সভ্যতার গোড়াপত্তনের ইতিহাস শুরু হয় নদী থেকে। সে ইতিহাস জানান দেয়, কেবল প্রাকৃতিক জলাধার নয়, যুগে যুগে মানুষের জীবিকা সংস্থানের অন্যতম আধার হয়েছে নদী। এটি একটি দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের ক্ষেত্রে এ কথা আরো বেশি প্রযোজ্য। এ দেশে ১৪০০-এর বেশি নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বেশির ভাগ নদী বর্তমানে দখল-দূষণের কারণে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়ে গেছে। নদীগুলোয় তীব্র নাব্য সংকট রয়েছে। আবার অনেক নদী এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক কারণেও নদী হুমকিতে থাকে। তবে দেশে মানবসৃষ্ট কারণে নদীগুলো বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। রাজধানী ঢাকার চার নদী—তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও টঙ্গী খাল—আড়াই দশক আগে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে সময়ের পরিক্রমায় নদীগুলো আরো বিপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। একই চিত্র দেখা যায় দেশের নানা অঞ্চলে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা নদীগুলোরও।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতি জেলায় একটি করে নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ঘোষণা করে। এর ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপে সবচেয়ে দূষিত ১৮টি নদী পুনরুদ্ধারের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২০ কোটি টাকা। নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে অতীতে বিভিন্ন সময় এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দখলদারদের প্রভাব এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে সেসব প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নদী গতি ফিরে পায়নি। বরং মরা খালে পরিণত হয়েছে। তার পরও প্রত্যাশা রয়েছে বর্তমান সরকারের নেয়া প্রকল্পটি অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ দেশের নদী হারানো জৌলুস ফিরে পাক।

গতকাল বিশ্ব নদী দিবস পালন করা হয়েছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ নদী, সুস্থ পৃথিবী’। এ কথার তাৎপর্য অনুধাবন করা প্রয়োজন। নদীর স্বাস্থ্য ভালো না থাকার অর্থ জলাধারের পরিমাণ কমে যাওয়া। অথচ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় জলাধার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো জলাধার কমে যাওয়া। দেশেও উল্লেখযোগ্যমাত্রায় তাপমাত্রা বেড়েছে। এর পেছনে নদী বিলুপ্তি হওয়া, নাব্যতা হারানোরও দায় রয়েছে।

দেশের ভৌগোলিক গঠন ও ধরন অনুযায়ী নদীই হচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতি সজীব রাখার মূল উৎস। আবহমানকাল থেকে এ দেশের কৃষি-মৎস্য খাত থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদী। যে কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছে ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিসেবে। অথচ দখল-দূষণে নদীর অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে। এতে যেমন দেশে পানি সংকট দেখা দিচ্ছে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশ সজীবতা হারাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবশ্যই নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নদীর যেসব পয়েন্টে দখল আছে, সেখানে দখল উচ্ছেদ করা হবে। যেখানে দূষণ আছে সেখানে দূষণ ও দূষণের উৎসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেখানে নদী ভরাট হয়ে গেছে সেখানে খনন করা হবে। এগুলো বাস্তবায়ন হোক।

যুগের পর যুগ ধরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী নদী দখল করে আসছে। অবৈধ দখলের কারণে অনেক নদী বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। বসতি গড়ে ওঠায় সেখানে যে একসময় নদী ছিল, বোঝা যায় না। তাই দখলদারদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এ কাজ করা থেকে প্রভাবশালীদের বিরত রাখা যায়। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নদীর খননকাজ সম্পন্ন করতে হবে। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে ড্রেজিং না করার কারণেও অনেক নদীর নাব্যতা ফেরানো যায়নি। অনেক সময় দেখা গেছে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তোলা মাটি নদীর দুধারে ফেলে রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বৃষ্টি বা বন্যার কারণে মাটি পুনরায় নদীতে গিয়ে পড়েছে। এতে আবারো নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে বা নদীর গতিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো নদী দূষণমুক্ত করা। এজন্য যেকোনো ধরনের বর্জ্য যেন নদীতে না ফেলা হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে একটি বুড়িগঙ্গা। এ নদীতে প্রতিদিন শহরের ৬০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হয়। অতিরিক্ত বর্জ্যের কারণে বুড়িগঙ্গার পানি স্বচ্ছতা হারিয়েছে। এমনকি কটু গন্ধও বের হয়। এমন অনেক নদীই আজ বর্জ্যের কারণে মৃতপ্রায় হয়ে গেছে। জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না। এতে ওই নদীকে ঘিরে যে জীববৈচিত্র্য তা নষ্ট হয়। তাছাড়া নদীকে কেন্দ্র করে যেসব পেশার মানুষ আছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মৎস্যজীবীদের পেশা হুমকিতে পড়ে। আমাদের সচল ও সুস্থ নদীর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তারও গভীর সংযোগ রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সক্ষম হলে সেটি তাদের অন্যতম সফলতা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নির্বাচিত সরকার যেন এ উদ্যোগ চলমান রাখে সেই রোডম্যাপও নির্ধারণ করা আবশ্যক। সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও নদী পুনরুদ্ধারের কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। কারণ জনগণ সচেতন ও সম্পৃক্ত না হলে সরকারের একার পক্ষে এ কাজ সফল করা কঠিন হবে। বিশেষ করে নদীপারের বাসিন্দা ও নদীর সঙ্গে যাদের জীবিকা অর্জনের সংযোগ রয়েছে, তাদের এ কাজে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।