একটি রাষ্ট্রের চারটি মূল উপাদান থাকে—ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। এর মধ্যে জনগণ ও সরকার মূলত রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এ দুয়ের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে। তবে এক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এ কাজের জন্য সরকার প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে। আর কাঠামোটি কেন্দ্রীভূত হবে নাকি সুষমভাবে গড়ে তোলা হবে সেটির ওপর নির্ভর করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে। প্রশাসন ব্যবস্থা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নাগরিক সুবিধারও সুষম ও ন্যায্য বণ্টন ব্যাহত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এতে রাষ্ট্র জনকল্যাণমুখী না হয়ে, স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। যে কারণে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি সময়ের পরিক্রমায় জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে, বিশেষত ১৯৬০ ও সত্তরের দশকে। বিকেন্দ্রীকরণের কাজটি হতে পারে ভৌগোলিকভাবে বা বিভিন্ন খাত পরিচালনার জন্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর কিংবা কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাত পরিচালনার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষভাবে নিয়োজিত করা।
দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশকে বিকেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। বরং এটি অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারেও এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে দেশের আকার বিবেচনায় বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ দেখা যায় জনসেবা প্রদান, নগর শাসন ব্যবস্থা ও অর্থপ্রবাহে। এমনকি দেশের রাজস্ব খাতের মাত্র ৭ শতাংশ ব্যয় করে স্থানীয় সরকার, যেখানে ভিয়েতনামে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৮ ও চীনে প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যয় করে স্থানীয় সরকার। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য জরুরি হলো স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এটি ছাড়া টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়।
জন্মলগ্ন থেকেই অতিকেন্দ্রীভূত এক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এখানে বেশির ভাগ কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহর। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার জনপরিসরে বিকেন্দ্রীকরণের কথা উল্লেখ করলেও তার বাস্তবায়নে বিশেষ কোনো পদেক্ষপ নেয়নি। উল্টো প্রায় সব সরকারই ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি হতে চেয়েছে এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ব্যবহারে বেশি মনোযোগী ছিল। ফলে দেশের জনগণকে একাধিকবার গণ-আন্দোলনে নামতে হয়েছে। নব্বই থেকে শুরু করে চব্বিশে এসেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটাতে হয়েছে। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার পুরনো রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকেই হেঁটেছে সরকারগুলো। ক্ষমতার সুষমবণ্টন হয়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরও এ চিত্রে খুব বেশি বদল হয়নি। এমনকি এ অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় সরকারকে সেভাবে গতিশীল করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এর পরও জনমনে ব্যাপক প্রত্যাশা জন্মেছিল স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন ঘিরে। কেননা স্থানীয় সরকারের হাতে সম্পদ ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা প্রয়োজনমাফিক হস্তান্তর করা না হলে রাষ্ট্রে বিদ্যমান বৈষম্য কমানো যায় না এবং নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে ভোগান্তি তৈরি হয়।
স্থানীয় সমস্যার সমাধান ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি। দারিদ্র্য বিমোচন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় সরকার খাতের ভূমিকা অপরিহার্য। বিগত সময়ে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এত বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল যে জনগণ স্থানীয় পর্যায়ে সুষ্ঠুভাবে বিভিন্ন সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে, চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। হয় ঘুস দিতে বাধ্য হয়েছে, নয়তো দীর্ঘমেয়াদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে পড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল স্থানীয় সরকারে সুশাসনের অভাব। রাজনৈতিক দলীয়করণ ও অতিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কারণে এখানে দুর্নীতি বাসা বাঁধে। এছাড়া প্রয়োজনীয় নীতিমালার ঘাটতি, আর্থিক সক্ষমতার অভাব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকা, দুর্বল জনবল ব্যবস্থাপনাও ছিল বড় ধরনের সংকট। এসব সমস্যার পাশাপাশি বর্তমানে মূল সংকট হলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধি না থাকা। রাজনৈতিক পালাবদলের পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা পালিয়েছে বা আত্মগোপনে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এমনকি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এ-সংক্রান্ত এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন চেয়েছে। এতে অন্তত স্থানীয় সরকারের পদগুলো শূন্য থাকত না এবং জনগণ সরকারি সেবা পেতে পারত। কার্যকর স্থানীয় সরকারের অভাবে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যগুলো আরো প্রকট হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনের শাসন ও পরিবেশ সবকিছুর অবনমন ঘটেছে। ফলে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। এতে শহরের বাসিন্দাদের নানামুখী সমস্যারও সমাধান হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকার অপ্রতুল নাগরিক সমস্যা, আবাসন থেকে শুরু করে যানজটের কথা উল্লেখ করা যায়।
দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অতিকেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। এজন্য স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় সরকারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এটি নিশ্চিতের আগে ক্ষমতা বা সম্পদ হস্তান্তর করা হলে তার অপব্যবহার ও অপচয় হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। আর যখন রাষ্ট্রের পুরো ব্যয় সরকার কেন্দ্র থেকে খরচ করে তখন সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। প্রান্তিক জনগণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ন্যায্য সুফল পায় না। বিগত সময়ে এর অনেক নজির দেখা গেছে। সরকার প্রকল্প নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে চায়। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এসব খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করা। বাংলাদেশের সংবিধানেও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও বিকেন্দ্রীকরণের বিধান রয়েছে। সুতরাং সংবিধানের পরিপালন হওয়াও বাঞ্ছনীয়। এছাড়া সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখতেও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার মাধ্যমে মূলত জনগণকে ক্ষমতায়িত করা হয় এবং এটি জনগণ ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র যাতে স্বৈরতান্ত্রিক না হয়ে যাতে গণতন্ত্রমুখী ও কল্যাণকর হয়, সেজন্যও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ক্ষমতায়ন আবশ্যক।










