চলতি বছর দেশের অভিবাসন খাতে গতানুগতিক কাজগুলো হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রত্যাশা করেছিলাম। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে। এ প্রবৃদ্ধিতে প্রবাসীদের ভূমিকা রয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও তারা ব্যাপক সহযোগিতা করেছেন। এখনো রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সেই সহযোগিতা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। কিন্তু প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতায় যে ধরনের রূপান্তর প্রয়োজন ছিল, সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি।

প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতার মানোন্নয়নের জন্য রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশ প্রস্তাব করা হয়েছিল সরকারের কাছে, যার মধ্যে একটি ছিল অভিবাসন খাতকে পুরো ঢেলে সাজানোর জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) পরিদপ্তর ঘোষণা করা। পাশাপাশি সংস্থাটিকে কয়েকটি অধিদপ্তরে বিভক্ত করা। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই হয়নি। অনেকটা আগের ধারাতেই পরিচালিত হচ্ছে অভিবাসন খাতের কার্যক্রম। এখনো দেশের অভিবাসন খাতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। বিশ্বব্যাপী অভিবাসী কর্মীরা নানা অন্যায়ের শিকার হন। আর সেটি ঘটে থাকে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে। যে কারণে সিন্ডিকেশনে না জড়িয়ে বৈধ পথে জনশক্তি রফতানিতে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল।

বিগত সরকারের শাসনামলে সিন্ডিকেশনের কারণে মালয়েশিয়ায় যেসব কর্মী গিয়েছিলেন, তারা বিভিন্ন হয়রানির মুখে পড়েছিলেন। আর এ সিন্ডিকেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, আমলাতন্ত্রের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা এবং কিছু বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করলেও সেই মামলা ধীর গতিতে আগায়। এদিকে সম্প্রতি আমরা দেখলাম যে অন্তর্বর্তী সরকার সেই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, বরং আবারো সেই সিন্ডিকেট ব্যবস্থার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছে, যেটা সুশীল সমাজের কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিবাসীদের কাছেও না। এ সিন্ডিকেট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গত দুই বছরে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি।

আবার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হতে প্রায় দুই মাসের বেশি সময় লাগবে। কিন্তু সেসময় বর্তমান সরকার আর দায়িত্বে থাকবে না। সুতরাং এ শেষ মুহূর্তে এসে পুনরায় এ রকম সিন্ডিকেশনের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা বরং পরবর্তী সরকারকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোক পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়া হলো। এতে মালয়েশিয়ায় নিরাপদ অভিবাসনের ঝুঁকিও থেকে গেল। কিন্তু অভিবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে হলে কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে নারী কর্মীদের সুরক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার নারী কর্মী জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের অধিকাংশই কাজ করেন গৃহকর্মী বা গার্মেন্ট শ্রমিক হিসেবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও লেবাননই তাদের প্রধান গন্তব্য। তবে এক দশক আগেও যেখানে প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী কর্মী বিদেশে যেতেন, সেখানে এখন সংখ্যাটি অর্ধেকে নেমে এসেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, কর্মসংস্থানের জন্য এক দশক আগে ২০১৬ সালে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। আর এক দশকের মাথায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারী কর্মী গেছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৮ জন, যা প্রায় ৬৬ শতাংশ কম। এর অন্যতম কারণ হলো নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া। বিদেশের কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা, পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, এমনকি যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এসব কারণে নারী অভিবাসনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার গণমাধ্যমগুলোও নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রচার করে। কোনো ইতিবাচক প্রচারণা করে না। এর পরিণতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে। সমাজের মধ্যে নারীদের অভিবাসন ঘিরে এক ধরনের রক্ষণশীলতা (কনজারভেটিজম) কেমনভাবে যেন দানা বাঁধছে। এর প্রতিফলন হিসেবে তৈরি পোশাক খাতসহ আন্তর্জাতিক অভিবাসী খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। অর্থাৎ অভিবাসীদের একটি বড় অংশের জন্য আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এটি দেশের অভিবাসন খাতের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

এর বাইরে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার ব্যবস্থা। চলতি বছর সব মিলিয়ে দেশ থেকে প্রায় ১১ লাখ কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। কিন্তু এর প্রায় ৬৬ শতাংশ লোক গেছে শুধু সৌদি আরবে। কোনো কারণে যদি সৌদি আরবের বাজার বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেশের জনশক্তি রফতানি বড় বাধার মুখে পড়বে। জনশক্তি রফতানি এক দেশকেন্দ্রিক হওয়া কখনই উচিত নয়। জনশক্তি রফতানিতে গন্তব্য রাষ্ট্রের মধ্যে বৈচিত্র্যায়ন আনতে হবে, যা আমরা এখনো করতে পারিনি। মালদ্বীপের বাজার খুলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১১ হাজারের মতো মানুষ গিয়েছে। কিন্তু এ শ্রমবাজারে যে খাতগুলোয় আগে লোক যেত, সেখানেই এখনো কর্মী পাঠানো হচ্ছে। অন্য সম্ভাব্য খাতগুলো খোলা সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে বাস্তবিক অর্থে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার এখনো বন্ধ আছে। কোরিয়ায় ৫০০-এর মতো গিয়েছে। আগে ২০০-এর মতো যেত। জাপানও বলেছে জনশক্তি নেবে। কিন্তু জাপানে কর্মী প্রেরণের জন্য কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন। সেজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং জাপানের ভাষা দক্ষতা অর্জনসহ অন্য কাজগুলো করা দরকার। দুঃখজনকভাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একত্র হয়ে এসব কাজ এখনো করতে পারেনি। প্রবাসে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নে এবার জোর দেয়া সমীচীন ছিল।

প্রবাসীদের স্বপ্ন হচ্ছে তাদের অধিকারের নিরাপত্তা রক্ষা করা। এ সরকারের সময়ে জালিয়াতি কমেছে। তবে বড় আকারের কোনো পরিবর্তন করা যায়নি। এ সরকার প্রবাসীদের জন্য একেবারেই কিছু করতে পারেনি, তা নয়। সত্য হলো এর আগে কোনো রাজনৈতিক সরকারই তা করতে পারেনি। কিন্তু এ সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন প্রবাসীদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তারা ভোটার হিসেবে ভোট দিতে পারবে। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটা একটা সুদূরপ্রসারী অর্জন। আমার প্রত্যাশা, পরিবর্তনের সূচনা এখান থেকেই হবে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসের প্রত্যাশা এটিই— আগামীতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, একটা ১০ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। অভিবাসন দশক ঘোষণা করতে হবে। সেখানে দীর্ঘমেয়াদে, মধ্যমেয়াদে ও স্বল্পমেয়াদে যে পরিবর্তনগুলো করা দরকার, সেগুলো উল্লেখ করতে হবে। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই দেশের অভিবাসন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।

ড. তাসনিম সিদ্দিকী: রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন