তবে সম্প্রতি স্বল্প জনবল ও ওষুধ সরবরাহে ঘাটতির কারণে গভীর সংকটে রয়েছে দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত বার্ন চিকিৎসা কেন্দ্রটি। বণিক বার্তার প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসকদের অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেকই শূন্য। আইসিইউতে চাহিদার বিপরীতে কর্মরত আছেন এক-তৃতীয়াংশেরও কমসংখ্যক নার্স। এছাড়া প্রশাসনিক বা টেন্ডার জটিলতায় মাসের পর মাস জরুরি চিকিৎসা রসদ ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। জনবল ও ওষুধের ঘাটতির কারণে অনেক রোগীর চিকিৎসা দেরিতে শুরু হচ্ছে আবার অনেকে পরিপূর্ণ চিকিৎসা না পেয়েই হাসপাতাল ত্যাগ করছেন। হাসপাতালে ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। বাড়তি এ বোঝা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের ওপর পড়ছে। এখানেই কঠিন প্রশ্ন তৈরি হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঠিক পাশেই অবস্থিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি সবসময় নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে। তবু জনবল স্বল্পতা ও ওষুধ সরবরাহের মতো জটিল সমস্যায় কেন ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি? জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের এ সংকট দেখে আরেকটি প্রশ্নও জাগে। যদি বিশেষায়িত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানই এমন দুর্দশায় থাকে, তাহলে সংবাদমাধ্যম বা জবাবদিহি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির বাইরে থাকা জেলা-উপজেলা কিংবা প্রান্তিক অঞ্চলের স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোর অবস্থা কেমন? এটিই দেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘস্থায়ী ও মৌলিক সংকট। কারণ দেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ঠিকই হয়েছে এবং এজন্য সামনেও বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু অবকাঠামোকে সচল ও কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে সেবামূলক টেকসই ব্যবস্থাপনা বরাবরই অনুপস্থিত। এমন সময়ে স্বাস্থ্য খাতের সংকট চিহ্নিত করে চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে সরকারকে। না হলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য খাতের সেবামূলক নীতিমালাগুলোও নানাভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যাবহুল দেশে দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বাস্থ্যগত প্রভাব তুলনামূলক বেশি। বিশেষত সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও সংক্রমণজনিত রোগ প্রায়ই স্বাস্থ্য খাতকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। এসব বিষয় বিবেচনা করে প্রায় প্রতিটি সরকারই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সবসময় অবকাঠামো সরবরাহ করেই সরকারি দায়িত্ব সম্পন্ন করা হয়। অবকাঠামো কতটা কার্যকরী সেবা দিতে পারছে তা তদারকির জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেই। এদিকে দেশে গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিসর বেড়েছে। প্রতি বছর মেডিকেল কলেজ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা কারিগরি প্রতিষ্ঠান থেকে বহু চিকিৎসক, নার্স ও কারিগরি সহায়তাকারী বের হচ্ছেন। অথচ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোয় শূন্যপদ থাকছে, কিন্তু সেখানে নানা জটিলতায় নিয়োগ হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সে বিষয়েও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে স্বাস্থ্য খাত বরাবরই ব্যস্ত। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের মতো ৫০০ শয্যার হাসপাতালে বছরব্যাপীই সব শয্যায় রোগী থাকে। অথচ শয্যাগুলোয় মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার মতো লোক নেই। হাসপাতালটি পূর্ণ ধারণক্ষমতায় চলা যন্ত্রের মতো হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেক যন্ত্রাংশই অনুপস্থিত। অবকাঠামোগত সাফল্য থাকলেও এটিতে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ব্যাপক।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সংকটের মূলে রয়েছে চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা। অতীতে হাসপাতালটির অবকাঠামো ব্যবস্থা বিবেচনায় জনবল কাঠামো নির্ধারণ হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় শয্যা বাড়ায় রোগীও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ সালে শুধু বহির্বিভাগেই প্রায় ১৩ হাজারের বেশি রোগী এসেছে। কিন্তু অনুমোদিত পদ একই আছে, শূন্যপদ পূরণ হয়নি। রোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসা চাহিদা বিবেচনায় জনবল কাঠামোকে প্রতি বছর পূনর্মূল্যায়ন করা গেলে রোগীর চাহিদার প্রতিফলন ঘটানো কঠিন হতো না। এদিকে ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া, টেন্ডার ডাকা, সরবরাহকারী নির্বাচন ও ওষুধ হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও এত দীর্ঘ ও জটিল যে জীবন রক্ষাকারী ওষুধও সময়মতো হাতে পৌঁছায় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শূন্যপদ পূরণে অনেক সময় লাগছে। ছুটিতে যাওয়া জনবলের সাময়িক বিকল্প রাখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন হাসপাতালে সংযুক্তিতে পাঠিয়ে দেয়া নার্সের জায়গা পূরণ হয় না।
