কিন্তু সড়কে বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা ও মৃত্যুই ঢাকার সড়কের নিত্য চিত্র হয়ে উঠেছে। দক্ষ ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখানে সেভাবে দেখা যায় না। সড়কের অবস্থা হয়ে উঠেছে নাগরিক দুর্ভোগের প্রতিদিনের প্রতিচ্ছবি। সকাল থেকে গভীর রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক, সংযোগ সড়ক, এমনকি অলিগলির রাস্তাতেও থাকে তীব্র যানজট। এভাবেই ঢাকায় যাত্রা হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর, জনগণের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, জ্বালানি অপচয় হয়, জরুরি সেবা ব্যাহত হয়, যাত্রীরা এক ধরনের মানসিক চাপে থাকেন। সব মিলিয়ে ঢাকার সড়ক একপ্রকার আতঙ্কের নামান্তর হয়ে গেছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতির পেছনে মূলত অসমন্বয়ের বড় দায় রয়েছে। যদিও ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। কিন্তু সংস্থাটির পেশাদারত্ব, দায়িত্বশীলতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) অনুযায়ী সব প্রকল্পের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করার কথা। যদিও বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাস্তবে সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর ওপর ডিটিসিএর কোনো প্রশাসনিক বা আইনি কর্তৃত্ব নেই। এটি কেবল একটি পরামর্শক সংস্থা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। ঢাকার সড়ক অবকাঠামো ঘিরে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় সেখানে ডিটিসিএর কোনো কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা থাকে না। এমনকি কোনো সংস্থা ডিটিসিএর নির্দেশ না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কোনো ক্ষমতাও নেই সংস্থাটির।

এমন পরিস্থিতিতে এটা সহজেই অনুমেয় যে ডিটিসিএকে যদি পেশাদার ও প্রয়োজনমাফিক কর্তৃত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা না যায় তাহলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অসমন্বয় থেকেই যাবে, ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসবে না।

রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে একাধিক সরকারি সংস্থার নাম পাওয়া যায়। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করে সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, রাজউক, সেতু বিভাগসহ নানা প্রতিষ্ঠান। যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস দেয় বিআরটিএ। আবার ওয়াসা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সংস্থাগুলো প্রয়োজনমতো রাস্তা খনন করে। এসব সংস্থার কাজে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে কোনো নিয়ম-নীতির সুফল নগরবাসীর কাছে পৌঁছায় না। এক সংস্থা সড়ক বানায়, অন্য সংস্থা কিছুদিন পর তা পুনরায় কোনো কাজে খনন করে। এক সংস্থা নতুন যানবাহনের অনুমোদন দেয়, কিন্তু অনুমোদনের আগে সড়কের ধারণক্ষমতা বিচারের দায়িত্বে থাকা সংস্থার সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় হয় না। ফলে অবকাঠামোর পরিসর বাড়ে কিন্তু বাই প্রডাক্ট হিসেবে যাতায়াত মসৃণ না হয়ে ভোগান্তির হয়ে ওঠে। ক্রমেই এসব সমস্য আরো প্রকট হচ্ছে। তাদের কাজকর্ম সামঞ্জস্য আনতে হলে এমন কোনো সংস্থার প্রয়োজন যে সবগুলো কাজে নিয়মিত তদারকি করবে এবং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রতি সরকার ডিটিসিএকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে আনার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। কেননা অধস্তন অবস্থানে থাকা কোনো সমন্বয়কারী সংস্থা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর নির্দেশ দিতে পারে না। উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক অবস্থান ডিটিসিএকে নীতিগত কর্তৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তঃসংস্থা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে এ বিবেচনায় সরকার ওই পরিকল্পনা করছে। এ চিন্তা ইতিবাচক। কিন্তু এটি ফলপ্রসূ তখনই হবে যখন ডিটিসিএ একটি মানসম্মত ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কোন প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর এটি থাকবে সেটি নিশ্চিত করলেই বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে না।

এক্ষেত্রে প্রয়োজন স্পষ্ট আইনগত ক্ষমতা, বাধ্যতামূলক সমন্বয় কাঠামো এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। কোনো পরিবহন প্রকল্প নেয়ার আগে একক নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে। অনুমোদনহীন বা মাস্টারপ্ল্যানবহির্ভূত প্রকল্প বন্ধ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সব সংস্থার প্রকল্প ডেটাবেজ, সময়সূচি ও খনন পরিকল্পনা এক প্লাটফর্মে আনতে হবে। এজন্য ডিটিসিএতে দক্ষ মানবসম্পদও নিয়োজন করা আবশ্যক। এখানে দলীয় বিবেচনায় কাউকে নিয়োগ দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার সুযোগও অপরিহার্য।

গত দেড় দশকে ঢাকায় ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, সড়ক সম্প্রসারণসহ নানা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তবু যানজটের টেকসই সমাধান হয়নি। কারণ ঢাকার সড়কের বেহাল দশার মূল কারণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। ফলে অবকাঠামো বাড়িয়েও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। বরং যখন যে সড়কে উন্নয়ন কাজ চলেছে তার ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে আশপাশের সড়কে যাতায়াত করা যাত্রীদের। অন্যান্য সড়কে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বেড়ে গেছে। এগুলো ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, পরিকল্পনায় অসামঞ্জস্যতা ও কর্মকাণ্ডে সমন্বয়হীনতার ফল।

ঢাকার সড়কের আরেকটি বাস্তব চিত্র হলো বিশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা। একই রুটে অসংখ্য বাস, যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, অনিয়ন্ত্রিত স্টপেজ, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিংয়ের ফলে যত্রতত্র যানজট বাধে। আবার বিভিন্ন গতির যানবাহনের একই সড়কে চলাচল, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও সড়কে যানের গতি প্রতি কিলোমিটারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। আবার গণপরিবহনের বেহাল পরিস্থিতির কারণে রিকশা, বাইক রাইডসহ সড়কে ব্যক্তিগত যানের সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নগরজুড়েই বিদ্যমান।

এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রাজধানীর সড়ককে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে হলে কিছু বাস্তব সমাধানের পথেও হাঁটতে হবে। বাস রুট রেশনালাইজেশন দ্রুত বাস্তবায়ন, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবার সফল বাস্তবায়ন, নির্ধারিত স্টপেজ ইত্যাদি। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ির অনুমোদনের ক্ষেত্রে সড়কের বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। এছাড়া পার্কিং নীতিমালার প্রয়োগ থাকতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও বর্তমানে অপরিহার্য। সড়কের সক্ষমতা ও যানবাহনের আধিক্য বিবেচনায় আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, ক্যামেরাভিত্তিক আইন প্রয়োগ, রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ডেটা, সমন্বিত কমান্ড সেন্টার এবং স্মার্ট মোবিলিটি পরিকল্পনা ছাড়া ঢাকার সড়কে গতি ফিরবে না।

ঢাকার যানজট বহুমাত্রিক সমস্যা থেকে সৃষ্ট। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত উপায়ে। সরকার সেদিকে মনোযোগ দেবে এটাই প্রত্যাশিত।