জনশক্তি রফতানি ঘিরে বিদেশে এক ধরনের নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। এর মূলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নথি জালিয়াতির মাধ্যমে বিদেশগমন। ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে শুরু করে ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা ইত্যাদির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেলে একের পর এক দেশ বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রদান স্থগিত, এমনকি বন্ধ ঘোষণা করার নজিরও রয়েছে। অর্থাৎ বৈদেশিক শ্রমবাজার বেদখল হওয়ার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার যে নির্দেশ দিয়েছে, তা ক্ষয়িষ্ণু ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি বৃদ্ধিতেও অবদান রাখবে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত এক বছরে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ এনে প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো। বিগত সময়ে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে প্রায় দুই বছর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও ২০২৪-এর জুলাই থেকেই ভিসা ইস্যু বন্ধ করেছে দেশটি। গত বছর কাতারও একই পথে হেঁটেছে।
এর পেছনে নানা কারণ থাকলেও জাল নথিপত্রের ব্যাপক ব্যবহার যে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। এটাও অবৈধ অভিবাসনেরই একটা প্রক্রিয়া। আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ স্পষ্টই জানিয়েছে জাল নথিপত্র দিয়ে ভিসা নেয়ার পথ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রক্রিয়া সহজ করবে না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের পেছনেও নানা রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়ম ও নথি জালিয়াতির অভিযোগ বড় ভূমিকা রেখেছে। এ প্রেক্ষাপটে নানা সময়ে ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের মিশন যৌথভাবে আহ্বান জানিয়েছিল যে জাল নথি ব্যবহারে শুধু ভিসা বাতিল নয়, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা ও সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও রয়েছে, যা এরই মধ্যে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। একটি দূতাবাস একাই প্রায় ৩০০টি পর্যটন ভিসা আবেদনে একই ব্যাংকের জাল স্টেটমেন্ট শনাক্ত করেছে বলে জানা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ প্রতারণা একটি সংগঠিত রূপ নিয়েছে। দালাল চক্র ও অননুমোদিত ভিসা এজেন্সির একটি বড় অংশ ব্যাংক স্টেটমেন্টের তথ্য পরিবর্তন করে, সাময়িকভাবে টাকা জমা দেখিয়ে কিংবা সম্পূর্ণ ভুয়া স্টেটমেন্ট তৈরি করে ভিসাপ্রত্যাশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এ চক্র ভাঙতে না পারলে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমিকের বাজার টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি নিঃসন্দেহে সময়োচিত। এ উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাস্তবায়নের পথে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়েও কাজ করা প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেখানে এরই মধ্যে উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামোয় কাজ করছে, সেখানে অনেক সরকারি ও ক্ষুদ্র ব্যাংক এখনো মৌলিক ডিজিটাইজেশনের প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে আছে। ৯০ দিনের মধ্যে সবার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য কিউআর কোড চালুর যে নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে তা বিদ্যমান বাস্তবতায় বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তাছাড়া কিউআর কোডের মাধ্যমে ব্যাংকিং ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার তৈরি হলে সেখানে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও সংগত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে সাইবার নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হলেও সেটি কতটা এনক্রিপ্টেড ও সুরক্ষিত হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশিকা দেয়া হয়নি। অন্যদিকে প্রতিটি ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। সুতরাং ভুয়া নথির মাধ্যমে ভিসা আবেদনের পথ বন্ধ করতে হলে পূর্বশর্ত হিসেবে এসব সমস্যার সমাধান অপরিহার্য। আবার কেবল কিউআর কোড থাকলে প্রতারণা বন্ধ হবে—এটা নিশ্চিত ধরে নেয়া যায় না। কারণ যে চক্র বর্তমানে জাল স্টেটমেন্ট তৈরি করছে, তারা ভবিষ্যতে ভিন্ন কোনো পন্থাও অবলম্বন করতে পারে। তাই কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান যথেষ্ট নয়, আইনি প্রতিকারও জরুরি।
এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে একটি কেন্দ্রীয় যাচাই-বাছাই সার্ভার (সেন্ট্রালাইজড ভেরিফিকেশন পোর্টাল) তৈরি করা, যেখানে সব ব্যাংক তাদের নথির তথ্য একীভূত করবে। এতে প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে না এবং বিনিয়োগও সাশ্রয়ী হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বাংলা কিউআর কোড নিয়ে কাজ করছে এবং জুলাই থেকে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে—এ অবকাঠামো কাজে লাগানো যেতে পারে। পাশাপাশি জাল নথি তৈরি ও ব্যবহারে যুক্ত দালাল ও এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ কঠোর করতে হবে। প্রতারকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না হলে প্রযুক্তিগত সমাধান কেবল সাময়িক সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধার একদিনে সম্ভব নয়, কিন্তু এ পথে ধীরে ধীরে এগোনো প্রয়োজন। কিউআর কোডের নির্দেশনা সেই পথে একটি ধাপ হতে পারে, যদি বাস্তবায়ন করা যায়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো তৎপর হতে হবে এবং সরকারকেও এদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।










