পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের দিন আজ, ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের। বিজয় লাভ করেন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। বিজয়ের দিনে বিনম্র শ্রদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আত্মত্যাগকারী সর্বস্তরের জনগণের প্রতি। প্রতি বছর দেশব্যাপী মহাসমারোহে বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। কিন্তু দিনটি কেবল উদযাপনের নয়, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার স্মরণ ও আত্মমূল্যায়নেরও। এর ধারাবাহিকতায় আজও স্বাধীনতা উত্তর ৫৪ বছর ফিরে দেখা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ ছিল না। লক্ষ্য ছিল বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে বিনির্মাণ করা। দুঃখজনকভাবে এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত অর্জন করা যায়নি। বরং গত ৫৪ বছরে জনগণকে দেশের সর্বস্তরের জেঁকে বসা বৈষম্য, অসম অর্থনৈতিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে হয়েছে। একের পর এক সংঘটিত হয়েছে আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান। গণজাগরণের প্রেক্ষাপটে স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটেছে। কিন্তু তার পরও গণতান্ত্রিক উত্তরণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।

এ দেশে বারবার গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়টি একটা দিককে স্পষ্ট করে যে এখানে রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটিকে ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু চর্চা করা হয় না। বিভাজন ও সহিংসতার রাজনীতি আজও প্রবল এ দেশে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়েছে। দলীয় মতবাদ, পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থে জনগণের সেবক হয়ে উঠতে পারেনি। সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না পাওয়া রাষ্ট্রের কোনো স্তরে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে সর্বত্র দুর্নীতি ও অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট হয়েছে। এতে জনগণের নানা মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। নানামুখী অপরাধও বেড়েছে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক অপরাধের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অর্থনীতিতে অবাধ লুটতরাজ ঘটেছে। অর্থনীতির কাঠামো হয়ে উঠেছে অলিগার্ক মডেলের। উন্নয়ন হয়েছে অবকাঠামোভিত্তিক। প্রবৃদ্ধি ঘটেছে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। জনগণ প্রকৃত সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নাগরিক স্বাধীনতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে খর্ব হয়েছে। আর এসবই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং উন্নত অর্থনীতি বিকাশের প্রধান অন্তরায়। আর এসব প্রতিবন্ধকতা ১৯৭১ সালের বিজয় অর্জনের সুদীর্ঘ বছর পরও সমাজ ও রাষ্ট্রে রয়ে গেছে।

গত বছরও একটি গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হয়েছে দেশ, যার লক্ষ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। পাশাপাশি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সুগম করা। কিন্তু সেই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিকে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রবল হয়েছে দেশে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংস্কারের গতিও শ্লথ। যদিও এক্ষেত্রে কিছুটা ‍স্থিতিশীলতা রয়েছে। তবে নানা কারণে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়নি। ফলে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। এগুলোর কোনো কিছুই কাম্য নয়। বিজয় দিবসে তাই অঙ্গীকার হোক ঘুরে দাঁড়ানোর। সেটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই হতে হবে। সমতাভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন উন্নত অর্থনীতি।

সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের শুরুটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে। এজন্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি। নির্বাচনের পরিবেশ যেন কেউ অস্থিতিশীল করতে না পারে তা অন্তর্বর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতা অতীতে দেখা গেছে। গুম-খুনের রাজনীতি হতে দেখা গেছে। সেগুলো পুনরায় হোক তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দিন একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। সরকারকে তাই বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়। মনে রাখা প্রয়োজন, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি। আর এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামীর নির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

নির্বাচন বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাইরে বর্তমানে দেশের জন্য উদ্বেগজনক বিষয় হলো অর্থনীতির বহুমুখী সংকট কাটিয়ে ওঠা। বিগত সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাভোগী হয়েছে মুষ্টিমেয় ধনকুবের। এর সুবিধার ন্যায্য ও সুষম বণ্টন হয়নি। টানাপড়েনের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক কষ্টে দিন যাপন করছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই এ বিজয়ের দিনে অঙ্গীকার হোক বৈষম্য দূর ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার। নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। সেই প্রেক্ষাপটে আগামী সরকারকে এ বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। আর দায়িত্ব হস্তান্তরের শেষ সময় পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে তাদের দায়িত্ব গ্রহণের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থনীতির নিরাময়।

তবে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অংশীজন কেবল সরকার নয়, জনগণও। জনগণকেও এ লক্ষ্যে সোচ্চার থাকতে হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করেছেন, সেই শিক্ষা বর্তমানে কাজে লাগানো প্রয়োজন। পুরো জাতি যদি অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তবে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিভাজনের রাজনীতি নয়, পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা করলে ঐক্যবদ্ধ থাকা সম্ভব। পাকিস্তানি শাসনামলের সব অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটেছিল অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জাতির একাগ্রতা থেকে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাজনীতি, অর্থনীতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তবেই সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে।

বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি, দীর্ঘ সময়। যে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লাখ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একাত্তরে, তা পূরণের পথে আজও সেভাবে অগ্রসর হতে না পারাটা বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে একাত্তরের মতোই দেশবাসীকে সোচ্চার ও সজাগ থাকতে হবে।