এজন্য ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও সহযোগিতা নিয়ে আজ পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই বিস্তৃত হয়েছে। এ সংহতি কেবল জাদুঘরগুলোর নিদর্শন ও প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভাববিনিময়, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদানেও বিস্তৃত। বাংলাদেশে ১৯১০ সালে প্রথম বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিকে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়।

প্রতি বছরের ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালিত হয়। এ বছরের দিবসটির মূল থিম হলো ‘বিভক্ত বিশ্বের ঐক্যে জাদুঘর।’ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এ বছর ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১০, ১৬ ও ১৭-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাদুঘরগুলোর জন্য তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো এক. জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সবার কাছে পৌঁছে দিয়ে সামাজিক ভেদাভেদ দূর করা, দুই. সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা, তিন. মিলেমিশে বিশ্বের টেকসই উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ শক্তি নির্মাণ করা। জাদুঘরগুলো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত লব্ধ জ্ঞান ও নির্মিত সংস্কৃতিকে নানাভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে। আগুন কিংবা চাকার আবিষ্কার পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল সেই প্রাগৈতিহাসিক কালে। শুধু জ্ঞানের অগ্রগতি ছিল না সেটি ছিল সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা। ধরা যাক আধুনিক মানুষের আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে দক্ষিণ ভারত ও বাংলার উপকূল হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার কথা—মানব অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির এ পদচিহ্নকে পৃথিবীর বড় জাদুঘরগুলো আকর্ষণীয়ভাবে প্রদর্শন করছে দর্শকের কাছে। আপনি যদি নিউইয়র্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে যান তাহলে দেখবেন আদি মানুষের আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অভিগমনের এ পথকে চিত্তাকর্ষকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানবসভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির নানা বিষয় ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ল্যুভ মিউজিয়াম বা নেপলির ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আর্কিওলজির প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু। কেবল অতীত নয়, বর্তমানও নানাভাবে প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে নেদারল্যান্ডসের একটি জাদুঘরে ডিসপ্লেতে মডেলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বর্তমান যুগের মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য কেনার বাতিক। মডেলটিতে একজন মানুষ কতগুলো শপিং ব্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দুহাতের কনুইয়ের ওপর পর্যন্ত শপিং ব্যাগ ধরে আছে, ব্যাগের ভারে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তার পরও সে হাত বাড়িয়ে আছে শপিং মলের দিকে যেন আরো চাই। এ বিষয়বস্তুটিতে আধুনিক মানুষের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার বাতিক, অপব্যয় ও গরিব মানুষের নিত্য আহার্য জোগানের সংগ্রামকে যেন উপহাস করা হয়েছে।

জাদুঘরের বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে বর্তমান বিশ্বে। কেবল প্রদর্শনীকেন্দ্রিক ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। বিশ্বের জাতিতে জাতিতে টেকসই বোঝাপড়ায় প্রয়োজন একে অন্যের সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা। এমনি এক সহযোগিতার নজির স্থাপন করেছিল কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের দুটি মিউজিয়াম। ২০১২ সালে কানাডার ‘মন্ট্রিয়ল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস’ নিউজিল্যান্ডের অত্যন্ত পবিত্র একটি নিদর্শন (উল্কি আঁকা মস্তক) নিউজিল্যান্ডের জাতীয় জাদুঘর ‘তে পাপা তঙ্গারেওয়া’-তে ফিরিয়ে দেয়। নিউজিল্যান্ডের মাওরি সংস্কৃতিতে এগুলো কোনো বস্তু নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মাওরি যোদ্ধা ও তার ঐতিহ্যবাহী উল্কি বা ‘তয় মোকো’। মাওরি যোদ্ধাদের মুখে ও শরীরে যে বিশেষ নকশার উল্কি দেখা যেত, তা কেবল সাজসজ্জা ছিল না। এটি ছিল একজন যোদ্ধার পরিচয়। এটি তার সাহস, বংশমর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থানকে তুলে ধরত। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ভীত করার জন্য এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবেও কাজ করত। মাওরি যোদ্ধারা ঔপনিবেশিক শক্তি আসার আগে মূলত কোনো একটি নির্দিষ্ট শত্রুর বদলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধ হয়েছে মূলত নিজেদের এলাকা বা জমির ওপর দখল বজায় রাখা, মাছ শিকারের স্থান বা চাষাবাদের উপযোগী জমির নিয়ন্ত্রণে কিংবা কখনো বংশের মর্যাদা রক্ষা বা বংশ পরম্পরায় অপমানের প্রতিশোধ) নেয়ার প্রয়োজনে। ইউরোপীয়দের আগমনের পরে ব্রিটিশ সৈন্য এবং ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধগুলো ‘‌নিউজিল্যান্ড ওয়ারস’ নামে পরিচিত। জমির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক, ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেয়া আইনে অস্বীকৃতি, সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনে পরবর্তী যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়। পরাজিত যোদ্ধাদের মুণ্ডু কেটে নেয়া হতো। এমনি এক উল্কি আঁকা মস্তক বহু বছর প্রদর্শিত হচ্ছিল কানাডার জাদুঘরে পরে দুদেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে মস্তকটি নিউজিল্যান্ডে ফিরে আসে। বর্তমানে আধুনিক জাদুঘরগুলো পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে টেকসই সাংস্কৃতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে।

বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের কারণে কম প্রভাবশালী ও উন্নয়নশীল দেশের সংস্কৃতি আজ হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরগুলো কেবল বস্তুগত নিদর্শনের আধার নয়, বরং এগুলো জাতির হাজার হাজার বছরের স্মৃতির পাহারাদার। আমাদের রয়েছে এক সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। যুগে যুগে এ দেশের মানুষ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। জাদুঘরগুলো যখন ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ৯০ কিংবা ২৪-এর গণ-আন্দোলনকে প্রদর্শন করে, তখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং জাতি হিসেবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়টি প্রধান হয়ে ওঠে। এ অভিন্ন ইতিহাসবোধ সমাজের উঁচু-নিচু বা ধর্মীয় ভেদাভেদ মুছে দিয়ে জনগণকে একটি অভিন্ন জাতীয় পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করে। এ ধরনের প্রদর্শনী আয়োজনে জাদুঘরগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত বিশ্বের জাদুঘরগুলো এখন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি (এআর) ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোও আইকমের সহযোগিতায় এসব প্রযুক্তি গ্রহণ করে দর্শকদের কাছে টানতে পারে। ফলে বিদেশীরা ঘরে বসেই ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিতে থাকা নিদর্শনগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রেও জাদুঘর এগিয়ে আসতে পারে। আমাদের মতো নিচু ভূমির দেশ নেদারল্যান্ডস বা ইতালির ভেনিসের জাদুঘরগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ যৌথ গবেষণা করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা আর্দ্রতা থেকে প্রাচীন নিদর্শন রক্ষার উপায় উদ্ভাবন করতে পারে। বিশ্বের নামকরা জাদুঘরগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের জাদুঘরগুলো ‘লোন প্রোগ্রাম’ বা নিদর্শনের পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে এবং যৌথ প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে। বিদেশের জাদুঘরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন ও লোকজ শিল্প প্রদর্শিত হলে পর্যটন ও কুটির শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। বিশ্বায়নের এ যুগে জাদুঘরগুলোর বসে থাকার জো নেই, বরং পালন করতে হবে বহুমুখী ও বহুমাত্রিক ভূমিকা।

ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়