মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি এবং রিভারাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দেশের ফ্রোজেন ফুড খাত ও চিংড়ি শিল্প, এ খাতের সম্ভাবনা-সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এ শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ও করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।

ফ্রোজেন ফুড খাতের আওতায় কী কী পণ্য অন্তর্ভুক্ত। এ খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যাটি কী, যেটি সমাধান হলে সেক্টরের গতিপথ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে?

ফ্রোজেন ফুড খাতে মূলত বাগদা ও গলদা চিংড়ি, সাদা মাছ, সামুদ্রিক মাছ, বিভিন্ন কাট–ফিশ পণ্য এবং অতীতে রফতানীকৃত ব্যাঙের পা—এসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের এ শিল্পের বিকাশ শুরু হয় স্বাধীনতার পরপরই; দাসগুপ্ত বাবু নামে একজন উদ্যোক্তা প্রথম চিংড়ি রফতানি করেন। ১৯৭৭ সালে খুলনা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রসেসিং কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পটি সংগঠিত রূপ পায়। সে সময় চিংড়ির পাশাপাশি ব্যাঙের পা ও পরে সাদা মাছও রফতানির তালিকায় যুক্ত হয়। ওই সময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের পরই এটি দ্বিতীয় বৃহৎ রফতানি খাত ছিল এটি।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পিছিয়ে পড়েছি এবং এখন ১৬-১৭তম স্থানে নেমে এসেছি। এর মূল কারণ রাষ্ট্রীয় ও শিল্প–উভয় স্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ঘাটতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এ শতভাগ কৃষিনির্ভর খাতটিকে এখনো নীতিমালায় কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়া। আন্তর্জাতিক এসআই কোডে এটি কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে চিহ্নিত হলেও দেশে সে স্বীকৃতি নেই। ফলে কৃষিপণ্যসংক্রান্ত প্রণোদনা, ভর্তুকি, সহজ অর্থায়ন বা নীতি–সহায়তা কোনোটিই এ সেক্টর পায় না। এই একটি নীতিগত বাধা দূর হলে চাষী, প্রসেসর, রফতানিকারক—সব পর্যায়ে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা ও রফতানি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং পুরো খাতের গতিপথ বদলে যেতে পারে।

২০১০ সালের পর থেকে অনেক কারখানা লোকসানে পড়ে এবং রফতানি কমতে থাকে। তবুও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো গত এক বছরে শিল্পটি পুনরায় উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমি প্রথমে সেক্টরের সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছি এবং এখন সমাধানের পথে কাজ করছি। সরকার ও উদ্যোক্তারা একসঙ্গে কাজ করলে আমরা আবারো দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা প্রথম সারির অবস্থানে ফিরে যেতে পারব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

আমাদের প্রক্রিয়াজাত শিল্প আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কোন তিনটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে?

বিশ্বব্যাপী চিংড়ির বাজার এখন ৭২ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে বাংলাদেশের অশীদারত্ব খুবই ছোট। আমাদের বাগদা চিংড়ির দারুণ চাহিদা আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত উৎপাদন না হওয়ায় রফতানি করতে পারছি না। পাশাপাশি রয়েছে নীতিগত সমস্যা। মানের দিক থেকে বাংলাদেশ বরং অনেক এগিয়ে। ভারত, ভিয়েতনাম, একুয়েডর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে রফতানীকৃত চিংড়ি ফেরত আসা কনটেইনারের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য, বছরে মাত্র দুই-তিনটি। আমাদের চিংড়ির মান অত্যন্ত উন্নত। রফতানিকারকরাও সততা ও ইন্টেগ্রিটির সঙ্গে কাজ করেন।

ফার্ম থেকে কারখানা পর্যন্ত ঋণপ্রাপ্তির অভাবকে প্রথম সারির বাধা বলা হয়। আপনার মতে সবচেয়ে বড় ফান্ডিং ব্লক কোথায়? হ্যাচারি, ফিড, ইনপুট না ফার্মিং কোন পর্যায়ে?

পরিস্থিতি আসলে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’, প্রত্যেক জায়গায়ই সমস্যা। রাষ্ট্রযন্ত্রে সব সময়ই একটি মানসিকতা কাজ করে, ‘আপনাকে সুবিধা দিচ্ছি, পরিবর্তে আপনি আমাকে কী দেবেন?’ কৃষক, চাষী, কালেকশনকারী, বাজারজাতকারী, প্রসেসরসহ সবখানেই একই প্রবণতা। ঋণ নিতে গেলে বছরের পর বছর, মাসের পর মাস অফিসারের টেবিলে বসে থাকতে হয়—এটাই বাস্তবতা। অথচ কার্প মাছের পোনা ১ টাকা, বড় হলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা; চিংড়ি পোনা বড় হলে প্রতি পিস ২০০ টাকা, এত লাভজনক ব্যবসার পরও এখানে কোনো গাইডলাইন নেই, নীতিসহায়তা নেই। চাষী ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার নীতিমালা না থাকার কারণেই শত শত মানুষ কর্মহীন থাকে। সঠিক নীতি থাকলে কেবল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নয়, রফতানিও বাড়বে এবং জাতি হিসেবেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

২০৩০ সালের রফতানি লক্ষ্য অর্জনে বছরে ৩৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দরকার। এজন্য আপনারা প্রস্তুত?