অবস্থাদৃষ্টে বিদ্যমান ব্যবস্থাই হাসপাতালের সংকট আরো গভীর করে তুলছে। এ ধরনের সংকট শুধু বার্ন ইনস্টিটিউটে এমন নয়, সারা দেশের প্রায় সব স্বাস্থ্য অবকাঠামোও একই সমস্যায় ভুগছে। এ সংকটকে কেবল হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। একটি স্বাস্থ্য অবকাঠামো অকার্যকর থাকলে তার তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে গোটা স্বাস্থ্য খাতে। কারণ জনবল ঘাটতি থাকলে চিকিৎসা মানের অবনতি ঘটে। চাহিদার নিরিখে পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী না থাকলে প্রতিটি রোগীকে পূর্ণ মনোযোগ দেয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। এভাবে ধীরে ধীরে চিকিৎসার মান কমে যাওয়ায় ভুলের সম্ভাবনার পাশাপাশি রোগীর ঝুঁকি বাড়ে। এটি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদেরও পেশাদার ক্লান্তি বাড়ায়। জনবল সংকট থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়তি চাপ নিতে হয়। যে কারণে সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চাপ বহন করা অসম্ভব, এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যে কাজ করে। এমন মানসিক অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের গভীর ও মৌলিক এ সংকটের সমাধানে বরাদ্দ কিংবা অবকাঠামো সুবিধার চেয়ে ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই বড় প্রভাবক। ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে জনবল ঘাটতি পূরণ কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানোর উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। ভারতে বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালগুলোর ওষুধ সংগ্রহে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা আছে। রাজ্যভিত্তিক মেডিকেল সার্ভিসেস করপোরেশন বাল্ক আকারে ওষুধ কিনে টেন্ডার জটিলতা অনেকাংশে এড়াচ্ছে। এমনকি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে জাতীয় প্রোটোকল ও ন্যূনতম জনবলের নির্দেশনা নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই নির্ধারণ করা। এগুলো পূরণ করতে না পারলে জবাবদিহির আওতায় আসতে হয়। বিশেষায়িত চিকিৎসকদের প্রান্তিক অঞ্চলে সেবা দেয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিতে আলাদা প্রণোদনাও চালু রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলংকাও ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। সীমিত সম্পদের মাঝেও দেশটির জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করে। স্থানীয়ভাবে ওষুধ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ওষুধ শিল্পকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তারা আমদানিনির্ভরতাও কমিয়েছে। থাইল্যান্ডে ‘সার্ভিস প্ল্যান’ চালু আছে। এ উদ্যোগে রোগীর চাপ ও রোগের ধরন অনুযায়ী নিয়মিত জনবল পুনর্বিন্যাস করা হয়। অনুপাত লঙ্ঘন হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তিনটি উদাহরণই বলে দেয়, এগুলো বিশাল বিনিয়োগের বিষয় নয়, বরং সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনবল নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনে নমনীয়তা আনা জরুরি। বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় শূন্যপদ পূরণে আলাদা দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া থাকা দরকার। ছুটিতে বা সংযুক্তিতে যাওয়া জনবলের সাময়িক বিকল্প নিশ্চিত করতে একটি কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রি তৈরি করা যেতে পারে। এ তালিকা থেকে জরুরি প্রয়োজনে পদায়ন করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ওষুধ সরবরাহেও চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। বছরজুড়ে রোগীর সংখ্যা ও রোগের ধরন বিশ্লেষণ করে আগাম মজুদ নিশ্চিত করা, টেন্ডার প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং কেন্দ্রীয় বাল্ক ক্রয় ব্যবস্থা চালু করলে ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম সেবারমান বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইসিইউতে নার্স-টু-বেড অনুপাত, চিকিৎসক-রোগী অনুপাতের মানদণ্ডগুলো আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা জরুরি। এক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সর্বোপরি জবাবদিহির কাঠামো গড়তে হবে। শুধু রোগীর সংখ্যা গণনা করলেই চলবে না, সেবার মান পরিমাপ করতে হবে। রোগীর চিকিৎসার ফল, ওষুধের প্রাপ্যতার হার, গড় অপেক্ষার সময়ের তথ্যগুলো প্রকাশ্যে থাকা উচিত। এ তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবার উদ্যোগে শুধু অবকাঠামো বরাদ্দ নয়, জনবল পদায়ন ও ধরে রাখার পরিকল্পনাও একসঙ্গে থাকতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স আকৃষ্ট করতে আর্থিক প্রণোদনা, বাসস্থান সুবিধা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে ভাবতে হবে। দেশে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন কম নয়, কিন্তু অর্জনগুলো বরাবরই প্রশ্নের মুখে পড়ে টেকসই ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর না হওয়ায়। এক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো গড়লেই হবে না। সেবামূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে এ দুটো কাজ একসঙ্গে করতে হবে। না হলে এ সংকট থেকে স্বাস্থ্য খাত কোনোদিনই মুক্তি পাবে না।










