ভ্যাট বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) একটি আধুনিক পরোক্ষ কর পদ্ধতি, যা বহু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ভ্যাট অত্যন্ত কার্যকর একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যয়, জনসেবা ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়। টেকসই ও সুসংহত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ভ্যাট ব্যবস্থার বিকল্প নেই। বিশ্বের অনেক দেশেই ভ্যাট একটি জনপ্রিয় কর ব্যবস্থা। আগে যেসব দেশে ভ্যাট প্রচলিত ছিল না, উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সেসব দেশেও পরবর্তী সময়ে ভ্যাট চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতির বিশেষ সুবিধা হলো, পণ্য মূল্যের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকে, ফলে সাধারণ মানুষকে আলাদাভাবে হিসাব কষে কর পরিশোধ করতে হয় না। ক্রেতা পণ্য বা সেবা গ্রহণ করার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভ্যাট প্রদান করে, যা কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব করে তোলে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ ভ্যাট পরিশোধ করলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তা জমা না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় ভ্যাট দিবস ও ভ্যাট সপ্তাহ-২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে অর্থ উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানুষ নিয়মিত ভ্যাট দিলেও তার পুরো অংশ যথাযথভাবে সরকারের কোষাগারে পৌঁছায় না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। কর ফাঁকি বা ভ্যাট গোপন করার সংস্কৃতি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে। কর আদায়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, ব্যবসায়ীদেরও নৈতিক দায়িত্ব। ভ্যাট আহরণ বাড়াতে হলে প্রয়োজন একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাট ব্যবস্থা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে পৌনে পাঁচ লাখ প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দেয়। তিন লাখের বেশি অনলাইনে রিটার্ন জমা পড়ে। ভ্যাট আইন অনুযায়ী, প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কেনাবেচার যাবতীয় তথ্য দিয়ে ভ্যাট রিটার্ন দিতে হয়। অন্যদিকে প্রতি বছর ৩৯ হাজার ৬০০ কোম্পানি করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দেয়। যদিও আরজেএসসিতে (যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর) নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এখনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ ভ্যাটের আওতার বাইরে রয়ে গেছে, যা জাতীয় রাজস্ব সংগ্রহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি এনবিআরের চেয়ারম্যান বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন করে এক লাখ প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে চায় এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে ৩০-৪০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে এ কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে অনলাইনে সহজ ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন তিনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নিবন্ধন সম্প্রসারণ উদ্যোগ দেশের বর্তমান অর্থনীতি ও রাজস্ব কাঠামোর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
বর্তমানে কোম্পানি করদাতাদের ব্যবসা করতে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ও ব্যবসা নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) নিতে হয়। কিন্তু আয়কর ও ভ্যাটে পৃথক নিবন্ধন থাকায় প্রকৃত করদাতার সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে দুই খাতেই রিটার্ন জমার সংখ্যায় বিস্তর ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। এ ব্যবধান কমিয়ে সরকারের আয় বাড়াতে টিআইএন-বিআইএনের পরিবর্তে একক ইউনিক নম্বর চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে এনবিআর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য কাস্টমস ও আইটি বিভাগের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব আদায় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায় কমপ্লায়েন্স বা সার্বিক গুণগত মান আরো বাড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আয়কর ও ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের দুই জায়গায় দেয়া তথ্যে গরমিল থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভ্যাট রিটার্নে যে বিক্রির তথ্য দেয়া হচ্ছে, আয়কর ফাইলে তার প্রতিফলন থাকছে না। দুই দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার এ সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে টিআইএন ও বিআইএন একীভূত করে ‘ইউনিক নম্বর’ চালু করা হলে তা কেবল রাজস্ব আদায়েই গতি আনবে না, বরং ব্যবসার পরিবেশেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। একটি মাত্র নম্বরের মাধ্যমে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়কর ও ভ্যাটের যাবতীয় তথ্য ‘রিয়েল টাইমে’ যাচাই করা সম্ভব হবে, তখন কর ফাঁকির সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। তবে এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন সহজসাধ্য নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নিয়ম পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন এনবিআরের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন। বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রাজস্ব আদায়ের যে প্রচলন রয়েছে, তা পুরোপুরি বন্ধ না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে আয়কর ও কাস্টমস বিভাগের মধ্যে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা। এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার রাজস্ব আদায়ে জোর দিলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি।
পরোক্ষ কর তথা মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) ওপর সরকারের নির্ভরতা প্রতিবারের মতো চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় এবার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনবিআর। এরই মধ্যে ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটকেও এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাট খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৩ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯২৫ কোটি ৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এ অবস্থায় শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেই হবে না, বরং কর কাঠামোর স্বচ্ছতা, করদাতাদের আস্থা এবং ভ্যাট ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা বাড়ানো, অটোমেশন শক্তিশালী করা, কর ফাঁকি কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া এবং করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সেবাদান প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য হলেও তা অবশ্যই হতে হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অন্যথায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা, বিশেষ করে মূসক (ভ্যাট) কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করতে সংস্কার, অটোমেশন, উন্নত ডিজিটালাইজেশন ও করজালের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।










