দেশের সড়কপথে যানচলাচলের তদারকি থেকে শুরু করে পরিবহনের ফিটনেস সনদ, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ, নানা অভিযোগ রয়েছে। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দুই মাস ধরে সংস্থাটির ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ৭ লাখ ২৪ হাজারের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স আটকে আছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বিদেশগামী কর্মীরা। অনেকে সময়মতো ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়ায় বিদেশে কাজের সুযোগ হারানোর আশঙ্কা করছেন। তেমন একজন হলেন ঢাকার আদাবরের বাসিন্দা আকবর হোসেন। কাজের জন্য আগামী সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তার ড্রাইভিং লাইসেন্সটিও আটকে আছে।

বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে এ ধরনের ভোগান্তি নতুন নয়। বিআরটিএর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে যে গ্রাহকদের সেবা নিতে বেগ পেতে হয়, সেটিও স্পষ্ট। সংস্থাটির ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধের কারণ এ কাজের জন্য নতুন ঠিকাদার না পাওয়া। বিআরটিএর হয়ে এতদিন গ্রাহকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট করে দিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেড (এমএসপি)। গত ২৮ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উচিত ছিল নতুন ঠিকাদার নিয়োগের ব্যবস্থা করা। কিন্তু এর জন্য দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার কাজটি যথাসময়ে করতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। বিআরটিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিতে আরো কয়েক মাস লাগতে পারে। আর নতুন ঠিকাদার না আসা পর্যন্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংকট দূর হবে না বলেও জানিয়েছেন তারা। দেশের সড়ক ও পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা থেকে এ ধরনের অপেশাদার আচরণ বেশিই হতাশাজনক। যদিও প্রিন্টিং কার্যক্রমের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিআরটিএর এমন অদূরদর্শী আচরণ এর আগেও দেখা গেছে। বিআরটিএ পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য এভাবে কালক্ষেপণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিএর আরো দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির সঙ্গে দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও জড়িত। এ সনদ যথাসময়ে হাতে না পাওয়ার কারণে কেউ কাজে যোগ দিতে পারবে না, সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কাম্যও না। তাই অনতিবিলম্বে গ্রাহকদের সনদটি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কিছু প্রিন্ট হলেও গ্রাহকের সংখ্যার তুলনায় সেটা একেবারেই নগণ্য। তাছাড়া প্রতি মাসে নতুন করে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রায় ৬০ হাজারের মতো আবেদন জমা পড়ে। ফলে নিয়মিত ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম কয়েক মাস বন্ধ থাকলে পেন্ডিং লাইসেন্সের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এরই মধ্যে সোয়া সাত লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেন্ডিং অবস্থায় আছে। দ্রুত এগুলো ছাড়ের ব্যবস্থা না করা হলে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পরও পেন্ডিং লাইসেন্সের সংখ্যা কমানো বিআরটিএর জন্যও কঠিন হবে।

বিআরটিএর কাজের গতি ও সেবার মান বাড়ানো আবশ্যক। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিংকাজের ঠিকাদার ছিল এমএসপি। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা ৪০ লাখ কার্ড প্রিন্ট করে দেবে। চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যদিও চুক্তির মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি ৩৩ লাখ কার্ড প্রিন্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এ সংখ্যা বলে দেয় বিআরটিএর পক্ষ থেকে এসব কাজের তদারকিও সেভাবে হয় না এবং এক্ষেত্রেও সংস্থাটি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে। ঠিকাদার নিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেটি বিআরটিএ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ কারণেও পেন্ডিং লাইসেন্সের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আবার কেন ওই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে সেটিও বিআরটিএর জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। অবশ্য বিআরটিএর নিজের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও এ পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার নিয়োগে কালক্ষেপণ বা নানা কারণ দেখিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স আটকে রাখার প্রবণতা বিআরটিএর মধ্যে রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে ঘুস নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক গ্রাহক বাধ্য হয়ে ঘুস দেন এবং ঘুস দিলে দ্রুত লাইসেন্স পাওয়ার নজিরও মিলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তদন্তেও তা একাধিকবার উঠে এসেছে। যদিও দালাল ধরে বা ঘুস দিয়ে লাইসেন্স নেয়া বন্ধ করতে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ১৮টি সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা করে বিআরটিএ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকের যোগসাজশে বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে দালাল চক্র গড়ে উঠেছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক তদন্তেও দেখা গেছে।

গত ৭ মে দুদক বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগে বিআরটিএর ৩৫ কার্যালয়ে অভিযান চালায়। অভিযানকালে বিভিন্ন স্থানে বিআরটিএ ঘিরে সক্রিয় দালালদের হাতেনাতে আটক করা হয়। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পরীক্ষায় ফেল করলেও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে পাস দেখানো, ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস করতে ঘুস লেনদেন, বিনা নোটিসে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিত না থাকা, দালাল দিয়ে কার্যালয়ে সেবাদানের প্রমাণ পান অভিযানকারীরা। অভিযানে যশোর, শেরপুর, নীলফামারী, বরিশাল, বাগেরহাট, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২১ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে গিয়ে দেশে দুর্নীতির শিকার হয় ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ খানা (পরিবার)। ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সেবা নিয়েছে দালাল বা অন্য কোনো মাধ্যমে। এর অর্থ হলো, বিআরটিএর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।

এর পরও সরকারের পক্ষ থেকে সংস্থাটির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। নেই প্রতিষ্ঠানটির কাজের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি। অথচ চলতি বছরের শুরুর দিকেও সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নানা সময়ে বিআরটিএর কাজের মানের উন্নতি না হলে ‘ব্যবস্থা’ নেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি সংস্থাটি বন্ধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। বিআরটিএর কর্মকাণ্ডের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে, এসব হুঁশিয়ারি কেবল কথা। তবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হোক সেটি প্রত্যাশা নয়। প্রত্যাশা কাজের মান বৃদ্ধিকে ঘিরেই। সেজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত করা আবশ্যক। সেটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে। তবে দ্রুত অন্তর্বর্তী কোনো সমাধান নেয়া হোক যাতে পেন্ডিং লাইসেন্স ছাড় করা যায়।