনঃখনন কর্মসূচিও একইভাবে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বহুমাত্রিক সুফল বয়ে আনবে। এভাবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করেছে। আগামী এক দশকে এ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এর সুফল জনগণ পেতে শুরু করবে। কারণ জলাশয় ব্যবস্থাপনা ভালো হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, মৎস্য সম্পদ পুনরুদ্ধার হবে, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে ও গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। এর প্রভাবেই জাতীয় অর্থনীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজিস) সঙ্গে বাংলাদেশের এ উদ্যোগটি সরাসরি সম্পর্কিত। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা (এসডিজি টু), নদী ও জলাশয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ (এসডিজি সিক্স), জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা (এসডিজি থার্টিন), জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (এসডিজি ১৪ ও ১৫), কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (এসডিজি এইট) সবকিছুই এ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

দেশের বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, বরং এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মমর্যাদার সঙ্গে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি আমাদের অতীত সাফল্যের দৃষ্টান্ত। সরকারের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে আগামী দশকে বাংলাদেশ জলজ বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের (অ্যাকুয়াটিক ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন) বৈশ্বিক আন্দোলনে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবে।

ড. একেএম রাশিদুল আলম: সভাপতি, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়