বাংলাদেশে আগে ১৪০টি ফ্যাক্টরি ছিল; এখন চালু আছে ৫২-৫৩টি, এর অনেকগুলো নামমাত্র চলছে। বিশ্ববাজার ৭২ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে আমাদের অংশ খুবই কম। গত বছর আমরা মাত্র ৪৪ কোটি ডলারের রফতানি করেছি। বিশ্বে যেখানেই চিংড়ি চাষ হয়, সেখানে প্রতি হেক্টরে উৎপাদনক্ষমতা ২৪ টন পর্যন্ত, কিন্তু বাংলাদেশে সনাতন পদ্ধতিতে মাত্র ৪০০ কেজি। এটি যুগোপযোগী নীতি না থাকার ফল। অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর ভেনামি চিংড়ি চাষের দরজা খুলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সহায়তা এখনো নেই। চিংড়ির জমিগুলো উদ্যোক্তাদের লিজ দিলে ও নীতিসহায়তা দিলে ২০৩০ সালের মধ্যে রফতানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।

চিংড়িতে দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন স্থবিরতার কারণ কী?

স্থবিরতার বড় কারণ সনাতনী পদ্ধতিকে আঁকড়ে রাখা। চলতি সহস্রাব্দের শুরুতে প্রতিবেশী ভারতে ভেনামি চিংড়ির চাষ শুরু হয়েছিল। আমরাও যদি ওই সময় এ চাষ শুরু করতাম, আজ অনেক দূর এগিয়ে যেতাম। ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলো, কিন্তু এ খাতের উদ্যোক্তাদের কেউ কিছু জিজ্ঞাসাই করল না। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে ব্যবহারের জন্য জাহাজ কেনা হলো, সেটি এখন বন্দরে স্ক্র্যাপ হয়ে আছে। পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে গুরুত্ব না দেয়াই স্থবিরতার মূল কারণ।

আপনার দৃষ্টিতে এ খাতের প্রধান তিনটি শক্তি ও দুর্বলতা কী?

শক্তি হলো কৃষিনির্ভর শিল্প, পুরো চেইনই দেশীয়। বিপুল চাষযোগ্য জমি এবং বাগদা চিংড়ির উচ্চমান ও বিশ্ববাজারে সুনাম। দুর্বলতা হলো কৃষি শিল্প হিসেবে ঘোষণা না দেয়া, জমি বরাদ্দে অস্বচ্ছতা বা প্রকৃত চাষী জমি না পাওয়া এবং অঞ্চলভিত্তিক চিংড়ি জোন নির্ধারণ না করা।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী চিংড়ির এত সুনামের মূল কারণ কী? তার পরও উৎপাদন ও রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না কেন?

বাংলার মাটি উর্বর, মাছ সুস্বাদু, বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম মৎস্য ভাণ্ডার। কিন্তু পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার অভাবে এ সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে পারছি না। বাংলাদেশের বাগদা দেখলেই বিদেশীরা নিতে চায়। ভারত বা মিয়ানমারের চিংড়ির চেয়ে বেশি দামে নেয়। কেবল পর্যাপ্ত উৎপাদন ও মান বজায় রাখতে পারলে বিশাল বাজার পাওয়া সম্ভব। রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেলে প্রতিযোগিতায় আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব।

সমস্যা হলো আমাদের হাতে এখন পণ্যই নেই, কাঁচামালও নেই। চালু ৫৫টি ফ্যাক্টরির সক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। সঠিক জায়গায় ঋণ ও বিনিয়োগ না যাওয়াই মূল সমস্যা।

বিদ্যমান কোল্ড চেইন অবকাঠামো কি যথেষ্ট?

নতুন ফ্যাক্টরি লাগবে না, বর্তমান সক্ষমতা ব্যবহার করলেই চলবে। কারখানা-পরবর্তী কোল্ড চেইন স্টোরেজ যথেষ্ট আছে, আমরা সঠিকভাবেই কোল্ড চেইন মেইনটেইন করে ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি করি।

মান নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ের ঘাটতি কোথায়?

চাষ পদ্ধতি এখনো সনাতন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি গুরুত্ব দেয় তাহলে খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। আমাদের মৎস্যনীতিতে পাস করা বিধিগুলোও নিয়ন্ত্রণমূলক। নীতিমালাটি উন্নয়নমুখী নয়।

রেডি-টু-ইট বা ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যে যেতে বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

বর্তমানে অধিকাংশ ফ্যাক্টরি ঋণগ্রস্ত, সুদহার ১৪-১৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক স্থিতি ফিরলে এ সেগমেন্টে বিশাল সম্ভাবনা আছে। দেশের বাইরে ১ কোটি প্রবাসীর বাজার ধরতে পারলে রফতানি রাতারাতি দ্বিগুণ হতে পারে।

সবার আগে সরকারের কোন নীতিটি আপনি পরিবর্তন চান?

চিংড়িকে কৃষি শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা। এটি করলে ব্যাংক ঋণ সুবিধা, বিদ্যুৎ বিল, সুদহার সব অর্ধেকে নেমে আসবে। তাহলেই এ খাতে বিপ্লব ঘটবে।

আপনাদের খাতের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ রয়েছে, আপনার মতামত কী?

আমাদের সব ফ্যাক্টরি ইউরোপীয় মান অনুযায়ী তৈরি। ওয়েস্টেজ ফিড শিল্পে ব্যবহৃত হয়, সব কারখানায় ইটিপি আছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর সাহায্যের পরিবর্তে হয়রানিমূলক আচরণ করে। যে শ্রেণীতে শিল্পটিকে ফেলা হয়েছে, তা পরিবর্তন করা জরুরি। আর উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণ ও অন্যান্য পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

পুরো আয়োজন দেখতে এখানে ক্লিক করুন।