বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনতা পায়। তবে নিজস্ব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ব্যবহারের দিক বিবেচনায় দুই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য আকাশছোঁয়া। বাংলাদেশে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা থাকলেও তা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের আবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য আর্থিক মূল্যমান প্রায় ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ। অথচ এ সম্পদ আহরণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এখনো আমরা অনবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ভারী শিল্পে কাঁচামালের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকি। এটি জ্বালানি সার্বভৌমত্বের সংকটকে ঘনীভূত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয়ার সুযোগ বিলম্বিত করছে।

দেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে শুধু গ্যাস ব্যবহারে মনোযোগ দেয়া হলেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। গ্যাসের পর কয়লার প্রমাণিত মজুদের হিসাব থাকলেও অন্য খনিজ সম্পদের সঠিক হিসাব নেই। আবার তেল, গ্যাস বা অন্য খনিজের অনুসন্ধান হলেও অনেক সময় উত্তোলনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয়া হয় না। বগুড়ার কুচমা ও কলাকোপায় ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুয়াম অয়েল কোম্পানি কূপ খনন করলেও তা পরে বন্ধ হয়ে যায়। আবার খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাটে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে কয়লা, চুনাপাথর, সাদাবালি, আকরিক লোহা, কাচ বালি ও ধাতব খনিজ। দিনাজপুরে বড়পুকুরিয়া ও মধ্যপাড়া ছাড়া ওই অঞ্চলে আর কোনো খনি থেকে সম্পদ আহরণের বড় নজির নেই। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনাজপুরের হিলি উপজেলার আলিহাটে প্রথমবারের মতো লোহার খনি আবিষ্কার করার পর ৬২ দশমিক ৫ কোটি টন আকরিক লোহার মজুদের কথা জানানো হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিদেশী এক কোম্পানি জরিপ করে জানায়, খনিটি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে না। এ জরিপের পর ওই অর্থে আর কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। জয়পুরহাটে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়া হলেও তাদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। এমনকি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাপেক্স বা অন্যান্য সরকারি সংস্থা রুটিন জরিপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। সিলেটের হরিপুর তেল ক্ষেত্রটিতে অজানা কারণে উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। দেশীয় সম্ভাবনাগুলোর ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তাই দেশে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের পুরনো ক্ষত হয়ে রয়েছে।

খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে ব্যর্থতা সম্ভাবনার ঘাটতি বা সুযোগের অভাবে নয়, বরং সদিচ্ছা ও কৌশলের অভাবে ঘটছে। দিনাজপুরের আলিহাটের লোহার খনির বিষয়টি কাঠামোগত ব্যর্থতার সাম্প্রতিক নমুনা। কারণ খনিটিতে প্রাথমিকভাবে একটি প্রাক্কলন জরিপ করা হয়। সেটির ভিত্তিতে এক বিদেশী পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে জরিপ করানোর পর খনিটি লাভজনক নয় বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মত, জরিপের পরিসর বাড়ানো গেলে আরো সম্ভাবনাময় তথ্য মিলত। প্রাথমিক ধাপে সম্ভাবনা খুঁজে না পেলে অনুসন্ধান বন্ধ করে দেয়া খনি অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক পন্থা নয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাও বলে, খনিজ অনুসন্ধানে প্রতিটি সফল আবিষ্কারের পেছনে অসংখ্য ব্যর্থ অনুসন্ধানের ইতিহাস থাকে। কিন্তু এ ব্যর্থতা মূল্যবান তথ্যভাণ্ডার ও পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি বলে বিবেচিত। এক্ষেত্রে অর্থায়নও একটি বড় সমস্যা। দিনাজপুরের লোহা খনিটির জরিপে ২৫ কোটি টাকা খরচ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ জরিপে দরকার ৩০০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ অর্থ এখন খরচ করা সম্ভব নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে খনিজ অনুসন্ধানকে খরচ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি। এ ধরনের অনুসন্ধান ধৈর্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সফল হয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলো দশকের পর দশক ধরে ব্যাপক জরিপ ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে আজ বৈশ্বিক খনিজ শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকেও এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে গতি আনতে কিছু প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান জরুরি। প্রথমত, জিএসবির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে কিনা। প্রাথমিক প্রাক্কলন জরিপে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তৃত ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনায় কতটা প্রযুক্তি সহায়তা পাচ্ছে এবং দক্ষতা অর্জনে কতটা মনোযোগ দিতে পারছে বোঝা জরুরি। এদিকে পেট্রোবাংলার মতো সংস্থাগুলো কী শুধু কয়লা ও গ্যাস অনুসন্ধানেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবে? এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহত্তর খনিজ অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল পরিকল্পনা নিতে হবে। এমনকি বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিদেশী সংস্থাগুলোকে অংশীদারত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে কতটা উৎসাহ দেয়া হচ্ছে এটি স্পষ্ট করা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার জ্বালানি সংকট বিবেচনায় নতুন ও পুরনো কূপ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে দেশের খনিজ সম্পদের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু জ্বালানি খনিজ আহরণে মনোযোগ দিলে হবে না। অন্য খনিজ আহরণের জন্যও কৌশলগত পরিকল্পনা জরুরি।

খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য শুধু প্রাথমিক জরিপ করলে হবে না। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে খনিজ সম্পদের সঠিক অবস্থান ও পরিমাণ নিশ্চিত হতে হবে। এক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ জোরদার করা জরুরি। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের জরিপের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এজন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠান যেমন বাপেক্স ও জিএসবিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও লোকবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে অধিকাংশ উদ্ভাবনী পরিকল্পনা থমকে যাওয়ার ইতিহাসও দেশে রয়েছে। তবে এমনটি যেন না হয় সেজন্য একটি জাতীয় খনিজ সম্পদ নীতিমালা জরুরি। এ নীতিমালার মাধ্যমে আহরণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক রাখার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এও সত্য, খনিজ আহরণের সম্ভাবনা থাকলেই আহরণ সম্ভব নয়। কারণ কোনো কোনো স্থানে উপরিভাগ পলল দিয়ে গঠিত হওয়ায় খনিজ সম্পদ অনেক গভীরে থাকে। এ স্থানগুলোতে খনিজ আহরণ চ্যালেঞ্জিং। আবার কিছু খনিজ আহরণের ফলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এমনকি বাস্তুসংস্থান বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এক্ষেত্রে পরিবেশ সংবেদনশীল কৌশল নিয়েও ভাবা জরুরি এবং ঝুঁকি সম্ভাবনা বিবেচনা করে আহরণ কার্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে।