বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বাস্তুচ্যুতি অস্থায়ী কোনো সংকট নয়; বরং এটি স্থায়ী একটি সংকট। বিশ্বের সবচেয়ে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দুর্যোগগুলোর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও এখন বাংলাদেশকে অনেক নাজুক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে অতিবৃষ্টি, তীব্র বায়ুপ্রবাহ এবং ঝড়ের কারণে অভিঘাত এলাকার প্রচুর ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাসস্থান ও টিকে থাকার সরঞ্জাম হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছেন অনেকেই। সতর্কতামূলক পদক্ষেপে প্রাণহানি কমলেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জীবিকার সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই দুর্যোগের পর উপদ্রুত এলাকা বসবাস ও আবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরমুখী হচ্ছে জীবিকার তাগিদে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আওতায় মানুষকে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ মোকাবেলার কৌশল শেখাতে হবে। তাহলে মানুষ কম শহরমুখী হবে। এক্ষেত্রে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করতে হবে।

প্রতি বছর নদীভাঙন ও বন্যার কারণে বাংলাদেশের লাখো মানুষ অস্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হন। যদিও সঠিকভাবে কতজন মানুষ প্রতি বছর নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয় তার পরিসংখ্যান নেই। বন্যার পানি নেমে গেলে পুনরায় বসতিতে ফিরতে পারলেও নদীতে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া মানুষের অধিকাংশই আর আগের জায়গা বসতি গড়তে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তনে নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে। অকাল বৃষ্টি ও বন্যা, নদীর দিক পরিবর্তন এবং সুরক্ষা বাঁধ না থাকায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। বাস্তুহারা মানুষের কোথায় ঠাঁই হবে কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। নদীভাঙন শুধু বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে—এমন নয় বরং তা আমাদের জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।

দেশের উন্নয়নযাত্রার পথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট হিসেবে ক্রমেই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দুর্যোগে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তা জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাম্প্রতিক গণনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। উদ্বাস্তু মানুষগুলোর অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা, যাদের জীবিকা মূলত কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুর্যোগ তাদের জীবনে শুধু ঘরবাড়ি হারানোর সংকটই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও কর্মের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আইওএমের গণনার তথ্যানুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বর্তমানে ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৭ জন দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রায় অর্ধকোটি মানুষ বর্তমানে নিজেদের ভিটামাটি হারিয়ে দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু। এ ধরনের তথ্য রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।

এ গণনায় জানা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাস্তুচ্যুত মানুষ (৬৩ শতাংশ) ২০২০ সালের এপ্রিলের আগেই ঘরহারা হয়েছে। এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়। এ তথ্য প্রমাণ করে যে এ সংকট নতুন নয়; বরং পুরনো। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত এবং বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ বাস্তুচ্যুতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে প্রতি বছর নানা ধরনের দুর্যোগ ঘটলেও এতদিন পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান ছিল না। প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী গণনা পরিচালনা করেছে আইওএম। এ গণনা বাস্তুচ্যুতি সংকটের প্রকৃত মাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ওপর পরিচালিত প্রথম জাতীয় গণনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুতি সংকটের প্রকৃত চিত্র স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে, যা ভবিষ্যতে দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা, কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, জলবায়ু অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নীতিনির্ধারকদের আরো তথ্যভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো মানুষ হঠাৎ করেই আয়হীন ও অনিরাপদ জীবনে পড়ে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এ পরিস্থিতিতে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা জরুরি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর যে অধিকারহীনতা তৈরি হয়, তার নিশ্চয়তা বিধান করাই জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কিত আলোচনার মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত। কারণ অধিকারহীনতাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরো বেশি প্রান্তিক করে তোলে। শুধু দুর্যোগের মধ্যে টিকে থাকা নয়, ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন, কর্মসংস্থান ও কৃষি, সুপেয় পানি ইত্যাদির নিশ্চয়তার পাশাপাশি এজন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এখানেই ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর প্রতি ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সামনে চলে আসে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হলেও এরাই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। উপকূলীয় এলাকার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ঠাঁই নিচ্ছে শহরগুলোর বস্তিতে, বিশেষ করে ঢাকার বস্তিগুলোয়। ফলে দ্রুত বর্ধনশীল ও বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির শহর ঢাকা দিন দিন আরো ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। মনে করা হয়, ঢাকা হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। সে কারণে সারা দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ ছুটে আসছে ঢাকায়। আশ্রয় নিচ্ছে বস্তিতে। কিন্তু ঢাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ চরম গরিব। এখানে সমস্যার শেষ নেই। এর পরও প্রতি বছর নানা কারণে বসতভিটা ছেড়ে ঢাকায় আসছে স্বল্প আয়ের মানুষ। ফলে পরিবেশবিদদের কেউ কেউ বলছেন, ঢাকা শহর এখন পরিণত হয়েছে জলবায়ু শরণার্থীর বস্তিতে। কিন্তু ঢাকায় এসে তাদের প্রথমেই হোঁচট খেতে হয় কর্মসংস্থান নিয়ে। তবু জলবায়ু শরণার্থীরা ঢাকামুখী। এসব জলবায়ু শরণার্থীকে ঢাকামুখী হওয়া ফেরাতে না পারলে ঢাকার পরিস্থিতিও কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আন্দাজ করতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে দুর্যোগের পরিমাণ বাড়ছে এবং সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়তে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুত হবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের সুরক্ষা ও অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, এ নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। আমরা জানি, এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা আছে এবং সে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনাও করছে। তবে তাদের এ কর্মকাণ্ড যে পর্যাপ্ত নয়, অর্ধকোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বিষয়টির মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, এ সমস্যা অস্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। সমস্যাটি স্থায়ী এবং আমাদের জীবনের একটি অংশ হিসেবেই বিবেচিত। দুর্যোগকে যখন বাংলাদেশের মানুষকে মেনে নিতে হচ্ছে, তখন পরিত্যাগের কথা না ভেবে সহাবস্থানের কথা চিন্তা করাটাই শ্রেয়। আর সে কারণেই বাস্তুচ্যুত মানুষের দিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া দরকার। দেশের জনগণ সংবিধানে যেসব অধিকার ভোগ করে, বাস্তুচ্যুত মানুষকেও একই ধরনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ তাদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে যদি আমরা জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে না রাখি, তবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।