দেশের সড়কের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। নানামুখী কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যুগে দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক তথ্যে উঠে এসেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত এবং ১ লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন আহত হয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলক বেড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সে চিত্রই দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ে মারা যান ৪ হাজার ৯৮১ জন।

দেশে সড়কে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, অনেক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও এ পরিমাণ মানুষ মারা যাওয়ার নজির নেই। অথচ নানা সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হয়, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সংঘটিত আন্দোলনের কথা। ফুটপাতে বাসচাপায় সহপাঠীর মৃত্যুর পর কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমেছিল। ধীরে ধীরে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত হয় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকেও নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। যদিও সে বছরও সড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কম ছিল না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, ২০১৮ সালে সড়কে ৪ হাজার ৭৬ জনের এবং পরের বছর আরো বেশি ৪ হাজার ৩৫৮ জনের মৃত্যু হয়।

এসব তথ্য এটিই নির্দেশ করছে যে সড়ক নিরাপদ না হয়ে ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মনোযোগ দেবে সেই প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে ২০১৮ সালে যারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, তাদের বৃহৎ অংশের উপস্থিতি ছিল চব্বিশের অভ্যুত্থানে। এছাড়া কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের অংশও ছিলেন। কিন্তু গত দেড় বছরেও তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল অন্তত কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখত।

কেউ সড়কে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আহত বা নিহত হতে চায় না। অথচ এগুলো দেশের মানুষের নিত্যদিনকার অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে গেছে। সময়ের পরিক্রমায় সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন ঘটানো যায়নি। ফলে সড়ক হয়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলার অন্যতম নজির। চালকের অদক্ষতা, অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালানো এবং ত্রুটিপূর্ণ ও বিভিন্ন গতির যানবাহন অবাধ চলাচলের কারণে সড়কে মৃত্যু প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এ পরিস্থিতির পেছনে বড় দায় রয়েছে বিআরটিএর। সংস্থাটির অপেশাদার চর্চা প্রতিনিয়ত সড়ককে ঝুঁকিপূর্ণ করে চলেছে। কেবল তাই নয়, দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এ সংস্থার নাম উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক সাম্প্রতিক জরিপে। এর বাইরে সড়কে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকাংশে দায়ী। এ দুইয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নিরাপদ সড়কসংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সব মিলিয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সড়ককে নিরাপদ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো। এজন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যকর উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। তবে পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রীরাও এক্ষেত্রে বড় অংশীজন। পরিবহন মালিকরা ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ সেই গাড়ি যখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তখন পরিবহন মালিকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। সেই সঙ্গে লক্কড়ঝক্কড় গাড়ির চালকের জীবনও ঝুঁকিতে থাকে।

চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লক্কড়ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূর-দূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে অনেক সময় বাস-ট্রাকের মাদকাসক্ত চালকের গতির লড়াইয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। কেউবা আবার গাড়ি চালানোর সময় ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং তদারক না করা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। আবার ব্যক্তিগত যানের চালক থেকে শুরু করে যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও বেশি। অর্থাৎ একদিকে যেমন ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন নেই, অন্যদিকে চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও তা উপেক্ষা করার প্রবণতা রয়েছে। যে কারণে সড়কের বিশৃঙ্খলা একটা দুষ্টচক্রে আটকে গেছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আর ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না। সড়ক খাতে সরকারের চেয়ে পরিবহন মালিকদের নিয়ন্ত্রণ বেশি দেখা যায়। আর সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের অন্যতম কারণ এটি। এছাড়া এক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিআরটিএর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ফিটনেসবিহীন গাড়িকে ফিটনেস লাইসেন্স প্রদান এবং অদক্ষ চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বদা কঠোর ব্যবস্থা নিতে তৎপর থাকতে হবে। বিশেষ করে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিআরটিএকে একটি সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ মাসে আয়োজিত ‘টেকসই উন্নয়নে সড়ক নিরাপত্তা আইন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিআরটিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আইন যতই হালনাগাদ করা হোক, বাস্তবায়ন না হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। এটা সবারই বিশ্বাস। বিআরটিএ আইন বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে, সেটিই কাম্য।