কৃষিই দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। নেপালের সোপানভূমি থেকে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ ধানখেত পর্যন্ত কৃষিই গড়ে তুলেছে মানুষের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনধারা। তবে বর্তমানে কৃষি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘন ঘন জলবায়ু বিপর্যয় আমাদের প্রচলিত কৃষিকে টেকসই রাখাতে অসুবিধায় পড়ছে। প্রায় ২০০ কোটি মানুষের এ অঞ্চলে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—কৃষি কি অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই পথ বেছে নেবে। টেকসই পথে যেতে হলে প্রয়োজন পরিবেশসম্মত কৃষি ব্যবস্থাপনা বা পরিবেশবিজ্ঞান ও স্থানীয় জ্ঞানকে বিবেচনায় নিয়ে কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানুষ ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে রক্ষা করবে।

পরিবেশসম্মত কৃষি শুধু কৃষি কৌশল নয়, বরং এটি এমন এক দর্শন, যা কৃষিকে প্রকৃতির সঙ্গে পুনঃসংযোগ ঘটায়। এতে জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, পুষ্টি পুনর্ব্যবহার হয়, পানি সাশ্রয় হয় এবং ফসল, গাছপালা, পশুপালন ও মৎস্যকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থায়িত্ব অর্জন হয়। জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার মতে, পরিবেশসম্মত কৃষি একদিকে বৈজ্ঞানিক শাখা, অন্যদিকে একটি সামাজিক আন্দোলন যা কৃষকদের প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধ নয়, বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪৩ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত অথচ জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে অবদান মাত্র ১৬ শতাংশ, সেখানে পরিবেশসম্মত কৃষিতে রূপান্তর কোনো বিলাসিতা নয়। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বাস এ অঞ্চল ভূমির পরিমাণে মাত্র ৩ শতাংশ। তার ওপর এটি বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তান এরই মধ্যে বন্যা, খরা, দাবদাহসহ নানা জলবায়ু বিপর্যয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।

এ শঙ্কা উপলব্ধি করে সার্ক কৃষি কেন্দ্র ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করে ‘দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ব্যবস্থার টেকসই রূপান্তরে পরিবেশসম্মত কৃষির ভূমিকা’ শীর্ষক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও সমাজ সংগঠনের নেতারা একমত হন কৃষিকে রাসায়নিক ও উপকরণনির্ভরতা থেকে ক্রমান্বয়ে এবং টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। পরিবেশসম্মত কৃষি সরাসরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুধামুক্তি, জলবায়ু মোকাবেলা, লিঙ্গসমতা ও পরিবেশ সংরক্ষণে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশসম্মত পন্থা গ্রহণকারী ক্ষুদ্র কৃষকের আয় ২০-৫০ শতাংশ বাড়তে পারে। পাশাপাশি ব্যয় কমে আসে যা দারিদ্র‍্য হ্রাস ও কৃষকের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে পরিবেশসম্মত কৃষির সাফল্যের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। ভুটান শতভাগ জৈব কৃষির লক্ষ্যে এগোচ্ছে। নেপাল স্থানীয় জাত সংরক্ষণে কমিউনিটি বীজভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক কৃষি কর্মসূচি চালু হয়েছে। শ্রীলংকার বসতবাড়ির বাগান ও মালদ্বীপের উপকূলীয় কৃষি মডেল স্থানীয় বাস্তবতায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশও পরিবেশসম্মত কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় এখন পরিবেশসম্মত টেকসই কৃষি গড়ে তোলা জরুরি। দেশের ৩০টি ভিন্ন পরিবেশ অঞ্চল রয়েছে, যার বেশির ভাগই নাজুক পরিবেশে অবস্থিত। আশার কথা হলো, পরিবেশসম্মত কৃষি স্থানীয় পর্যায়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও পিরোজপুরে শতবর্ষী ভাসমান কৃষি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দক্ষিণাঞ্চলের ফসল-মাছ-পশুপালনের সমন্বিত ও ঘেরে মাছ-ধান-সবজি চাষ পদ্ধতি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ধান চাষে পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতি প্রয়োগে ৩০ শতাংশ পানি কম ব্যবহার হচ্ছে এবং মিথেন গ্যাস নিঃসরণ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবেশসম্মত কৃষিকে জনপ্রিয় করতে কাজ করছে। উবিনীগ তাদের ‘নয়াকৃষি আন্দোলন’ দিয়ে বীজ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র‍্যভিত্তিক কৃষিকে এগিয়ে নিচ্ছে। ওয়েভ ফাউন্ডেশন কৃষকদের জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ওয়েল্টহাঙ্গারহিলফে নারী ও যুবকদের পরিবেশসম্মত কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে। এসব উদ্যোগের কারণে দেখা যাচ্ছে, কৃষির এ ব্যবস্থাপনায় শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না; কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, নারীকে স্বাবলম্বী করে এবং স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করে।

বৃহৎ পরিসরে পরিবেশসম্মত কৃষি বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে—নীতি অসংগতি, বাজার সুবিধার অভাব, জৈব উপকরণে প্রবেশাধিকার কম এবং পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব। অনেক কৃষক এখনো রাসায়নিক নির্ভরতা, ঋণ ও মাটির ক্ষয়ের দুষ্টচক্রে বন্দি। তাই চাহিদাভিত্তিক নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং আর্থিক প্রণোদনা সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষিনীতি ২০১৮, নিরাপদ কৃষিচর্চা নীতি ২০২০, ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০ এবং কৃষি গবেষণা ভিশন ২০৪১; সবই পরিবেশসম্মত কৃষির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করছে।

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য পরিবেশসম্মত কৃষিকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, জাতীয় কৃষিনীতি এমনভাবে প্রণয়ন ও হালনাগাদ করতে হবে, যাতে তা পরিবেশসম্মত কৃষির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। পাশাপাশি জৈব সার, জৈব বালাইনাশক ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে কৃষক সহজে এসব উপকরণ পেতে পারে। এছাড়া কৃষক, নারী ও যুবকদের উৎপাদক সংগঠন বা কৃষক সমিতির মাধ্যমে সংগঠিত ও ক্ষমতায়ন করা জরুরি, যাতে তারা বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে এবং ন্যায্য সুযোগ পায়। কৃষি ক্ষেত্রে স্মার্ট প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ফসলের রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ, স্বল্প ব্যয়ে সেচ ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য অপচয় কমাতে ডিজিটাল উদ্ভাবনের ব্যবহার বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। জল, শক্তি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সেচ ব্যবস্থা ও শীতলীকরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত প্রসারিত করতে হবে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষককেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে এবং কৃষক সরাসরি লাভবান হন। সর্বোপরি অংশগ্রহণমূলক গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তিসংক্রান্ত তথ্যাবলি সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে কৃষক বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।

সার্ক কৃষি কেন্দ্র আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশসম্মত কৃষি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবেশসম্মত কৃষি কেবল টেকসই কৃষির পথ দেখায় না, বরং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে নতুন সেতুবন্ধও গড়ে তোলে। জলবায়ু অনিশ্চয়তা বাড়ছে, এ প্রেক্ষাপটে পরিবেশসম্মত কৃষির আহ্বান তথা আমাদের ভূমি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার আন্দোলনে আমাদের যথোপযুক্ত ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।

ড. মো. হারুনূর রশীদ: পরিচালক, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, বাংলাদেশ