কিন্তু এ সংখ্যার বিপরীতে এ স্তরে শিক্ষকতা ও নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ উল্টো। মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষকের মাত্র ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ নারী; উচ্চ মাধ্যমিকে তা আরো কম (মাত্র ২৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ)। নেতৃত্বের অবস্থানেও অর্থাৎ প্রধান শিক্ষকের পদে মাত্র ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ নারী এবং কলেজের অধ্যক্ষ পদে তা ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উপস্থাপিত বৈষম্যমূলক এ পরিসংখ্যানের পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং পরস্পরসংযুক্ত একাধিক সামাজিক ও কাঠামোগত বিষয় দায়ী। এগুলোকে চিহ্নিত করে নারী কর্মসংস্থান বাড়ানোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারলে শিক্ষা খাতে জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের গুণগত চরিত্র অর্জন করা কঠিন হবে না।
কর্মসংস্থানে নারীর নেতৃত্বস্থানীয় পদ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম বাধা সমাজ ও পরিবার। দেশের সমাজে এখনো নারীকে সংসার পরিচালনার দায়িত্বেই দেখা হয়। কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থানকে ‘সেকেন্ডারি’ বলে বিবেচনা করা হয়। এজন্য অনেক যোগ্য নারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষের মতো দায়িত্বশীল পদে আবেদন করতে উৎসাহ পান না। আবার অনেকের আগ্রহ থাকলেও পরিবার থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নারীর বদলে পুরুষ শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ পদে সুপারিশ করে। এক্ষেত্রে নারীর ‘পারিবারিক দায়দায়িত্ব’কে সুপারিশ না করার অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘটে বিধায় অনেক যোগ্য প্রার্থী ন্যায়বিচারের দাবি করতে পারেন না। এদিকে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীর হার বেশি হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানে নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা নেয়ার সুযোগ সীমিত। ভৌগোলিক ও যাতায়াতসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষিত নারী আগ্রহ থাকলেও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে চান না। নিরাপত্তার অভাব এবং পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। বিশেষত প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সীমিত হওয়ায় নারী তো বটেই, পুরুষ প্রার্থীরাও এ পেশায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহ পান না। মাদরাসার ক্ষেত্রেও এটি বিশেষ সংকট। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকের বেশি নারী শিক্ষার্থী হলেও নারী শিক্ষকের হার মাত্র ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ। ‘মহিলা মাদরাসা’ বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণও পুরুষদের হাতে থাকে। ফলে নারীদের অভিযোগ প্রকাশের সুযোগ সীমিত এবং নানা প্রতিষ্ঠানে নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা নারীর জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে নানা বাঁধা তৈরি করছে। এ বাঁধা সরাতে না পারলে বিপুলসংখ্যক মেধাবী নারীর মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ হারাতে হবে।
নারীর অর্থনৈতিক ও পেশাদার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অনেক খাতে জনমিতিক লভ্যাংশ আদায় সম্ভব। বিশেষত শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা খাত এ লভ্যাংশ আহরণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। শিক্ষার্থী হিসেবে নারীর এগিয়ে থাকার সুফল শিক্ষা খাতে পেশাদারভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে অর্থনৈতিক শক্তি রূপান্তরের নীতিমালা বাস্তব রূপ পাবে না। শিক্ষিত নারীরা কর্মহীন থাকলে কিংবা অবমূল্যায়িত হলে তাদের শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বা পারিবারিক বিনিয়োগ অপচয় হয়। এ সংকট নিরসনে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতিকেই দায়ী করতে হয়। প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ কোটা চালু করে ইতিবাচক ফল মিলেছে। তবে এ নীতির সম্প্রসারণ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে হয়নি। এমনকি নেতৃত্বের পদগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কোনো কার্যকর নীতিমালাও নেই।
অথচ কার্যকর নীতিমালা ব্যবহার করে বদ্ধ পরিবেশেও নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর নজির দক্ষিণ এশিয়াতেই আছে। ভারতে নারী শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিশেষ বরাদ্দ আছে। সেখানে ‘সমগ্র শিক্ষা অভিযান’ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন রাজ্যে নারী শিক্ষকদের আবাসন সুবিধা, স্থানীয় নিয়োগে অগ্রাধিকার এবং নেতৃত্ব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কর্ণাটক ও কেরালার মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যের স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিতেও নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। নারী শিক্ষকের হারে এগিয়ে শ্রীলংকা। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক প্রশিক্ষণ নীতির কারণে মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষকের হার প্রায় ৬৫ শতাংশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ‘গুরু ইনপ্রেস’ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক ও দূরবর্তী এলাকায় নারী শিক্ষকদের বাড়তি ভাতা ও আবাসন দেয়া হয়। এসব উদাহরণ বলে দেয়, ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা একসঙ্গে দিলে নারীর কর্মক্ষেত্রে টেকসই অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশকেও শিক্ষা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়াতে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষকতায় নারী নিয়োগে অন্তত ৪০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা এবং স্থানীয় বা নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে ভাবতে হবে। প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ পদে নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি ভাবতে হবে। শিক্ষা অবকাঠামো ও শিক্ষক আবাসন সুবিধা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে নারীর বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার নীতিমালা থাকা জরুরি। তবে শুধু অবকাঠামো বা নিয়োগের হার বাড়ানোর নীতিমালা করলেই হবে না। মাঠপর্যায়ে জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে কোন এলাকায়, কোন স্তরে এবং কোন বিষয়ে নারী শিক্ষকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি তা চিহ্নিত করতে হবে। তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করা বেশি প্রাসঙ্গিক। নারী শিক্ষার্থীরা যদি নারী শিক্ষকের নেতৃত্ব দেখতে পান তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অনেক নারী নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। এ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারলে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতাও অনেকাংশে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।










